Sunday 19 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ে ফাটল, রাশিয়া-ইরানের দিকে ঝুঁকছে মিত্ররা

আবু সাঈদ সজল নিউজরুম এডিটর
২০ এপ্রিল ২০২৬ ০১:৪২ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০১:৫৩

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার দেশগুলোতে। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এখন রাশিয়া ও ইরানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন।

জ্বালানি সংকটে নাজেহাল এশিয়া

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোতে সরবরাহ হতো। এই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

একসময় এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও কৌশলগত সহযোগী দেশগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মেনে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা এড়িয়ে চলত। এখন তারা জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো কম মজুত রাখা দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। ফলে মস্কো ও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এখন অনেক দেশের জন্য জরুরি কৌশলে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীরাই ভরসা

যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত বার্তা ও যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা এশিয়ার দেশগুলোকে বাস্তববাদী অবস্থানে যেতে বাধ্য করছে। এদিকে গত সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার একজন বিশেষ দূত পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোর বিষয়ে আলোচনা করতে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

একই দিন তেল কিনতে মস্কো পৌঁছান ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। ফিলিপাইনের মতো তেলের কম মজুত রাখা দেশগুলো এখন সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হিমশিম খাচ্ছে।

যুদ্ধ কত দিন চলবে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্পষ্ট বার্তার কারণে এশিয়ার অনেক নেতা এখন নিজেদের দেশের তেলের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে ঝুঁকছেন।

এর মানে দাঁড়াল, এশিয়ার বেশ কিছু দেশ কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান ও রাশিয়ার তেল কিনছে। ওয়াশিংটন বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট নিরসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় এটা সম্ভব হচ্ছে।

গত মাসে ফিলিপাইন পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের প্রথম চালান হাতে পেয়েছে। সাত বছরের বিরতি শেষে চলতি সপ্তাহে ভারতেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের অপরিশোধিত তেল পৌঁছেছে। এই লেনদেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের কোনো ইঙ্গিত না দিলেও আদতে তা আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই সহায়তা করছে।

চিন্তন প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর হুয়ং লে থু বলেন, ‘ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি অনেক দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।’ যদিও এই পরিস্থিতিতে ইরান ও রাশিয়া থেকে এশিয়ায় কী পরিমাণ তেল ঢুকতে পারবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

ফের আলোচনায় পুতিন

জ্বালানি সংকট রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে নতুন করে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যে দেশগুলো রুশ তেল বর্জন করেছিল, তারাই এখন আবার রাশিয়ার দিকে ফিরছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও গত সোমবার পুতিনের প্রশংসা করে বলেন, ‘এই অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি (পুতিন) অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছেন।’

‍২০২২ সালে পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করেন। ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনসহ এ অঞ্চলে আমেরিকার কিছু মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রুশ তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে রাশিয়ার তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।

তবে তেল-গ্যাস বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভোরটেক্সা’র বিশ্লেষক এমা লি বলেন, রুশ তেল এখন বৈশ্বিক বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার আশঙ্কা হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম যতই হোক না কেন, দেশগুলোর সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।’

তেলের মজুত ঠিক রাখতে এশিয়ায় দেশভিত্তিক পরিস্থিতি-

দক্ষিণ কোরিয়া

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল-গ্যাস আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে। দ্রুত সরবরাহ পাওয়ার কারণে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর এখন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প।

জাপান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশের সঙ্গেই ভারসাম্য রক্ষা করছে টোকিও। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছেন।

ফিলিপাইন

তীব্র তেল সংকটে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। দেশটি রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারতের কাছ থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

ভারত

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির চাপে আবার রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে। তবে এতে ব্যয় বেড়েছে।

সবমিলিয়ে ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এশিয়ার দেশগুলো এখন আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তাই হয়ে উঠছে নতুন কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপে ভাবানুবাদ।

বিজ্ঞাপন

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর