সিলেট: সাতশ’ বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উদযাপিত হলো ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই উৎসবকে ঘিরে সিলেটে শুরু হয় আধ্যাত্মিক পরিবেশ। সুফি সাধক হজরত শাহ জালাল (রহ.)-এর জীবনের একটি শিক্ষণীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ উৎসব এবারও ভক্ত-অনুরাগীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) যোহরের নামাজ শেষে হজরত শাহ জালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। ঢাক-ঢোল, ব্যান্ডের বাদ্য এবং স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাজার প্রাঙ্গণ।
‘শাহজালাল বাবা কি জয়’, ‘লালে লাল, বাবা শাহ জালাল’ এবং ‘৩৬০ আউলিয়া কি জয়’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে হাজারো মানুষ খালি পায়ে যাত্রা করেন সিলেট শহরতলীর লাক্কাতুরা চা-বাগান সংলগ্ন টিলার উদ্দেশে, যা মাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ভক্তদের হাতে দেখা যায় লাল কাপড়ে মোড়ানো দা ও কুড়ালজাতীয় সরঞ্জাম, যা দিয়ে টিলার গাছের ডালপালা সংগ্রহ করা হয়। তবে স্থানীয় নিয়ম ও পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে কোনো জীবন্ত গাছ কাটা হয়নি; বরং লাক্কাতুরা ও মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের পূর্বে সংগ্রহ করা ডালপালাই ব্যবহৃত হয়।
প্রায় ৭০০ বছর ধরে পালিত হয়ে আসা এই ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসবের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে হজরত শাহ জালাল (রহ.)-এর জীবনের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ‘লাকড়ি তোড়া’ যার অর্থ কাঠ সংগ্রহ ও কাটা। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, সমাজে অবহেলিত এক কাঠুরিয়ার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও মানুষের সমতার শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যেই এই প্রতীকী কার্যক্রমের সূচনা।
উৎসবের একপর্যায়ে লাক্কাতুরা টিলায় অনুষ্ঠিত হয় মিলাদ মাহফিল। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তাবারক বিতরণ করা হয়। এরপর ভক্তরা সংগৃহীত লাকড়ি নিয়ে পুনরায় মাজারে ফিরে আসেন এবং সেগুলো বড় দিঘিতে তিনবার ডুবিয়ে পরে নির্দিষ্ট স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। জানা যায়, আসন্ন হজরত শাহ জালাল (রহ.)-এর ওরসের শিরনি রান্নায় এই লাকড়িই ব্যবহার করা হবে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের আগামী ৭ ও ৮ মে অনুষ্ঠিত হবে মাজারের ৭০৭তম বার্ষিক ওরস। আর সেই ওরসের রান্নার জন্যই এই উৎসবে সংগ্রহ করা হয় জ্বালানি কাঠ।
মাজার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শতাধিক বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্য হিজরি সনের হিসাব অনুযায়ী মূল ওরসের কয়েক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সংগৃহীত জ্বালানি কাঠ পরে হজরত শাহজালাল (রহ.)–এর পুকুরে ধুয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করা হয়, যা ওরসের রান্নার কাজে ব্যবহার করা হবে।
এ বিষয়ে মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও লাকড়ি তোড়া উৎসব অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন ছিল উৎসবমুখর। সামনে ওরসও সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।’
‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব প্রসঙ্গে প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী ইতিহাস থেকে জানা যায়, একবার সিলেট বিজয় দিবসের কয়েক দিন আগে এক কাঁঠুরে আসেন শাহজালাল (রহ.)- এর কাছে অনুযোগ নিয়ে। কাঠুরে ফরিয়াদ জানান, তার ঘরে বিবাহযোগ্য পাঁচ মেয়ে রয়েছে; কিন্তু, তিনি পেশায় কাঠুরে ও নিচু জাতের হওয়ায় কেউই তার মেয়েদের বিয়ে করতে চাইছে না। এ কথা শুনে শাহজালাল কাঠুরিয়াকে সিলেট বিজয় দিবসে দরগায় আসার কথা বলেন।
পরবর্তী বিজয় দিবসে সঙ্গী আউলিয়া, ভক্ত ও আশেকানরা এলে হযরত শাহজালাল (রহ.) সবাইকে নিয়ে লাক্কাতুড়া বাগানে গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করেন। ফিরে এসে তিনি ভক্তদের কাছে জানতে চান তারা আজ কী কাজ করেছেন। উত্তরে সবাই বললেন, তারা কাঠুরিয়ার কাজ করেছেন। এরপর শাহজালাল সবাইকে কাঠুরের দুঃখের কথা বললে অনেক ভক্ত কাঠুরের মেয়েদের বিয়ে করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেখান থেকে কাঠুরে মেয়েদের জন্য বর পছন্দ করেন। এ ঘটনার পর থেকে সাম্য ও শ্রেণি বৈষম্যবিরোধী দিবস হিসেবেও দিনটি পালন করেন ভক্তরা। সেই থেকে এটি ‘লাকড়ি তোড়া’ হিসেবেই ঐতিহ্যবাহী এক উৎসব পালিত হয়ে আসছে।