Thursday 11 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গাড়ি ও যানজট মুক্ত শহর রয়েছে যেসব দেশে

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১১ জুন ২০২৬ ১৯:০২

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই কান ফাটানো হর্ন, জ্যামে আটকে থেকে বাসের চালকের সাথে তুমুল ঝগড়া। আর কালো ধোঁয়ায় ফুসফুস মরণাপন্ন !এটি আমাদের চেনা শহরের চিরন্তন বাস্তব চিত্র। কিন্তু কেমন হতো যদি কাল সকালেই এমন এক শহরে আপনার চোখ খোলে যেখানে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল নেই, গাড়ির কোনো তাড়া নেই, আর চারপাশটা একদম শান্ত? রূপকথা মনে হলেও এই পৃথিবীতেই এমন কিছু জাদুকরী শহর আছে, যেখানে যান্ত্রিক চাকার রাজত্ব পুরোপুরি নিষিদ্ধ। হুম সত্যিই। এমনও দেশ আছে বিশ্বে। আজ জানাবো এমনই হর্ন আর ধোঁয়ামুক্ত বিশ্বের সেইসব আজব এবং চমৎকার শহরের কথা, যেখানে জীবনের গতি চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছন্দে।

বিজ্ঞাপন

ভেনিসের জলপথ; যেখানে রাজকীয় গণ্ডোলা-ই ভরসা

গাড়ি ছাড়া শহরের কথা ভাবলে সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইতালির স্বপ্নের শহর ভেনিসের (Venice) নাম। ১২৬টি ছোট ছোট দ্বীপের ওপর গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরে কোনো পিচঢালা সড়ক বা ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। ৪টি প্রধান জেলা এবং ৪০০-এর বেশি সেতুর এই শহরে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো পা অথবা ঐতিহ্যবাহী নৌকা ‘গণ্ডোলা’ ও ওয়াটার ট্যাক্সি (Vaporetti)। এখানে কোনো নাগরিক বা পর্যটকের গাড়ি নিয়ে প্রবেশের অনুমতি নেই। শহরের বাইরে নির্দিষ্ট পার্কিং লটে গাড়ি রেখে তবেই ভেনিসে পা রাখতে হয়। হর্ন আর কালো ধোঁয়ার তীব্র কোলাহল থেকে মুক্ত এই শহরটি তাই শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রেখেছে তার আদিম শান্ত রূপ।

মরক্কোর ফেজ আল বালি; যেখানে এখনোও চলে গাধা

উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর প্রাচীন বাণিজ্য কেন্দ্র ‘ফেজ আল বালি’ (Fes el-Bali) বিশ্বের বৃহত্তম গাড়িহীন নগর এলাকা হিসেবে স্বীকৃত। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত এই প্রাচীন শহরের ভেতরের প্রায় ৯,৪০০টি আঁকাবাঁকা গলি এতই সরু যে সেখানে একটি ছোট গাড়ি ঢোকারও কোনো অবকাশ নেই। শতাব্দী প্রাচীন এই শহরের অর্থনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল থাকে সম্পূর্ণ পায়ে হেঁটে। আর ভারী কোনো পণ্য বা বাণিজ্যিক মালামাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার জন্য এখানকার মানুষ ব্যবহার করে গাধা কিংবা হাতে টানা গাড়ি। যান্ত্রিক কোলাহলহীন এই মধ্যযুগীয় পরিবেশ দেখতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ভিড় করেন এখানে।

সুইজারল্যান্ডের জেরমাট; বৈদ্যুতিক যান-ই সম্বল

ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এবং আল্পস পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত সুইজারল্যান্ডের সুন্দর শহর জেরমাট (Zermatt)। বরফে ঢাকা এই পাহাড়ি শহরের পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সেখানে সব ধরনের জ্বালানিচালিত মোটরযান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাহাড়ের বুক চিরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই শহরে চলাচলের জন্য কেবল পায়ে হাঁটা পথ, বাইসাইকেল এবং বিশেষ অনুমোদিত কিছু ছোট ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহৃত হয়। তবে আধুনিক সময়ে জরুরি সেবা ও পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পরিবেশবান্ধব ছোট বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি ও বাসের ব্যবহার দেখা যায়, যা কোনো শব্দ বা ধোঁয়া ছড়ায় না। ফলে এখানকার বাতাস থাকে সবসময় শতভাগ সতেজ ও প্রাণবন্ত।

নেদারল্যান্ডসের গিটহর্ন, চলতে হবে বাইসাইকেল

নেদারল্যান্ডসের এক অপরূপ সুন্দর গ্রাম গিটহর্ন (Giethoorn), যাকে অনেকেই ‘উত্তরের ভেনিস’ বলে ডাকেন। এই শান্ত লোকালয়টিতে কোনো পাকা রাস্তা বা রাজপথের অস্তিত্ব নেই। এখানকার বাসিন্দাদের এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি কিংবা বাজারে যেতে হলে ব্যবহার করতে হয় ছোট ছোট নৌকা (Punters) অথবা বাইসাইকেল। খালের ওপর তৈরি কাঠের ছোট ছোট ফুটব্রিজ বা পায়ে হাঁটা সেতু পার হয়েই এখানকার মানুষ দৈনন্দিন কাজ সারেন। কোনো গাড়ির যান্ত্রিক গর্জন না থাকায় এই পুরো এলাকায় শুধু পাখির ডাক আর পানির কলকল শব্দ শোনা যায়, যা এক মায়াবী ও শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।

কেনিয়ার প্রাচীন শহর লামু, এখানে গাধার পিঠে রাজকীয় সফর

আফ্রিকান সংস্কৃতির এক অনন্য প্রাচীন নিদর্শন হলো কেনিয়ার ‘লামু’ (Lamu) শহর। সোয়াহিলি ভাষার এই ঐতিহ্যবাহী জনপদে আধুনিক কোনো মোটর গাড়ির প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আঁকাবাঁকা ও সরু গলিপথে যাতায়াত কিংবা ভারী মালপত্র বহনের জন্য এখানকার মানুষ এখনো আদিম ও বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে গাধা ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়ার জন্য তাদের প্রধান ভরসা ‘ধাও’ নামের এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী জলযান। প্রাচীন এই জীবনযাত্রাকে ধরে রাখার কারণে ১৯৬০ সাল থেকেই এই স্থানটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

আবার যেখানে থমকে দাঁড়ায় যান্ত্রিক সভ্যতার অহংকার

আধুনিক মানুষ যখন প্রযুক্তির গতি আর বড় বড় রাজপথের অহংকারে মত্ত, তখন এই গাড়িহীন শহরগুলো যেন এক পরম শান্তির মরূদ্যান। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনকে উপভোগ করতে হলে সবসময় তীব্র গতিতে ছুটতে হয় না; মাঝে মাঝে একটু ধীরস্থির হয়ে চারপাশের সৌন্দর্যকে অনুভব করতে হয়। হর্ন আর কালো ধোঁয়ার চিরচেনা ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা এই জায়গাগুলো কেবল পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং মানসিক শান্তির জন্য এক আদর্শ আশ্রয়স্থল। যান্ত্রিক কোলাহলের এই যুগে এসেও বুক ভরে এক ফোঁটা তাজা বাতাস নেওয়ার জন্য এই শহরগুলোর জুড়ি মেলা ভার!

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর