Tuesday 14 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রমনা বটমূল ও ছায়ানট: বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সুরের ঝরনাধারা

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪২

বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী সংগীত আয়োজন। ঊষালগ্নে যখন ভোরের স্নিগ্ধ আলো রমনার গাছপালার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়ে, তখন কয়েক শ শিল্পীর কণ্ঠে একযোগে বেজে ওঠে, ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। এই সুর কেবল নতুন বছরকে আহ্বান জানায় না, বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষা এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের এক অমর স্মারক।

ছায়ানট ও বটমূলের সেই ঐতিহাসিক শুরু

ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যখন বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত আসছিল, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, তখনই তার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ায় ‘ছায়ানট’। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে প্রথমবার রমনা বটমূলে শুরু হয় নববর্ষের এই আয়োজন। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আদায়ের এক মৌন অথচ শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল এই সুরের আসর। সেই থেকে আজ অবধি, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা কোনো বাধাই এই ঐতিহ্যের ধারাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

সুরের মূর্ছনায় জাতীয় সংহতি

রমনা বটমূলের এই আসর কেবল গান গাওয়ার স্থান নয়, এটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মহামিলনের কেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হলেও এতে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হয় নজরুল গীতি, দ্বিজেন্দ্রগীতি, অতুলপ্রসাদী ও রজনীকান্তের গান। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলে আবৃত্তি এবং পাঠ। এই বৈচিত্র্যময় সুরের মালা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে শানিত করে। বটমূলের এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সুরের কোনো সীমানা নেই এবং সংস্কৃতিই একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাঙালির স্পর্ধা

রমনা বটমূলের ইতিহাস কেবল আনন্দের নয়, এটি সাহসেরও গল্প। ২০০১ সালের ভয়াবহ বোমা হামলার ক্ষত বয়ে নিয়েও ছায়ানট ও এ দেশের মানুষ পিছু হটে যায়নি। বরং পরের বছরগুলোতে আরও দ্বিগুণ উৎসাহে সাধারণ মানুষ সেখানে সমবেত হয়েছে। এই অকুতোভয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, সুর আর সংস্কৃতির শক্তিকে কোনো অশুভ শক্তি দিয়েই দমানো সম্ভব নয়। আজ রমনা বটমূল তাই বাঙালির কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান, যেখানে প্রতি বছর মানুষ আসে নিজের শিকড়কে নতুন করে চিনে নিতে।

ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ

বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে এই আয়োজন দেশ-বিদেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ে। টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাখো মানুষ যুক্ত হয় এই সুরের ধারায়। তবুও সশরীরে সেই ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে বসে বাঁশির সুর আর ধ্রুপদী সংগীতের মূর্ছনা শোনার যে অনুভূতি, তার কোনো তুলনা নেই। ছায়ানটের এই নিরলস সাধনা কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক মনন গঠনের এক অনন্য পাঠশালা হিসেবে টিকে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর