Friday 17 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লেবানন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যা আছে, যা নেই— এটি কি টিকবে?

আবু সাঈদ সজল নিউজরুম এডিটর
১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:৫৭ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ২০:০৪

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও লেবানন। যার লক্ষ্য ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘর্ষ থামানো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পথ সুগম করা। তবে চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক ও সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যতে এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

চুক্তিতে যা আছে

চুক্তি অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল রাত ৯টা থেকে প্রাথমিকভাবে ১০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দুই পক্ষ শান্তি আলোচনায় অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাবে।

লেবানন সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তায় হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য গোষ্ঠীকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে জাতীয় প্রতিরক্ষার একমাত্র বৈধ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত বহন করছে। তবে গোষ্ঠীটি এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তারা তাদের অস্ত্রকে ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে দেখে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, চুক্তিতে ইসরায়েলকে সম্ভাব্য বা চলমান হামলার বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে একই ধরনের স্পষ্ট অধিকার লেবাননের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়নি।

এছাড়া, ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা লেবাননের ভেতরে স্থল, আকাশ বা সমুদ্রপথে কোনো আক্রমণাত্মক অভিযান চালাবে না, যদিও আত্মরক্ষার শর্ত এতে ব্যতিক্রম হিসেবে রাখা হয়েছে।

চুক্তির মেয়াদ ১০ দিন হলেও, পরিস্থিতি ও আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে তা বাড়ানো যেতে পারে।

যেসব বিষয় অমীমাংসিত

চুক্তির সবচেয়ে বড় বিতর্কিত দিক হলো- দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা এতে নেই। বর্তমানে লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করছে, যাকে তারা ‘বাফার জোন’ হিসেবে দেখছে।

ওই এলাকায় ব্যাপক অবকাঠামো ধ্বংস এবং বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটি লেবাননের প্রায় ৮ শতাংশ ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো- হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি সরাসরি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। যদিও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে অস্ত্র বহনে সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হয়েছে, তবুও এটি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে তা অনিশ্চিত।

এছাড়া, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত লাখো লেবাননির ভবিষ্যৎ নিয়েও চুক্তিতে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

চুক্তি সম্পর্কে হিজবুল্লাহ’র প্রতিক্রিয়া

যুদ্ধবিরতির পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা বন্ধ রাখলেও চুক্তিটিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি। তারা বলেছে, লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিত থাকলে জনগণের ‘প্রতিরোধের অধিকার’ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং কোনো যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলকে অবাধ চলাচলের সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

অতীত চুক্তির অভিজ্ঞতা

গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েল ও লেবানন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি অনির্দিষ্টকালীন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ওই সময় লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার আহ্বান জানানো হয়। সেই চুক্তিতে লেবাননকে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যে অস্ত্র সীমাবদ্ধ রাখতে এবং অননুমোদিত অস্ত্র জব্দ করে অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহ ঠেকাতে বলা হয়েছিল।

২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র লেবানন কর্মকর্তাদের কাছে একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে, যেখানে হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করার বিনিময়ে ইসরায়েল হামলা বন্ধ করবে এবং দক্ষিণ লেবাননের পাঁচটি স্থল থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।

তবে হিজবুল্লাহ এবং তাদের প্রধান শিয়া মিত্র আমাল মুভমেন্ট (পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির নেতৃত্বে) বলেছে, এই প্রক্রিয়া উল্টো হওয়া উচিত—অর্থাৎ আগে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার ও হামলা বন্ধ করবে, তারপর হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিয়ে আলোচনা হবে।

২০২৪ সালের চুক্তির পরও ইসরায়েল হিজবুল্লাহর ডিপো ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যায়। মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়ের-এর মতে, এসব হামলায় লেবাননে ৩৭০ জন নিহত হয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে অন্যান্য যুদ্ধবিরতির অবস্থা

গাজায় গত অক্টোবর মাসে ইসরায়েল ও হামাস যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ওই অঞ্চলে ত্রাণ সরবরাহ করা। এরপর একটি মার্কিন পরিকল্পনা আসে, যেখানে হামাসকে নিরস্ত্র করার বিনিময়ে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠনের কথা বলা হয়। তবে সেই পরিকল্পনার অনেক অংশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ৭৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ইসরায়েল দাবি করে, তারা হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ঠেকাতে এ পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে তাদের এ দাবির প্রমাণ মেলেনি।

গত অক্টোবরের পর থেকে গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় অন্তত চারজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, লেবানন যুদ্ধবিরতি চুক্তি তাৎক্ষণিক সহিংসতা কমাতে সহায়ক হলেও এর ভেতরেই রয়েছে ভাঙনের উপাদান। মূল ইস্যুগুলোর সমাধান না হওয়ায় যেকোনো সময় এই চুক্তি ভেঙে পড়তে পারে।


রয়টার্স থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ।

বিজ্ঞাপন

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর