Sunday 11 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলে কেন এত মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র

আবু সাঈদ সজল
৩১ মার্চ ২০২৬ ০০:৫২
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইরানের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত পারস্য উপসাগরের ছোট্ট কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বীপটি প্রকাশ্যে দখলের হুমকির পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ?

খার্গ দ্বীপ ইরানের জ্বালানি রফতানির কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়েই রফতানি হয়। মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে এখান থেকে বিশাল ট্যাংকারে করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। গভীর সমুদ্রঘেঁষা অবস্থানের কারণে বড় তেলবাহী জাহাজ সহজেই ভিড়তে পার—যা এটিকে ইরানের প্রধান রফতানি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

এখান থেকেই প্রধানত এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে তেল রফতানি করা হয়। ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, তিনটি প্রধান তেলক্ষেত্র—আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ থেকে তেল এখানে আসে এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এই দ্বীপের টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দুটি বিশাল ট্যাংক সংস্কারের মাধ্যমে এর ধারণক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের দৈনিক রফতানি ১৬ লাখ ব্যারেলের আশপাশে হলেও এই টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপ কার্যত ইরানের ‘অর্থনৈতিক লাইফলাইন’। ফলে এটি অচল হয়ে গেলে তেহরানের রাজস্ব প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। এছাড়া, ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্যও ট্রাম্প চাপ প্রয়োগ করতে দ্বীপটি দখলে নিতে চান।

খার্গ দ্বীপ দখলে ট্রাম্পের পরিকল্পনা

মার্কিন বাহিনীর ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিষয়টি খোলাসা করেছেন ট্রাম্প। রোববার (২৯ মার্চ) ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপ নেব, হয়তো নেব না। আমাদের অনেক বিকল্প আছে।”

তিনি আরও বলেন, “এর মানে আমরা সেখানে কিছু সময় থাকতে হবে… আমার মনে হয় না তাদের কোনো প্রতিরক্ষা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারি।”

বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে সূত্র জানিয়েছে, পেন্টাগন কর্মকর্তারা ইরানে স্থলবাহিনী মোতায়েনের বিস্তারিত প্রস্তুতি নিয়েছেন। এই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার যুদ্ধজাহাজ ‌‌‘ইউএসএস ত্রিপোলি’র নেতৃত্বে একটি ইউনিটের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ৩৫০০ নাবিক ও মেরিন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস নির্দিষ্ট মোতায়েন বা পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবে তারা বারবার বলেছে—এই বিকল্প খোলা আছে। তবে, এসব প্রস্তুতি দ্বীপটি দখলের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

এদিকে সোমবার (৩০ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেন, ‘তেহরান দ্রুত কোনো চুক্তিতে না এলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। যদি দ্রুত চুক্তি না হয় এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবসার জন্য খুলে দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা ইরানের ক্ষেত্রে আমাদের ‘সহনশীলতা’ শেষ করব। তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেল কূপ এবং খার্গ দ্বীপ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপের কী ক্ষতি করেছে?

১৩ মার্চ ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) “মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা” চালিয়ে খার্গ দ্বীপে “সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।” তিনি বলেন, “মানবিক কারণে” তিনি দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী দ্বীপটিতে ৯০টির বেশি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, “তবে তেল অবকাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে।”

এই আঞ্চলিক সামরিক কমান্ড জানায়, তারা নৌ-মাইন সংরক্ষণাগার, ক্ষেপণাস্ত্রের বাংকারসহ বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দ্বীপটির তেল স্থাপনায় কোনো ক্ষতি হয়নি। আধা-সরকারি ফার্স নিউজ জানায়, মার্কিন হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌঘাঁটি, বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ও হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

মার্কিন হামলার পর বুশেহর প্রদেশের গভর্নরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এহসান জাহানিয়ান তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানান, তেল রফতানি অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করা কোম্পানিগুলোর তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো “তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে ছাইয়ে পরিণত করা হবে।”

খার্গ দ্বীপে দখলের সম্ভাব্য ঝুঁকি

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকি কের বলেন, খার্গ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া গেলে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামরিক কার্যক্রম বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। এতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির অর্থনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্বীপটি দখল করা সহজ হবে না। এতে নৌ বা আকাশপথে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে অভিযান চালাতে হবে, যা সামরিকভাবে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে অ্যারন ম্যাকলিনের মতে, এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত কঠিন হবে। মার্কিন বাহিনীকে নৌপথে বা আকাশপথে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছাতে হবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস সিএনএনকে বলেন, ‘আমার মনে হয় ইরানিরা খারগ দ্বীপে আমেরিকানদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানোর সুযোগ পাবে, আর এতে শুধু প্রাণহানি বাড়তেই থাকবে।’

যুক্তরাষ্ট্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের পরিকল্পিত স্থল অভিযান শুরু করতে পারে বলে ধারণা করছেন ম্যালকম ডেভিস। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এটি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও নড়বড়ে করে তুলবে।

ইরানের হুঁশিয়ারি

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ আগেই সতর্ক করে বলেছেন, তাদের বাহিনী “মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছে” এবং ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করলে “আগুনের বৃষ্টি নামানো হবে।”

একজন ইরানি সামরিক কর্মকর্তা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্থল আক্রমণ হলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান খার্গ দ্বীপে প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে। সিএনএন বলছে, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ইরান ইতোমধ্যে খার্গ দ্বীপে প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে। সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে,  ইরানের ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রফতানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযান হিতে বিপরীত হতে পারে এবং এতে মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে, খার্গ দ্বীপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ শুধু সামরিক আধিপত্যের প্রশ্ন নয়; বরং এটি অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি জটিল সমীকরণ।

সারাবাংলা/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর