যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে নতুন ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো এই প্রস্তাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান।
মঙ্গলবার (১৯ মে) ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এসব শর্ত প্রকাশ করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- শুধু ইরান নয়, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।
প্রস্তাবটি নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক মন্তব্যে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, তেহরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত বৈদেশিক অর্থ মুক্ত করা এবং দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক নৌ অবরোধের প্রত্যাহারও চায়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে আগের অবস্থান থেকে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। গত সপ্তাহেও তেহরানের দেওয়া প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এর মধ্যেই সোমবার (১৯ মে) ট্রাম্প জানান, ইরানের নতুন প্রস্তাব পাওয়ার পর তিনি দেশটির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নতুন হামলা স্থগিত করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘যদি ভয়াবহ বোমাবর্ষণ ছাড়াই একটি সমাধানে পৌঁছানো যায়, তাহলে আমি খুবই খুশি হব।’
এর আগে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা তাকে হামলা স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছেন, কারণ একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশ এবং এর বাইরের বিশ্বের জন্যও গ্রহণযোগ্য হবে।’
বিশ্বের তেল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপের মুখে ট্রাম্প এর আগেও আশা প্রকাশ করেছিলেন, সংঘাত অবসানের চুক্তি খুব কাছাকাছি। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, সমঝোতা না হলে ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানো হবে।
এদিকে পাকিস্তানের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত মাসে অনুষ্ঠিত একমাত্র শান্তি আলোচনার পর থেকেই ইসলামাবাদ দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। সেই সূত্রের ভাষ্য, ‘দুই পক্ষই বারবার নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছে এবং আলোচনার জন্য সময় খুবই সীমিত।’
যদিও প্রকাশ্যে কোনো পক্ষই ছাড় দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি, তবে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা দেশটির আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজে দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন কিছু বিষয়ে নমনীয়তা দেখাতে শুরু করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থের এক-চতুর্থাংশ ছাড় করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে। এই অর্থের পরিমাণ কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার। যদিও ইরান সব সম্পদই মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ইরানকে কিছু শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন আরও নমনীয়তা দেখিয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। বরং এক মার্কিন কর্মকর্তা তাসনিম নিউজে প্রকাশিত তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিলের খবরটি অস্বীকার করেছেন।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। পরে এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পুরো পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। একই সময়ে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। তবে, ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব এখনও ধরে রেখেছে।