সাতক্ষীরা: টানা গরমের পর কালবৈশাখী ঝড় স্বস্তি দিলেও সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে রেখে গেছে ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ। শুক্রবার (২৯ মে) দুপুরের দিকে এ ঝড় আঘাত হানে। ঝড়ে ৯ বছর বয়সি এক শিশুর গাছচাপায় মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ঝড়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া বিদ্যুৎ শনিবার (৩০ মে) পর্যন্তও সচল হয়নি। ফলে ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়ি ফেরা মানুষসহ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, ঝড়ের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় এখনও জেলার অন্তত ২০ হাজার গ্রাহক সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন। এদিকে বিদ্যুৎ না থাকা এবং কর্মকর্তাদের অবহেলার অভিযোগে আজ শনিবার মানববন্ধনও করেছে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
৫০ লাখ টাকার ক্ষতি, এখনও বন্ধ ২০ হাজার গ্রাহকের বিদ্যুৎ
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরী) মো. মনির হোসেন জানান, গতকালের ঝড়ে বিদ্যুৎ লাইনের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ১৯২টি স্থানে লাইনের তার ছিঁড়ে গেছে। এ ছাড়া ২৭টি ক্রসআর্ম ভেঙে গেছে এবং গ্রাহক পর্যায়ের অন্তত ২৩০টি মিটার পুড়ে ও ভেঙে নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ঝড়ের কারণে লাইনের ওপর গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। জেলাজুড়ে আমরা এমন প্রায় ২৭৫টি স্পট চিহ্নিত করেছি। তীব্র বাতাসে ১১টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে এবং আরও ৩৬টি খুঁটি হেলে গেছে। আমাদের পুরো টিম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গতকাল সারারাত কাজ করেছে। আজ সকাল থেকে নতুন আলাদা টিম গঠন করে মেরামত কাজ চালানো হচ্ছে। জেলাজুড়ে আমাদের সাড়ে ৬ লাখ গ্রাহকের মধ্যে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন আছেন। প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাছাকাছি।’
শ্যামনগরে তীব্র ক্ষোভ, কর্মকর্তাদের ফোন না ধরার অভিযোগে মানববন্ধন
বিদ্যুৎ না থাকা এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে আজ রাস্তায় নেমেছেন শ্যামনগরের সাধারণ মানুষ। শ্যামনগরবাসীর ব্যানারে আজ এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
শ্যামনগর রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ইমরান হোসেন পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও অবহেলার অভিযোগ এনে বলেন, ‘গতকাল গভীর রাতে কিছুক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ এলেও তা স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২-১৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। আমাদের স্পষ্ট মনে হচ্ছে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করেই এখানে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখছে। অন্যান্য এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও আমাদের চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগও দেওয়া হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় বিষয়, মানুষ যখন চরম দুর্ভোগে, তখন পল্লী বিদ্যুতের স্থানীয় ডিজিএম বা এজিএমদের সরকারি নম্বরে ফোন করলেও তারা ফোন ধরছেন না।’
গাবুরায় ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, খোলা আকাশের নিচে পরিবার
উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিম বলেন, ‘উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঝড়ে বেশ কয়েকটি পরিবারের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল বলেন, ‘ঝড় শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের ৬-৭টি টিনের চালা উড়ে যায়। নিজের টাকায় ঘর মেরামত করার সামর্থ্য নেই, পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
আরেক ভুক্তভোগী মোকছেদ গাজী জানান, তার ঘরের চাল উড়ে গেছে, সামনে বৃষ্টি হলে থাকার কোনো উপায় থাকবে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন জরুরি সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছে।
ঝড়ে তালগাছ ভেঙে পড়ে ৯ বছরের শিশুর মৃত্যু
এদিকে, গতকালের এই আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে শ্যামনগরে তালগাছ ভেঙে পড়ে শারমিন নামে ৯ বছর বয়সি এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শারমিন ঈশ্বরীপুর গ্রামের আব্দুর রউফের মেয়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেলে বাড়ির পাশে খেলছিল শারমিন। হঠাৎ ঝড় শুরু হলে একটি বড় তালগাছ ভেঙে তার গায়ের ওপর পড়ে। এতে সে গুরুতর আহত হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান জানান, হাসপাতালে আনার আগেই শিশু শারমিনের মৃত্যু হয়েছিল।
ঝড়ের পর থেকে পুরো এলাকায় যেমন শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তেমনই বিদ্যুৎহীনতা আর ঘরবাড়ি হারানোর কষ্টে কাটছে উপকূলের মানুষের আজকের দিনটি।