Friday 17 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
ইরান ইস্যুতে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন ঝিমিয়ে কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:০২

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই তেহরানের এঙ্গেলেব চত্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিরোধী বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ সাত সপ্তাহ পার করেছে। গত ১০ দিন ধরে পাকিস্তান-মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও পরিস্থিতি এখনো থমথমে। এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ‘সমগ্র সভ্যতা’ মুছে ফেলার হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পালটা জবাব দিচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই যুদ্ধ জনমনে চরম জনপ্রিয়হীন হওয়া সত্ত্বেও (যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ২১% সমর্থন) ইউক্রেন বা গাজা যুদ্ধের মতো বড় ধরনের কোনো গণবিক্ষোভ বা রাজপথে গণ-আন্দোলন দেখা যাচ্ছে না। কেন এমন হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকরা এর পেছনে বেশ কিছু মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন।

‘ভিডিও গেম’ যুদ্ধের প্রভাব ও কম মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধকে অনেকটা ‘ভিডিও গেম’র মতো পরিচালনা করছে। ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হামলা চালানোয় পেন্টাগনের ভিডিওগুলোতে কেবল লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের দৃশ্য দেখা যায়, মানুষের রক্ত বা দুর্ভোগ সেখানে অনুপস্থিত।

এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং কোনো বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু হয়নি। ফলে মার্কিন জনগণের মধ্যে নিজেদের স্বজন হারানোর ভয় বা নৈতিক তাড়না সেভাবে তৈরি হয়নি।

পূর্ববর্তী যুদ্ধের ক্লান্তি ও মোহভঙ্গ

গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আন্দোলনের পরেও সেই ‘গণহত্যা’ থামাতে না পারার ব্যর্থতা আন্দোলনকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তি এবং মোহভঙ্গ তৈরি করেছে। অনেক অ্যাক্টিভিস্ট এখন নতুন কোনো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।

ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন এবং আমদানিশুল্কের মতো অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে এত বেশি অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছে যে, সাধারণ মানুষ কোনটি ছেড়ে কোনটির প্রতিবাদ করবে তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনটি ট্রাম্প-বিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।

ইরানের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও প্রবাসীদের বিভক্তি

গাজার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের একটি ‘উপনিবেশিত জাতি’ হিসেবে দেখা হয়, যা নৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ করে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। ইরান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের ইতিহাস রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরোধী অনেকেই ভয় পান, যুদ্ধের প্রতিবাদ করলে তারা হয়তো পরোক্ষভাবে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে ফেলবেন। এ ছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসরত ইরানি প্রবাসীরা এই যুদ্ধ নিয়ে চরমভাবে বিভক্ত।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন

ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হলেও এবার সেখানে নীরবতা বিরাজ করছে। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, স্টুডেন্ট ভিসা বাতিল, আইসিইর মাধ্যমে শিক্ষার্থী অপহরণ এবং ফান্ড বন্ধের হুমকি।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর আইন, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে যুক্ত থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে বহিষ্কার বা মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে, যা একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব এখনো সহনীয়

ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলেও এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়লেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব এখনো ‘সহ্যসীমার’ বাইরে যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতি সরাসরি প্রতিটি পরিবারের পকেটে আঘাত হানবে, তখনই হয়তো মানুষ রাজপথে নামতে শুরু করবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করে এবং মার্কিন সেনাদের লাশের সারি বাড়তে থাকে, অথবা যদি ইরানি নাগরিকদের মানবিক বিপর্যয়ের ছবিগুলো সামনে আসতে থাকে, তবে এই ঝিমিয়ে পড়া প্রতিবাদই একটি শক্তিশালী গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর