Monday 18 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

শিক্ষার্থীকে গুলি ও অবৈধ অস্ত্র রাখায় মেডিকেল শিক্ষকের ২১ বছরের কারাদণ্ড

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৮ মে ২০২৬ ১৬:১০

সাজাপ্রাপ্ত মেডিকেল শিক্ষক রায়হান।

সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমালকে গুলি করে আহত করা এবং অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার মামলায় কলেজটির প্রভাষক ডা. রায়হান শরীফকে ২১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে দুটি ধারায় পৃথক সাজা দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১৮ মে) দুপুরে সিরাজগঞ্জের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক ও জেলা দায়রা জজ মো. ইকবাল হোসেন জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের সময় আদালত কক্ষে আইনজীবী, শিক্ষার্থী, স্বজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট রফিক সরকার জানান, অস্ত্র আইনের দুটি ধারায় আদালত ডা. রায়হান শরীফকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। এর মধ্যে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় তাকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১৯ (এফ) ধারায় আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সাজা কার্যকর হবে।

বিজ্ঞাপন

আদালতের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘একজন শিক্ষক ও চিকিৎসক সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে থাকেন। কিন্তু ডা. রায়হান শরীফ তার দায়িত্ব ও নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে বেআইনিভাবে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ম্যাগাজিন এবং ধারালো অস্ত্র নিজের কাছে সংরক্ষণ করেছিলেন। এমনকি তিনি এসব অস্ত্র নিয়মিত কর্মস্থলে নিয়ে যেতেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ভয়ংকর প্রবণতা।’

বিচারক আরও উল্লেখ করেন, ‘একজন শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশ ও দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি উল্টো তার ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে সন্ত্রাসী আচরণে জড়িয়ে পড়েন। আদালত মনে করেন, তার কর্মকাণ্ড সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।’

রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও জানানো হয়, রায়হান শরীফ ছাত্রজীবন থেকেই সশস্ত্র ক্যাডার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরও সেই প্রবণতা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারেননি। বরং তিনি আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তার এই আচরণ পরিবার, সহকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলেও আদালত মন্তব্য করেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ মার্চ শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের অ্যাকাডেমিক ভবনের চতুর্থ তলায় ক্লাস চলাকালে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমালের সঙ্গে ডা. রায়হান শরীফের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি নিজের কাছে থাকা বিদেশি পিস্তল বের করে তমালের পায়ে গুলি করেন। এতে তমাল গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দ্রুত আহত তমালকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে। পরে তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, ৮১ রাউন্ড গুলি, চারটি ম্যাগাজিন এবং দুটি অত্যাধুনিক ছোরা উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় সিরাজগঞ্জ সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ওয়াদুদ আলী বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটি তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে এই রায় দেন।

মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, অভিযুক্ত শিক্ষক পরিকল্পিতভাবে অবৈধ অস্ত্র বহন করতেন এবং তা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করতেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করলেও আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই বলেন, একজন শিক্ষক যখন অস্ত্র হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেন, তখন তা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে ওঠে। আদালতের এই রায় ভবিষ্যতে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।

এদিকে আহত শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমালের সহপাঠীরা রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, এই ঘটনা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা নয়, বরং পুরো শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তার ওপর আঘাত ছিল। দীর্ঘদিন পর হলেও আদালতের রায়ে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে মনে করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অবৈধ অস্ত্র বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলে তারা জানান।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর