কবীর আলমগীর
জিনজিরার তাওয়াপট্টি। ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবধি ব্যস্ত এখানকার হাজার হাজার শ্রমিক, কারখানা মালিক। সরেজমিনে তাওয়াপট্টির রাস্তায় দাঁড়ালে কানে এসে পৌঁছাবে মেশিনের ঝনঝন, ক্যাচ ক্যাচ, ঘটাং ঘটাং শব্দ। টিনের তৈরি ছোট ছোট কারখানায় যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন শ্রমিকেরা। তৈরি হচ্ছে নাট-বল্টু, ওয়াশার, স্প্রিং, দরজার কব্জা, ছিটকিনি, বার্নার, ওয়াশার, কলের বাকেট, হ্যাশবল, তালা, শাটার স্প্রিং, তারকাটা, জিআই তার, ক্রোকারিজ তাওয়া, পিতলের-তামার উপকরণ, সাটার প্রভৃতি। শুধু তাই নয় বিদেশ থেকে আমদানি করা কোনো মেশিনও হুবহু বানিয়ে দিতে পারবে এখানকার কারিগররা। চীন বা জাপান থেকে যে মেশিন আমদানি খরচ পড়বে ৬ লাখ টাকা, সেটা জিনজিরায় পাবেন দুই লাখ টাকায়।
কর্মব্যস্ত দিন : জিনজিরা সবসময়ই কর্মব্যস্ত। এখানকার শ্রমিকরা খুব সকালেই হাজির হন কর্মক্ষেত্রে। ব্যস্ত থাকেন, লোহা-লক্কড়ের সঙ্গে মিতালি স্থাপন করেছে জীবন। জিনজিরার লোহা কারিগর মো. ইসমাইল, থাকেন শুভাড্যা এলাকায়। তিনি এখানে কাজ করছেন প্রায় ১০ বছর ধরে।
তিনি বলেন, ‘অভাব-অনটন থাকায় লেখাপড়া বেশি করতে পারিনি। কোনোরকম প্রাইমারি স্কুলের পড়া শেষ করেছি। পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে এখানে এসে কাজে নেমে পড়ি। শুরুতে বেতন ছিল ৪ হাজার, এখন পায় ১৫ হাজার টাকা।’
লিটন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন কারিগর মো. রাজু। তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টায় কাজে নেমে পড়ি। থাকি রাত ৯টা পর্যন্ত। চার বছর ধরে কাজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘লেখাপড়া জানি না। কাজ করতে করতে শিখে গেছি কীভাবে কী বানাতে হয়। আগে তো এগুলোর নামও জানতাম না এখন জানি।’
শুধু পুরুষ কারিগর নয়। লোহা শিল্পের কাজে নিয়োজিত প্রায় ৩ হাজার কারখানার অধিকাংশতেই রয়েছে কোনো না কোনো নারী শ্রমিক। দক্ষতা অনুযায়ী এখানে কাজ করেন তরুণী থেকে শুরু করে মাঝবয়সী কারিগরেরা। এখানকার এক শ্রমিক আরতি রাণী। তিনি কাজ করেন ৭ বছর ধরে। তিনি তৈরি করেন নাট-বল্টু।
কাজ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মেশিন আছে। মেশিনের মধ্যে দিলেই বিভিন্ন আকারের নাট-বল্টু বেরিয়ে আসে। ঠিকমতো নাট তৈরি হচ্ছে কি না সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে হয়।’
অনুকরণই ভরসা : ধরা যাক, বিদেশ থেকে ভালো কোনো মেশিন এসেছে। জিনজিরার কোনো কারিগর মাত্র দুই থেকে সাতদিনের মধ্যে হুবহু এই মেশিনটি তৈরি করে দিতে পারবে। ধরা যাক, কোনো পার্টস এসেছে। সেই মডেলের পার্টস দেখে হুবহু বানিয়ে দিতে পারেন এখানকার কাজ করতে করতে দক্ষ হয়ে যাওয়া শ্রমিকরা। মূলত অনুকরণই তাদের মূল ভরসার জায়গায়। এই অনুকরণের উদাহরণ তুলে ধরে আব্বাস আলী নামে একজন মালিক বলেন, ‘আমার একটা প্রেশার মেশিন দরকার ছিল। চীন থেকে ওই মেশিন কিনতে গেলে খরচ পড়ত সাত লাখ টাকা। আমার কারিগর সেটা তিন লাখ টাকা খরচেই বানিয়ে দিয়েছে।’

রুনা স্টিল হাউজের ম্যানেজার আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের মেশিনের একটা ছুরি বানানোর দরকার ছিল। ভারত কিংবা অন্য দেশ থেকে আনতে গেলে ভিসা খরচ, বাড়তি ঝামেলা। এখানেই সেটা বানানো হয়েছে। খরচ তুলনামূলক একটু বেশি পড়েছে তবে বাড়তি ঝামেলা এড়ানো গেছে।’
‘অনুকরণে যে সব জিনিস তৈরি করা হয় তার গুণগতমান যেন বজায় থাকে সেটার ওপর নজর পূর্ণ মনোযোগ থাকে। এখানে উৎপাদিত জিনিস অনেক নিশ্চিন্তে অনেকদিন ব্যবহার করা যায়।’ বলেন আবদুর রশীদ নামে একজন প্রধান কারিগর।
তাওয়াপট্টির এক কারখানার মালিক মো. বাবুল। তিনি বলেন, ‘ভাই আমরা গবেষণা করি না। আমাদের অধিকাংশ কারিগর অল্পশিক্ষিত। আমরা দেখে দেখেই বানাই। এতে খরচও কম এবং সস্তা দামে তা দেশের বাজারে বিক্রি করা যায়।’
ছড়িয়ে পড়েছে সুনাম : জিনজিরার তাওয়াপট্টি বাংলাদেশকে ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতার পাশাপাশি বিরাট সাফল্য এনে দিয়েছে। ঢাকার চাহিদার অধিকাংশ মেটাচ্ছে জিনজিরায় তৈরি এসব লৌহজাত উপকরণ। চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এগুলো সুনামও অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, মেড ইন জিনজিরার পণ্যের চাহিদা ও কদর ক্রমেই বাড়ছে। দামে সস্তার পাশাপাশি মানের দিক থেকেও এগিয়ে যাচ্ছে এখানকার যন্ত্রপাতি। এ সব কারণে ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে।
জিনজিরার স্থানীয় বাসিন্দা মোমেনুর রসুল বলেন, ‘মানুষ জিনজিরা সম্পর্কে ভালো জানে। বছরের পর বছর ধরে এখানে যে শিল্প চলছে সেটার সুনাম আস্তে আস্তে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।’
তাওয়াপট্টি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আকতার জিলানী খোকন বলেন, ‘এখানকার তৈরি উপকরণগুলো বিক্রি হয় নয়াবাজার, ইমামগঞ্জ, ঠাটারিবাজার, রাইসাবাজার, কারওয়ানবাজার। এখান থেকেই তা ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘লোহা থেকে এই উপকরণগুলো তৈরি করতে আমাদের কোনো জিনিস আমদানি করতে হয় না। বাতিলকৃত কিংবা পরিত্যক্ত লোহা দিয়ে আমরা এগুলো বানাচ্ছি। এই উপকরণগুলো যদি আমদানি করতে হতো তাহলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো। আমরা সেই মুদ্রা সাশ্রয় করছি।’
উপেক্ষিত শ্রমিক নিরাপত্তা : সকল ইতিবাচক খবরের মধ্যে হতাশাজনক একটি বিষয় হলো এখানকার অধিকাংশ মালিকই শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন নন। শিক্ষার আলো না পাওয়া শ্রমিকরাও জানেন না তাদের নিরাপত্তা দরকার। সরেজমিনে কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা যায়, একেকটি কারখানায় বিকট শব্দ মেশিন উঠানামার বেলায়, রয়েছে লোহা কাটার সময় ক্যাচ ক্যাচ শব্দ, লোহার সঙ্গে লোহার ধাক্কায় ঝনঝন শব্দ। এ ছাড়া পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই কোনো কোনো কারখানায়। প্রায় অন্ধকারময় পরিবেশে মেশিনে হাত চালাচ্ছেন একেকটি শ্রমিক।
শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুর রহিম নামে একজন শ্রমিক জানান, ‘লোহার মেশিন দিয়েই লোহা কাটা হয়। ক্যাচ ক্যাচ, ঝনঝন শব্দ তো হবেই। বহুদিন ধরে কাজ করছি এই শব্দের মধ্যে কাজ করতে করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে।’
নিরাপত্তার জন্য কারিগরদের মাথায় হেলমেট থাকার প্রয়োজন হলে কোনো কারখানায়ই তা নেই। এ বিষয়ে শ্রমিক সালমা খাতুন জানান, হেলমেট হলে ভালো হতো। লোহার কারবার, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অন্তত মাথায় আঘাত থেকে বাঁচা যাবে।
