গাইবান্ধা: গাইবান্ধা পৌরসভায় যত দ্রুত শহরায়ন ঘটছে, ততই সংকুচিত হয়ে আসছে শিশুদের খেলার স্বপ্ন। একসময় বিকেলের আলো নরম হয়ে এলে পাড়া-মহল্লা মুখর থাকত ফুটবলের লাথি, ক্রিকেট বলের শব্দ আর কিশোরদের উচ্ছ্বাসে। মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াত শিশুরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। কংক্রিটের দালান, সরু গলি আর যানবাহনের ব্যস্ততায় শিশুদের দৌড়ানোর জায়গাটুকুও যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
শহরে খেলার মাঠের সংখ্যা এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যে যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর বড় একটি অংশ নানা কারণে খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও ভাঙাচোরা অবকাঠামো, কোথাও আবার দখলদারিত্বের স্থায়ী ছাপ। ফলে মাঠ থাকলেও সেখানে নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না শিশু-কিশোররা।
সম্প্রতি গাইবান্ধা পৌর শহরের কলেজ পাড়ার একটা উম্মুক্ত মাঠে দেখা যায় ফুটবল নিয়ে খেলায় মত্ত কয়েকজন শিশু। এদের মধ্যে সাকিব আল হাসান নামের চতুর্থ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের পাড়ায় এই একটা খেলার মাঠই আছে । বিকালে সুযোগ পাইলে এলাকার ছেলেদের সাথে খেলি এখানে। বৃষ্টির সময় ( বর্ষাকালে) মাঠে পানি জমে তখন আর খেলতে পারি না।
পৌর শহরের স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় খোলা জায়গা ও ছোট ছোট মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের। বিকেল হলেই দল বেঁধে ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা অন্যান্য খেলায় মেতে উঠত তারা। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং খালি জায়গা কমে যাওয়ায় সেই সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে এসেছে।
এদিকে শহরের অনেক এলাকায় সামান্য খালি জায়গা থাকলেও সেখানে শিশুদের খেলার সুযোগ নেই। কোথাও ভবন নির্মাণের সামগ্রী রাখা হচ্ছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, আবার কোথাও পার্কিং বা বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে আবাসিক এলাকার শিশুরা বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়ক ও সরু গলিতে খেলতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছে।
সমাজকর্মী মেহেদী হাসান বলেন, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাবে শিশুদের বড় একটি অংশ ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি তাদের নির্ভরতা বাড়ছে। এতে শিশুদের শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও দলগতভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর খলিলুর রহমান জানান, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা শেখে। কিন্তু পর্যাপ্ত মাঠ না থাকায় সেই স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ থেকে শহরের অনেক শিশু বঞ্চিত হচ্ছে । একটি বাসযোগ্য শহরের পরিকল্পনায় আবাসিক ভবন, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনার পাশাপাশি শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ নয়, বিদ্যমান মাঠগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।