যশোর: মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলের ফেরার আনন্দে বুক বেঁধেছিলেন মা। দীর্ঘ ১১ বছর পর ছেলে ফিরছে ঘরে, আগামীকাল বুধবার (৩ জুন) যাওয়ার কথা ছিল পাত্রী দেখতে। কিন্তু সেই আনন্দ রূপ নিলো বিষাদে। এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের বাকি তিনজন সদস্যের সঙ্গে তিনিও নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর পৌনে ৪টার দিকে ভাঙ্গা-মাওয়া-ঢাকা এক্সপেসওয়ের ফরিদপুরের মালিগ্রাম এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
এর আগে, সোমবার (১ জুন) রাতে মালয়েশিয়া থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌছান প্রবাসী আরিফুল ইসলাম। তাকে আনতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। প্রাইভেটকারে যশোরের ঝিকরগাছায় বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে এ দুর্ঘটনা।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী নূর জাহান বেগম (৫০), মেয়ে আয়শা খাতুন (২৮) ও ছেলে মো. আরিফুল ইসলাম (২৫) এবং আরেক ছেলে রাকিবুল ইসলাম(১৯)। নিহত প্রাইভেট কারের চালক জাহিদ হোসেনের (৩২) বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার গৌরীপুর গ্রামে। তিনি মো. ইসলামের ছেলে।
তাদের মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

নিহতের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
স্থানীয়রা জানান, ভূমিহীন পরিবারের সন্তান আরিফ ১১ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছিলেন দূর প্রবাসে। মালয়েশিয়ায় ঘাম ঝরানো উপার্জনে ৫ শতক জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। দীর্ঘ এক দশক পর, গতকাল সোমবার (১ জুন)রাতে ছুটিতে দেশে ফেরেন আরিফুল। একবুক আশা ও আনন্দ নিয়ে প্রিয় সন্তান আর ভাইকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিলেন মা নুরজাহানসহ পুরো পরিবার। কিন্তু দুর্ঘটনার কারণে এখন সেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে,পরিবারের ৫ সদস্যের মধ্যে বাড়িতে থাকার কারণে বেঁচে গেছেন হতভাগা পিতা শহিদুল ইসলাম। স্বজনদের হারিয়ে পাগলপ্রায় শহিদুল ইসলাম।
আরিফুলের মামা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একই পরিবারের চারজন মারা যাওয়ায় বাড়িতে কান্নারও লোক নেই।’
আরেক মামা আবদুল কাদের বলেন, ‘১৮ বছর বয়সে বিদেশ গিয়েছিল আরিফুল ইসলাম । অভাবের সংসার ছিল। এখন তাদের সুখের সংসার। যখন সুখ ভোগ করবে তখন পরিবারের চারজন চলে গেল।’
মামাতো ভাই মিন্টু রহমান বলেন, ‘ফরিদপুরে তাদের মরদেহ আনতে স্বজনেরা গেছেন। রাতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন করা হবে।’
উল্লেখ্য, ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম নামক এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা সিলিন্ডার বোঝাই একটি ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় প্রাইভেটকারটি। এতে প্রাইভেটকারটি দুমড়েমুচড়ে ট্রাকের পেছনে ঢুকে যায়। এতে প্রাইভেটকারের চালক এবং চারজন যাত্রী গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শিবচর হাইওয়ে থানা পুলিশ হতাহতদের উদ্ধার করে ভাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠিয়ে দেয়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক চারজনকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া দুই শিশুসহ আরও ৩ জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসক আরও একজনকে মৃত ঘোষণা করেন এবং বাকি দুইজনকে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এ ব্যাপারে ভাঙ্গা ফায়ার স্টেশন ম্যানেজার আবু জাফর জানান, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে সংবাদ পেয়ে আমরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাইভেট কারের চালক ও যাত্রীদের উদ্ধার করি। এ সময় প্রাইভেটকারটি চালকসহ ট্রাকের পেছনে আটকে ছিল। পরবর্তীতে প্রাইভেটকারটির কিছু অংশ কেটে চালককের লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।