এ বিষয়ে পাটোয়ারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক মাসুম পাটোয়ারি বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে কখনো ভাবা হয়নি। আশা করি শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি আর উপেক্ষিত থাকবে না।’
তাওয়াপট্টি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আকতার জিলানী খোকন বলেন, ‘শ্রমিক-কারিগররা আমাদের সম্পদ। তাদের কারণেই আমাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা আগে বুঝতে পারি নাই। এ বিষয়ে অন্যান্য মালিকদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রয়েছে সংকট ও সম্ভাবনা : এখানকার ব্যবসায়ীদের আশাবাদ সরকারি সহায়তা পেলে এখানকার লৌহজাত শিল্পের আরো বিকাশ হতে পারে। উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যা হলো মূলধনের সংকট। ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার থেকেও কোনোপ্রকার প্রণোদনা নেই। লিটন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক বাবু বলেন, ‘আমাদের তো কেউই ঋণ দেয় না। ঋণ পেলে সুবিধা হতো।
ব্যবসায়ী মো. জুয়েল বলেন, ‘মাঝে মধ্যে প্রশাসনের হাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। নকলের অভিযোগে মালিক-কারিগরদের হয়রানি করা হয়। এটা এই শিল্পের বিকাশে বড় বাধা। আমাদের হয়রানি না করে সরকারের উচিত আমাদের পাশে দাঁড়ানো।’
অবহেলিত এ শিল্পের দিকে নজর জরুরি: জিনজিরা তাওয়াপট্টি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সভাপতি আকতার জিলানী খোকন বলেন,‘এখাকার কারিগররা দেখতে দেখতে শেখেন কীভাবে যন্ত্রপাতি-প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি করতে হয়। এ সব কারিগরদের নেই স্বীকৃত কোনো প্রশিক্ষণ। সরকার থেকে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এরা আরও দক্ষ হয়ে উঠবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে জিনজিরার এসব উপকরণ বিদেশে রফতানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু লৌহজাত এসব শিল্পের জন্য কোনো বায়িং হাউজ গড়ে ওঠেনি। কীভাবে পণ্য রফতানি করতে হয় সেই কৌশল আমাদের জানা নেই, তা ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সেই দক্ষতাও আমাদের নেই। আমরা চাই দেশীয় এই শিল্পের জন্য কোনো বায়িং হাউজ গড়ে উঠুক। তাহলে আমরা এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশগুলো যেমন ভুটান, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান এ সব দেশে এগুলো রফতানি করতে পারব। রফতানি পণ্যের যে রকম গুণগত মান দরকার আমরা সেটা নিশ্চিত করতে পারব বলে বিশ্বাস করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের পুঁজির সমস্যা রয়েছে। এরশাদ সরকারের সময় বিসিকের মাধ্যমে আমরা কিছু ঋণ পেয়েছিলাম। ৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঋণের বিপরীতে সুদ মওকুফ করে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে আমরা আর কোনো বরাদ্দ পায়নি। জিনজিরার অবহেলিত এই লৌহজাত শিল্পের জন্য সরকারের সুনজর জরুরি। সুনজর পেলে জিনজিরার এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে।’
সারাবাংলা/একে/এসআই