Monday 05 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

৫০ বছর ধরে এক টাকায় শিক্ষা বিলাচ্ছেন গাইবান্ধার লুৎফর মাস্টার

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৯ | আপডেট: ৫ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০১

শিশুদের পড়াচ্ছেন লুৎফর রহমান।

গাইবান্ধা: বয়স ৭৮ বছর। জীবনের পাঁচ দশক পার করেছেন শিক্ষকতা করে। নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অর্থাভাবে পূরণ করতে না পারলেও দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষিত করার স্বপ্ন থেকে কখনো সরে যাননি লুৎফর রহমান। ১৯৭৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত টানা ৫০ বছর ধরে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে শিশুদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার মদনেপাড়া গ্রামের একটি বাড়ির উঠানে সম্প্রতি দেখা যায়, মাটিতে প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে গোল হয়ে বসে আছে একদল শিশু। তাদের পড়াচ্ছেন লুৎফর রহমান। কখনো হাতের ইশারায়, কখনো নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে শিশুদের কঠিন বিষয়গুলো সহজ করে বোঝাচ্ছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৩ নভেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার মধ্য উড়িয়া গ্রামে। ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কমেনি। বরং নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এরপর ১৯৭৫ সালে শুরু হয় তার শিক্ষকতার পথচলা। প্রথমদিকে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই শিশুদের পড়াতেন তিনি। পরে অভিভাবকদের অনুরোধে সামান্য সম্মানী হিসেবে এক টাকা করে নেওয়া শুরু করেন। সেই এক টাকাই আজও তার শিক্ষাদানের প্রতীক হয়ে আছে।

বর্তমানে লুৎফর রহমান গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। একসময় স্বচ্ছল গৃহস্থ পরিবার থাকলেও নদীভাঙনে হারিয়েছেন জমিজমা ও সম্পদ। এখন পরিবারের আর্থিক অবস্থাও বেশ সংকটাপন্ন। বড় ছেলে ইজিবাইক চালিয়ে সংসারে সহযোগিতা করেন। ছোট ছেলে ইসলামি ফাউন্ডেশনে যোগ দিলেও এখনো নিয়মিত বেতন পাননি।

তবু এসব প্রতিকূলতা তাকে থামাতে পারেনি। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে কখনো হেঁটে, কখনো সাইকেলে চড়ে বিভিন্ন গ্রামে যান তিনি। শিশুদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে পড়াশোনায় বসান। বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া ও ঢুলিপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় নিয়মিত পাঠদান করেন তিনি।

লুৎফর মাস্টারের কাছে প্রতিদিন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তার সম্মানী মাত্র এক টাকা। দীর্ঘ পাঁচ দশকে এই সামান্য অর্থই তার কাছে শিক্ষার বিনিময়মূল্য হয়ে রয়েছে।

লুৎফর রহমান বলেন, ‘১৯৭৫ সালে যখন পড়ানো শুরু করি, তখন কোনো টাকা নিতাম না। পরে অভিভাবকেরা অনুরোধ করায় এক টাকা করে নেওয়া শুরু করি। ৫০ বছর ধরে সেই এক টাকাই নিচ্ছি। অর্থ উপার্জন আমার উদ্দেশ্য নয়। দরিদ্র শিশুদের শিক্ষিত করে দেশের জন্য ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।’

তার হাতে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেউ হয়েছেন চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, ব্যাংকার কিংবা পুলিশ কর্মকর্তা। তাদেরই একজন সদর উপজেলার দারুল হুদা আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক।

তিনি বলেন, ‘স্যারের অবদান আমরা কখনো ভুলতে পারব না। তার কাছে পড়েই আমার মতো অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি যে কাজ করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল।’

গোপীনাথপুর এলাকার অভিভাবক সাথি আক্তার বলেন, ‘আমি নিজেও লুৎফর স্যারের কাছে পড়েছি। এখন আমার সন্তানও তার কাছে পড়ছে। এত বছর পরও তিনি মাত্র এক টাকা নিয়ে শিশুদের পড়াচ্ছেন। বর্তমান সময়ে এমন মানুষ পাওয়া খুব কঠিন। তার এই কাজের জন্য সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।’

গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ ইদু বলেন, ‘লুৎফর মাস্টার অত্যন্ত সহজ-সরল ও ব্যতিক্রমী একজন মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শিশুদের শিক্ষার জন্য যে ভূমিকা রেখে চলেছেন, তা প্রশংসনীয়। সমাজের জন্য তার মতো নিবেদিত মানুষ আরও প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয়।’

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর