ঢাকা: গ্রামবাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক হলো বৈশাখী মেলা। যুগের পর যুগ ধরে এই মেলা বাঙালির আনন্দ-উল্লাস, মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। শহরের ইট-কাঠের জঙ্গল ছেড়ে প্রকৃতির কোলে, কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজিত এই মেলা যেন এক টুকরো উৎসবের স্বর্গরাজ্য।
বৈশাখী মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো এর বৈচিত্র্যময় সব রাইড। ছোট-বড় সবার জন্যই থাকে নানারকম বিনোদনের ব্যবস্থা। দূর থেকে চোখে পড়ে বিশাল আকারের ফেরিস হুইল, যা ধীরে ধীরে আকাশপানে উঠে যায় এবং পুরো মেলাপ্রাঙ্গণের এক মনোরম দৃশ্য উপহার দেয়। এর পাশাপাশি ছোটদের জন্য থাকে মিনি-ট্রেন, যা নানা রঙের ও আকৃতির বগি নিয়ে গোল গোল ঘোরে। কখনও বা এই ট্রেনে দেখা যায় জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রদের অবয়ব। আর সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো দোলনা, বিশেষ করে পাখি বা পশুর আকৃতির দোলনাগুলো, যেখানে শিশুরা নিজেদের স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যায়।

বৈশাখী মেলা। ছবি: সারাবাংলা
মেলার অন্যতম বিশেষত্ব হলো এখানকার বর্ণিল পরিবেশ। রঙ-বেরঙের পতাকা, বেলুন, আলোকসজ্জা এবং হরেক রকমের স্টল মেলাপ্রাঙ্গণকে এক মায়াবী রূপ দেয়। স্টলগুলোতে পাওয়া যায় মাটির তৈরি খেলনা, হাতে তৈরি পুতুল, গহনা, রঙিন কাপড়, নানা রকমের খাবার এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক বিভিন্ন শিল্পকর্ম। মেলার আবহাওয়াও থাকে চমৎকার, মৃদু বাতাস আর রোদের ঝিলিক যেন উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বৈশাখী মেলা শুধু আনন্দ আর বিনোদনের জায়গা নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। এখানে ঘুরতে আসা মানুষের পরনে থাকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক। ছেলেরা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়ি পড়ে মেলায় আসে। বিভিন্ন লোকজ গীত, পালাগান, যাত্রা এবং পুতুলনাচের আসর মেলাকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম।
মেলার অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এখানকার বিভিন্ন ধরণের লোকশিল্পীদের উপস্থিতি। এদের মধ্যে বাঁশিপুলা, যাদু প্রদর্শনকারী, সাপুড়ে, বেহুলার ভাসান গায়কেরা মেলায় আসা দর্শনার্থীদের আনন্দ দেয়। তাদের এই উপস্থিতি মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
বৈশাখী মেলা বাংলার মানুষের উৎসবমুখর জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসুন, এই মেলায় অংশ নিয়ে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে উদযাপন করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরি।