Sunday 03 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

হরমুজ-মালাক্কা থেকে পানামা
যেভাবে নতুন বৈশ্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে ‘সমুদ্রপথ’

আবু সাঈদ সজল নিউজরুম এডিটর
১ মে ২০২৬ ২২:০৫ | আপডেট: ২ মে ২০২৬ ০০:১৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার জন্য একটি জাহাজ অপেক্ষা করছে। ছবি: আনাদুলু এজেন্সি

বিশ্ব বাণিজ্যের প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত সমুদ্রপথ এখন ক্রমেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। একসময় নিয়মভিত্তিক যে বৈশ্বিক সামুদ্রিক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য করেছিল, তা এখন আরও অনিশ্চিত, ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি মালাক্কা প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে টোল আরোপের প্রস্তাব দেন ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া। এটি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পদক্ষেপ থেকে অনুপ্রাণিত। যদিও পরে ইন্দোনেশিয়া প্রস্তাবটি থেকে সরে আসে, তবুও এটি সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

বিজ্ঞাপন

আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এলিজাবেথ ব্রাও বলেন, “এতটা অস্থির ও বিপজ্জনক সমুদ্র আমরা আগে দেখিনি।” নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে অনিশ্চয়তায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমুদ্রপথকে নিরাপদ রাখতে নানা চুক্তি ও নিয়ম গড়ে ওঠে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য কয়েক দশকে বিপুলভাবে বিস্তৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্য সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিধর দেশগুলোর নানা পদক্ষেপ সেই নিয়মভিত্তিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

সংঘাতের কেন্দ্র হরমুজ

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এখন নতুন উত্তেজনার কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দর লক্ষ্য করে অবরোধ দেয় এবং সন্দেহভাজন জাহাজে তল্লাশি জোরদার করে। এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এসএন্ডপি গ্লোবাল-এর বিশ্লেষক জ্যাক কেনেডির মতে, “পূর্ণ অবরোধ না হলেও অনুমতি-নির্ভরতা নিজেই বড় ধরনের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।”

পানামা খালও কি ঝুঁকিতে?

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়,পানামা খাল ঘিরেও উত্তেজনা বাড়ছে।  যুক্তরাষ্ট্রসহ দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের একাধিক দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে “লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ” প্রয়োগ এবং পানামা-নিবন্ধিত জাহাজগুলোকে প্রভাবিত করার অভিযোগ তোলে। তারা জানায়, চীন তাদের বন্দরে পানামা-নিবন্ধিত জাহাজ আটক করেছে এবং এসব পদক্ষেপকে “সামুদ্রিক বাণিজ্যকে রাজনৈতিককরণ এবং আমাদের অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের স্পষ্ট প্রচেষ্টা” হিসেবে আখ্যা দেয়।

যদিও চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রকেই ভণ্ডামির অভিযোগ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা সামুদ্রিক বাণিজ্যকে ক্রমেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে সমুদ্রপথ

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপথ এখন সরাসরি কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হয়ে উঠছে। কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বিধিনিষেধ ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানিতে বড় ধাক্কা দেয়। আবারদক্ষিণ চীন সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ হয়রানির অভিযোগও বেড়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যুরোর তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দস্যুতার ঘটনা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।

ব্যয় বাড়ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিপিং খাতে। নিরাপদ পথ এড়িয়ে দীর্ঘ রুটে ঘুরে যাওয়ার ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ছে, সময় লাগছে বেশি। একই সঙ্গে বীমা প্রিমিয়াম ও যুদ্ধঝুঁকির খরচও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য বিলম্ব বা তল্লাশিও এখন পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে জাহাজের রুট, পতাকা ও বন্দর নির্বাচনেও নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

বিশ্লেষকদের সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে ‘নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা’ দুর্বল হয়ে পড়ে ‘শক্তিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে’ পরিণত হতে পারে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স’র বিশ্লেষক জ্যাক কেনেডির ভাষায়, “ঝুঁকিটা হলো নজির তৈরি হওয়া—যেখানে দেশগুলো সীমা পরীক্ষা করতে শুরু করে। তখন বাণিজ্য নির্ভর করবে নিয়মের ওপর নয়, বরং শক্তি ও দরকষাকষির ওপর।”

সব মিলিয়ে, বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো-সমুদ্রপথ—এখন আর শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে নতুন এক বৈশ্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে।


আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ।

বিজ্ঞাপন

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর