Saturday 03 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বন্ধ হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক!

আদিল খান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৫৯ | আপডেট: ৪ অক্টোবর ২০২৬ ০০:০০

পদ্মা ব্যাংক পিএলসি। ফাইল ছবি

ঢাকা: দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে পদ্মা ব্যাংক পিএলসি। নানান চেষ্টার পরও ব্যাংকটি তারল্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন পরিস্থিতি কাটাতে গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেখানে ব্যাংকের সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও সমাধানের কোনো পথ বের করা সম্ভব হয়নি। ফলে পদ্মা ব্যাংকের সংকট কাটাতে অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকটি অবসায়নের (বন্ধ) অনুমোদন ইস্যুটি চলতি মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদে উঠছে। সেখানে অুনমোদন সাপেক্ষে ব্যাংকিং রেজ্যুলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুরু হবে ব্যাংক বন্ধের কার্যক্রম। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারা, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকটে থাকা পদ্মা ব্যাংক অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকটিরে পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষ্যে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কিন্তু এতেও সংকট কাটেনি। তারল্য সংকট ম্যানেজ করতে পারছিল না ব্যাংকটি। এমনকি উত্তরণের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও দেখাতে পারেনি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। বরং, ঘুরে দাঁড়াতে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাখান করে। পরে ব্যাংকটিকে আগের অবস্থায় না রেখে অবসায়নের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে তারল্য সহায়তা না দেওয়া এবং একীভূত যাতে না করা হয়, তা নিয়ে পদ্মা ব্যাংক বর্তৃপক্ষ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা একমত পোষণ করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর সারাবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা ব্যাংক একটি বিষফোঁড়া। এর দায় আর কত টানা যায়। সবকিছু বিবেচনায় বর্তমান অবস্থায ব্যাংকটি রাখা হবে না। ব্যাংকটি বন্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তা যদি না করা যায়, অন্তত সরকার দায়-দেনা কমিয়ে কোনো সরকারি ব্যাংকের কাছে অধিগ্রহণ দিতে চায়; যেহেতু কোনো ব্যাংকই পদ্মার সঙ্গে একীভূত হতে চায় না। অতীতে এক্সিম ব্যাংককে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, তা ব্যর্থ হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, পদ্মা ব্যাংকের মোট সম্পদ সাত হাজার কোটি টাকা। আর গত জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। তার মধ্যে চার হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। যা শতকরা হিসাবে ৯০ শতাংশ। তার আগের বছর জুনে খেলাপি ছিল পাঁচ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা ঋণের প্রায় ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মূলত ঋণ পুনঃতফসিল এবং এক্সিট কর্মসূচির আওতায় কিছু টাকা আদায় করছে ব্যাংকটি। সেই সঙ্গে খেলাপির পরিমাণও কিছুটা কমেছে।

ব্যাংকির তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, জুনে পদ্মা ব্যাংকের স্থিতি ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা, যার বড় একটি অংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। পদ্মা ব্যাংকে ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর অন্যতম। এ ছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংক থেকে ফেরত পাওয়ার সহজ পথ নেই।

পদ্মা ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকটির বর্তমানে ৬০টি শাখা, ১৪টি উপ-শাখা এবং ছয়টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। পদ্মার জনবল প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। যদিও ২০১৩ সালে ফারমারর্স ব্যাংক নাম নিয়ে কার্যক্রম শুরুর মাত্র চার বছরের মাথায় অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে ব্যাংকটি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের চাপে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদিত এই ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগিয়ে আসে। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক পদ্মার পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে, নাম পরিবর্তন করে, মূলধন জোগান দেয় এবং নজিরবিহীন নীতিগত সহায়তা দেয়। কিন্তু এর কোনোটিই কাজে আসেনি। বরং, ব্যাংকটি ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে, যা ব্যাংকটির মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। বদনাম ঢাকতে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি দ্য ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুরুতেই ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করাই ছিল ভুল। তাদের মতে, সে সময় ব্যাংকটি অবসায়ন করা অথবা জোরপূর্বক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের খরচ অনেক কম হতো। এখন কর্তৃপক্ষ যদি ব্যাংকটি অবসায়নের উদ্যোগ নেয়, তাহলে এর বিপুল সঞ্চিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি সরকারকেই বহন করতে হবে—যার অর্থ জোগাতে হবে করদাতাদের টাকা থেকে। কেননা, ২০১৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি মিলে পদ্মা ব্যাংকে নতুন করে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে করা এসব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সেই অর্থ ফেরত পায়নি।

মো. শওকত আলী খান রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে পদাধিকারবলে পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান। পদ্মা ব্যাংক সম্পর্কে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘ব্যাংকটির তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানত ও মূলধন শেষ হয়ে গেছে। সঞ্চিত লোকসান এখন ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। ঋণ আদায় ছাড়া কর্মকর্তাদের তেমন কোনো কাজ নেই। ব্যয় কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে অনেক আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা কিছুই করতে পারেনি। সরকারি নির্দেশে আমরা পদ্মা ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন এর ভবিষ্যৎ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকেই নিতে হবে।’

অপরদিকে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী মো. তারহার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সারাবাংলার এই প্রতিবেদক মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি ধরেননি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার জবাব দেননি।

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পদ্মা ব্যাংকের ক্ষেত্রে শুধু নতুন করে তারল্য সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমাধান সম্ভব নয়। প্রথমে ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদ ও দায় নিরূপণ, ঋণপোর্টফোলিওর গুণগত মান যাচাই, বড় খেলাপিদের সম্পদ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত আদায়যোগ্য অর্থ নির্ধারণ করতে হবে। এটা বুঝতে হবে, শুধু নাম পরিবর্তন বা পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন করলেই একটি দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা যায় না। খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা না হলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সারাবাংলা‌কে বলেন, ‘ব্যাংকের বর্তমান যে নাজুক পরিস্থিতি, তাতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক স্বেচ্ছায় পদ্মা ব্যাংকের দায়িত্ব বা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইবে না। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান এবং মূলধন ঘাটতি এতটাই বেশি যে তা কাটিয়ে ওঠা সাধারণ প্রক্রিয়ায় অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা বা কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা অত্যন্ত কঠিন। সবকিছু মিলিয়ে গুটিয়ে ফেলা (অবসান বা লিকুইডেশন) ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’

বিজ্ঞাপন

বন্ধ হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক!
৩ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৫৯

আরো

সম্পর্কিত খবর