ঢাকা: রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন ডা. তাসনিম জারা।
গত ৫০ বছর ধরে এলাকার মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে সেবা দেওয়া এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংস করে দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যকর্মীরা খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়ে শিশুদের টিকাদানসহ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন্দ্রটির এমন করুণ অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাণ্ডব চলার পরও পুলিশ কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় অবস্থিত ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সরজমিনে পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি ধ্বংসস্তূপ ঘুরে দেখেন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবাদানের চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। একই সাথে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভবনটির ব্যবহারযোগ্য কক্ষগুলো দ্রুত খুলে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক করার জোর দাবি জানান।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডা. তাসনিম জারা বলেন, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বহু বছর ধরে এলাকার প্রসূতি মা, গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ও টিকাদান সেবা প্রদান করে আসছে। ভাঙচুরের পরও মায়েরা যেভাবে রোদের কষ্ট সহ্য করে সন্তানদের টিকাদানের জন্য নিয়ে আসছেন, তা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের গভীর আস্থার প্রমাণ দেয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে তাণ্ডব চালানো সত্ত্বেও খবর পেয়ে পুলিশ কেন ঘটনা ঠেকাতে পারল না। এমন নীরব ভূমিকার পর সাধারণ মানুষ কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নিরাপদ বোধ করবে, সে বিষয়েও তিনি সংশয় রয়েছে।
তিনি এই ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং এসব অপকর্মের সাথে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পটপরিবর্তনের পর কেন মাঠপর্যায়ে এভাবে দখলদারিত্বের প্রবণতা বৃদ্ধি পেল তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে ডা. তাসনিম জারা বলেন, এই তাণ্ডবে শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান রেজিস্টার খাতা, দুটি ল্যাপটপ বা ট্যাব এবং দাপ্তরিক ফোন হারিয়ে গেছে। এর ফলে আগে যেভাবে রেজিস্টার দেখে অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে টিকার পরবর্তী তারিখ জানিয়ে দেওয়া হতো, তা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন বাধ্য হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। অনেক অভিভাবক যদি টিকা কার্ড হারিয়ে ফেলেন, তবে এই তথ্যের অভাবে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকাদানের নতুন রেজিস্টার তৈরি এবং শিশুদের তথ্যের ডেটাবেজ পুনর্গঠনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী।
খোলা আকাশের নিচে সেবাদানের ফলে সৃষ্টি হওয়া দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে যেখানে শিশুরা ছায়াযুক্ত ঘরে বসে সুশৃঙ্খলভাবে টিকা পেত, এখন সেখানে কড়া রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনে ভোগান্তির কারণে অনেক মা-বাবা টিকা না দিয়েই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। একই সাথে প্রসূতি ও গর্ভবতী নারীদের অতি প্রয়োজনীয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি, শারীরিক চেকআপ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শের মতো সেবাগুলো পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। পরিদর্শনকালে ভবনের কিছু কক্ষ অক্ষত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসন উদ্যোগ নিয়ে ব্যবহারযোগ্য কক্ষগুলো অবিলম্বে চালু করে দিলে অন্তত প্রসূতি ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
সেবা কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের সার্বিক পরিবেশ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডা. তাসনিম জারা বলেন, বর্তমানে সেখানে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা পানীয় জল, শৌচাগার ব্যবহার কিংবা দুপুরের খাবার খাওয়ার মতো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন মানবেতর পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা অসম্ভব। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অক্ষত অংশ খুলে দিয়ে সার্বিক টিকাদান ও চিকিৎসা সেবা নির্বিঘ্ন করার দাবি জানান তিনি।