আঠারো শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসে চার্লস আলেকজান্ডার অফ লোরেন একটি উজ্জ্বল এবং অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন মূলত অস্ট্রিয়ান নেদারল্যান্ডসের, যা বর্তমানে আধুনিক বেলজিয়াম গভর্নর জেনারেল। ১৭৪৪ সাল থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই অঞ্চল শাসন করেছিলেন। চার্লস লরেন কেবল একজন দক্ষ সামরিক অধিনায়কই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন শিল্প, সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক। তার শাসনামলে ব্রাসেলস শহরটি একটি আধুনিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। তিনি অস্ট্রিয়ার রানি মারিয়া থেরেসার শ্যালক ছিলেন, যার ফলে রাজদরবারে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। চার্লস লরেন তার উদার মানসিকতা এবং প্রজাহিতৈষী কাজের জন্য জনগণের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, যা তাকে ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
ব্রাসেলসের রাজকীয় আঙিনায় ভাস্কর্যের অবস্থান
এই বিখ্যাত ভাস্কর্যটি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস শহরের হৃদপিণ্ডে অবস্থিত। এটি মূলত ব্রাসেলসের ‘প্যালেস অফ চার্লস লরেন’-এর ঠিক সামনে ‘প্লাস রয়্যাল’ (Place Royale) নামক ঐতিহাসিক চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে। এই চত্বরটি ব্রাসেলসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ভাস্কর্যটি যেখানে অবস্থিত, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে চার্লস লরেনের নামানুসারে তৈরি রাজপ্রাসাদ, যা বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর ঘেরা এই চত্বরে ভাস্কর্যটি ব্রাসেলসের সোনালী অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পর্যটকরা যখন ব্রাসেলসের আপার টাউন বা উঁচু শহর এলাকায় ভ্রমণ করেন, তখন এই বিশালাকৃতির ব্রোঞ্জ মূর্তিটি সহজেই তাদের নজরে আসে।
ভাস্কর্যের ইতিহাস এবং নির্মাণের পটভূমি
ব্রাসেলসের এই স্মৃতিস্তম্ভটি চার্লস লরেনের মৃত্যুর ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ১৭৮১ সালে প্রথম স্থাপন করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে আমরা যে ভাস্কর্যটি দেখি, সেটি কিন্তু সেই আদি মূর্তি নয়। প্রথম মূর্তিটি ফরাসি বিপ্লবের সময় দখলদার বাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৪৮ সালে বিখ্যাত বেলজিয়ান ভাস্কর জেহা পিনয় (Jehannot) বর্তমানের এই ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন। এই মূর্তিটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বেলজিয়ামের শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে চার্লস লরেনের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া। তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেখানে তার রাজকীয় পোশাক এবং হাতের রাজদণ্ড তার প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ফুটে উঠেছে। বেলজিয়ামের নাগরিকরা তাকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘জনদরদী শাসক’ হিসেবে গণ্য করেন দেখেই এই ভাস্কর্যটি আজও পরম শ্রদ্ধায় সংরক্ষিত আছে।
জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রসারে এক অনন্য অবদান
চার্লস লরেন কেবল প্রাসাদে বসে শাসন করেননি, তিনি ব্রাসেলসকে ইউরোপের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে স্থান করে দিতে পরিশ্রম করেছেন। তিনি একটি বিশাল রাজকীয় গ্রন্থাগার এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা আজও বেলজিয়ামের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। তার ব্যক্তিগত বিজ্ঞানাগার এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সংগ্রহ সে সময়ে পুরো ইউরোপে আলোচনার বিষয় ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটি জাতির উন্নতির জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা অপরিহার্য। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই তিনি আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন। চার্লস লরেনের শাসনামলকে বেলজিয়ামের ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ যুদ্ধের দামামার মাঝেও তিনি এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই মহান শাসকের জীবন ও কর্ম আজও আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতার সাথে যদি শিল্পের সমন্বয় ঘটে, তবে তা কালজয়ী হয়ে টিকে থাকে।
প্রচ্ছদের ছবি: সংগৃহীত