ঢাকা: হাত বাড়ালেই মাদক মিলছে- সেটি কে না জানে? অফলাইন ও অনলাইনে দুই প্ল্যাটফর্মই নানান ধরণের মাদকের উৎস- সেটিও সবার জানা। তবুও মাদক প্রতিরোধ ও নির্মূল করতে পারছে না এসব নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো। একে অপরের ওপর দোষ চাপানো ও একে অন্যের প্রতি অভিযোগ দিয়েই যেন দায় সাড়ছে তারা।
মাদকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এমনকি শিক্ষকরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদক গ্রহণে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ সবাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তারপরও মাদকবিরোধী অবস্থান যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। মাদকের বিস্তার যতটা হচ্ছে, প্রতিরোধে ততটা প্রচার-প্রচারণা নেই। ফলে এক পর্যায়ে অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছে। তারা চায়, মাদক প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচার চালানো হোক। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে যে কঠোর আইন আছে- তা প্রযোগ করা হোক।
দেশে বর্তমানে মাদক প্রতিরোধে একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হিসেবে কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এ ছাড়া, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-এপিবিএনও সহযোগী সংস্থা হিসেবে মাদক প্রতিরোধে কাজ করে থাকে।
বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি জরিপ ও গবেষণায় বাংলাদেশে মাদক গ্রহণকারী ও আসক্ত মানুষের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী দেশে মাদক ব্যবহারকারী মানুষের আনুমানিক সংখ্যা প্রায় এক কোটি। সংস্থাগুলোর মতে, এই মুহূর্তে দেশে নিয়মিত মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে এ সংখ্যা প্রায় দেড় কোটির মতো।
মাদকদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসক্ত ইয়াবা ও অ্যালকোহলের প্রতি। আর আসক্তদের মধ্যে ৬০ থেকে ৮০ ভাগই কিশোর-তরুণ। সেই সঙ্গে পুরুষের পাশাপাশি নারীও। নারীদের মধ্যে ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যাই বেশি।
যেসব মাদকে ছেয়ে গেছে দেশ
ইয়াবা ও গাঁজা এ দেশের মাদকসেবীদের প্রধান নেশাদ্রব্য হলেও আফিম, অ্যাকোহলের মধ্যে মদ, বিয়ার ও হেরোইন রয়েছে। এর বাইরে আরও বেশ কিছু অপ্রচলিত মাদক রয়েছে। এর মধ্যে আইসসহ বেশ কয়েকটি নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। সেই সঙ্গে বিষাক্ত সীসা ও চোলাই মদও নেশার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।
ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মাদকের বিস্তার হচ্ছে। এতে অনেকে সহযোগিতা করছে। তার মধ্যে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিজিবির কতিপয় সদস্যরাও অর্থের লোভে পড়ে মাদক বিস্তারে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পরোক্ষ ভূমিকাও রয়েছে। দেশি-বিদেশি মাদক পাচার চক্রের সদস্যরাও মাদক বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
সীমান্তের স্থানীয় লোকজন মাদকের কারবারে বেশি জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সারাদেশে কারাগারগুলোতে যত সংখ্যক বন্দি রয়েছে তার বেশিরভাগই মাদক সংক্রান্ত মামলার। মাদক মামলার আসামিদের মধ্যে আবার বেশিরভাগই সীমান্ত এলাকার। তারা জেল থেকে বেরিয়ে ফের একই কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অভিযোগ
অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে মাদক বেচাকেনা বাড়লেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত ও দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকার অভিযোগ ওঠে। দায়িত্ব এড়িয়ে চলা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগই জনগণের প্রধান অভিযোগ বলে জানা যায়। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কখনো কখনো সরাসরি সম্পৃক্ততা ও প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, বাহিনীর কোনো কোনো অসাধু সদস্যের মদতে মাদক সিন্ডিকেটগুলো সক্রিয় থাকে এবং ঘুষ বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। দেশে মাদক প্রবেশের মূল রুটগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও কঠোর নজরদারি না থাকায় সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মাদক ঢুকছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের বা সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও পাওয়া যায়।
সরকার ও প্রশাসনের অবস্থান
মাদকবিরোধী সভায় সরকারের তরফ থেকে বারবার কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদরদফতর থেকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাহিনীর কোনো সদস্য মাদক চোরাচালান বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবুও মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে কেবল আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল
মাদকদ্রব্য বিস্তার রোধে কঠোর আইন থাকার পরও দুর্বল প্রয়োগের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইন প্রয়োগে ধীরগতি, দুর্নীতি, যথাযথ নজরদারির অভাব এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আইন প্রয়োগে দুর্বলতার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো-
মামলার ধীরগতি ও সাজা না হওয়া: প্রচলিত আদালতে মাদকসংক্রান্ত মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে যায় এবং মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।
মূল হোতাদের আড়াল হওয়া: আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সাধারণত খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীরা আটক হলেও গডফাদার বা মাদকের আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা প্রায়ই অধরা থেকে যায়।
সক্ষমতার অভাব ও সমন্বয়হীনতা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
দুর্নীতি: মাঠপর্যায়ে কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের কারণে মাদক কারবারিরা নিরাপদ রুট ও আশ্রয় পেয়ে থাকে।পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি মাদক সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
মাদকের আন্তর্জাতিক চোরাচালান প্রতিরোধে পদক্ষেপ
আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্র বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একটি বড় জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের কেন্দ্রে অবস্থানের ফলে দেশটিতে ইয়াবা, আইস (মেথামফেটামিন), হেরোইন ও কোকেনের মতো ভয়াবহ মাদকের বিস্তার ঘটছে। মাদকের বিস্তার ও অবৈধ পাচার প্রতিরোধে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে-
- কঠোর আইন ও নজরদারি: বৃদ্ধিমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি আইন সংস্কার করে যুগোপযোগী করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আইন প্রয়োগে আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
- সমন্বিত টহল ও যৌথঅভিযান সীমান্ত ও উপকূলবর্তী এলাকায়: বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্ট গার্ড, এবং পুলিশের সহায়তায় ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে কঠোর টহল জোরদার করা হয়েছে।
- যৌথ টাস্কফোর্স: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলার চেষ্টা চলছে।
- অনলাইন ও ডিজিটাল কারবার নিয়ন্ত্রণনতুন প্রজন্মের মাদকের প্রায় ৯০ শতাংশই অনলাইনে বেচাকেনা ও ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন হয়। এই অনলাইন কারবার ঠেকাতে মাদক আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
- চিকিৎসা ও সামাজিক সচেতনতামাদক নির্মূলে সরকার আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রমকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। শক্ত পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখার ওপর জোর দেওয়া।
মাদকের বিস্তার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাদকের যা বিস্তার হয়েছে তাতে আর প্রতিরোধের সুযোগ নেই। তবে এখন থেকে যেন এই বিস্তার প্রতিরোধে ব্যাপকভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সংখ্যা কম ছিল। সেইখানে জনবল বাড়ানো হয়েছে। তাদের অস্ত্রের বিষয়ে একটা প্রতিবন্ধকতা ছিল- সেই সমস্যাও সমাধান হয়েছে। এখন থেকে মাঠ পর্যায়ে অভিযানের সময় অস্ত্র থাকবে এবং গুলি চালাতে পারবে এমন সমাধান করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে ফাঁকা গুলি, এরপর পায়ে গুলি চালানোর নির্দেশনা আইন পাসের অপেক্ষায় আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে কাজ করছে। জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে গাইড মেনে চলা হচ্ছে।’
মাদক প্রতিরোধে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক নির্মূলে পারিবারিকভাবে সচেতনতা তৈরি এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর সবসময় জোর দেওয়া হলেও মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে সরকার, প্রশাসন ও জনগণকে আরও বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকের প্রশ্নে কাউকে ছাড় না দেওয়ার বিষয়টি সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে মাদকের বিস্তার প্রতিরোধে শিক্ষক ও অভিভাবকদের আরও বেশি কঠোর হতে হবে। মাদকের কঠোর আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
বিশ্ব মাদকবিরোধী দিবস
প্রতিবছর ২৬ জুন ‘আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস’বা মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হয়। মাদকদ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই দিবসটি পালন করা হয়। মাদকদ্রব্য ও অপরাধ সম্পর্কিত জাতিসংঘের কার্যালয় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধে বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া, বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে।