Thursday 08 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বহুমাত্রিক শিল্প-সংস্কৃতির মেলবন্ধনে বাংলাদেশ-চীন

ফারহানা নীলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৮ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৭ | আপডেট: ৮ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৫৬

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: শিল্প-সংস্কৃতির ভৌগোলিক কোনো মানচিত্র থাকে না। বহুকাল আগে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর পদধূলিতে যে সম্পর্কের ঐতিহাসিক বুনিয়াদ তৈরি হয়েছিল, শতবছর পর সেই সখ্যতা আজ কেবল কূটনৈতিক নথিপত্রে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে দুই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। মঞ্চের আলোয়, সুরের ঝংকারে, আলোর ক্যানভাসে, শারীরিক কসরতের নান্দনিক মহড়ায়, সুতোর নিখুঁত বুননে কিংবা রংতুলির আঁচড়ে; চীন আর বাংলাদেশ যেন আত্মিক মেলবন্ধনের সেতু তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ও চীনের শিল্পীদের এই গভীর সংযোগ প্রমাণ করে- ভাষা আলাদা হলেও যখন হৃদয় কথা বলে, তখন তা শিল্পের সর্বজনীন ভাষায় পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন

অ্যাক্রোবেটিকে চীন-বাংলা ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

মঞ্চের আলো ঝলমল করছে। কিছুটা থমথমে পরিবেশ। হঠাৎ শূন্যে লাফিয়ে উঠলেন এক তরুণী। কোনো সেফটি নেট নেই, কেবল শরীরের নিখুঁত ভারসাম্য আর সহশিল্পীদের আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করে ঘুরে এলেন একের পর এক ভয়ংকর সব চক্রে। মুহূর্তের মধ্যেই হলে ফেটে পড়ল তুমুল করতালি।

এটি কেবল একটি শারীরিক কসরতের দৃশ্য নয়; এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে চীনের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘উছিয়াও’ অ্যাক্রোবেটিক শিল্পের ব্যাকরণ আর বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদের একদল অদম্য তরুণ-তরুণীর জীবনের গল্প। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও চীনের হেবেই প্রদেশের বিখ্যাত ‘উছিয়াও অ্যাক্রোবেটিক আর্ট স্কুল’ (Wuqiao Acrobatic Art School)-এর এই যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

বলা যায়, চীন-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও গতিশীল অধ্যায়টি রচিত হয়েছে অ্যাক্রোবেটিক শিল্পে। চীনের উছিয়াও কাউন্টিকে বলা হয় বৈশ্বিক অ্যাক্রোবেটিক শিল্পের রাজধানী। হাজার বছরের প্রাচীন এই শিল্পকে চীনা ওস্তাদরা অত্যন্ত কঠোর অনুশাসনে লালন করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে রাজবাড়ী সেন্টারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাছাইকৃত সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের পাঠানো হয় উছিয়াও ও বেইজিং আর্টস স্কুলে।

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

চীনা মাস্টারদের অধীনে তাদের দিন শুরু হতো ভোর পাঁচটায়। ‘ডিশ স্পিনিং’, ‘সিঙ্গেল ট্যাংকার’, ‘রোলে-বোলে’, ‘চেয়ার সেটিং’ এবং শূন্যে শরীর ঝুলিয়ে ভারসাম্য রাখার মতো ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক কৌশলগুলো আয়ত্ত করতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়ে। চীনা উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খুদে শিল্পী রত্না সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘প্রথমে চীন গিয়ে ভাষা বুঝতে পারতাম না, খাবারও আলাদা ছিল। কিন্তু মাস্টারদের ভালোবাসা আর কঠিন অনুশীলন আমাদের শিখিয়েছে ভারসাম্য কেবল শরীরে নয়, মনের ভেতরেও তৈরি করতে হয়।’

প্রশিক্ষণ নিয়ে তরুণ কসরতবিদরা যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন সেখানে শুধু দৈহিক ভারসাম্য প্রদর্শিত হয় না; বরং সেখানে ফুটে ওঠে দু’টি প্রাচীন সভ্যতার গভীর আত্মিক যোগসূত্র। চীনা শারীরিক কসরতের সময় নেপথ্যে বেজে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত, লালনগীতি কিংবা ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী ও ঢোলের তাল। চীনা কৌশল ও বাংলার সুরের এই মেলবন্ধন দর্শককে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি দেয়। অ্যাক্রোবেটিকের মতো কঠিন মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের ঐতিহ্যকে যেভাবে সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে লালন করছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য নজির।

কস্টিউম ডিজাইনে চীন-বাংলাদেশ বুনন শিল্প

অ্যাক্রোবেটিকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিল্পীদের কস্টিউম ডিজাইনে ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। আবার সেই ডিজাইনের বাংলার ঐতিহ্য শিল্পের কারুকার্য। অন্যদিকে চীনা শিল্পীদের কস্টিউমেও ছিল তাদের নিজস্ব দেশীয় শিল্পের কারুকাজ।

এ বিষয়ে কস্টিউম ডিজাইনার এনামতারা সাকী সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুই দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই অ্যাক্রোবেটিক শো-তে কস্টিউম ডিজাইনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। আবার নিজ নিজ দেশের স্বকীয়তায় মিলও রয়েছে। আমি আমাদের অংশগ্রহণকারীদের পোশাকে যেমন দেশীয় সুতি কাপড়, গামছা কাপড় ও দেশীয় অ্যামব্রয়ডারির কারুকাজ ব্যবহার করেছি। চীনা পোশাকে তাদের দেশীয় সিল্ক কাপড়ে তাদের দেশীয় কিছু অ্যামব্রয়ডারির কারুকাজ ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, পরবর্তী সময়ে যদি আমরা এমন আয়োজন করি; যে আমাদের কস্টিউমগুলোতে আমরা ব্যবহার করব চীনা ডিজাইন। আবার চীন ব্যবহার করবে বাঙালি কারুকাজ। এতে করে, আমাদের দুই দেশের শৈল্পিক কস্টিউম ডিজাইন ধারণা আসবে। এবং পরবর্তী সময়ে আমাদের সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক দিকতো বটেই-পাশাপাশি পোশাক বাণিজ্য বা অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখবে।’

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকার বুকে ২ হাজার ৬০০ ড্রোনের মহাআয়োজন

সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এই যাত্রায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে এক অভিনব ও চোখধাঁধানো মাত্রা। প্রযুক্তি ও শিল্পের যুগলবন্দীতে ঢাকার রাতের আকাশকে ক্যানভাসে রূপান্তর। বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উপলক্ষ্যে ‘নতুন বছর, নতুন বাংলাদেশ’ থিমে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হয় এক অভূতপূর্ব ড্রোন শো।

১৩ জন চীনা ড্রোন বিশেষজ্ঞ ও ছয় সদস্যের কারিগরি দলের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় দুই হাজার ৬০০টি ড্রোনের আলো-ছায়ায় ফুটে ওঠে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ চেতনা। ১৪ মিনিটের এই প্রদর্শনীতে জুলাই অভ্যুত্থানের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা, শহিদ আবু সাঈদের সাহসী আত্মত্যাগ, ফিলিস্তিনের প্রতি মানবিক সংহতি এবং দুই দেশের মৈত্রী ও করমর্দনের দৃশ্য ঢাকার আকাশকে এক নতুন রূপ দেয়। প্রযুক্তিনির্ভর এই ক্যালিগ্রাফি ও আলোর ক্যানভাস প্রমাণ করে যে, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব এখন মাটি পেরিয়ে আকাশের উচ্চতা ছুঁয়েছে।

ড্রোন শো ব্যবস্থপনা টিমের অন্যতম সদস্য ও তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়ে আমি নিজেকে অনেকটাই ভাগ্যবান মনে করছি। নতুন এক শিল্প শিখলাম। কাজ করলাম। মানে হঠাৎ বিশাল আকাশ জুড়ে আলোর ঝলকানি, আর তার মাঝে যে শিল্প ফুটে উঠেছিল তা সত্যিই দেখার মতো। প্রথমে আমরা চিন্তায় ছিলাম, এত বড় একটা কাজ আমরা সম্পন্ন করতে পারব কিনা ঠিক মতো। ২৬০০ ড্রোন-শো’র আগে পর্যন্ত নিরাপদে রাখতে পারব কিনা, চীনের মতো আমরা কাজটা সম্পন্ন করতে পারব কিনা; যেহেতু আমরা অভ্যস্ত নই। এবং প্রথমবার। কিন্তু এতদিনের পরিশ্রম যে এত সুন্দর শৈল্পিকভাসে সম্পন্ন হয়েছে, সেটা আমাদের পুরো টিমের জন্য একটি মাইল-ফলক।’

তিনি বলেন, ‘এর ধারাবাহিকতায় চীন আমাদের দেশের ২৬ জন তরুণ-তরুণীকে এই ড্রোন প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে। এতদিন আমাদের যে ড্রোন পরিচালনার কারিগরি হ্যান্ডের অভাব ছিল সেটা আর নেই। আমরা চাইলেই এখন নিজেরাই এমন ড্রোন শো’র আয়োজন করতে পারব। এই ২৬ জন আবার যখন দেশের আরও ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দিবে, দিনে দিনে তখন টিম বড় হবে। কাজ আরও ভালোভাবে সফল হবে। এর মাধ্যমে শিল্পের একটি নতুন ধারায় আমরা গেলাম। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সমৃদ্ধি গঠন হলো।’

ফ্যাশন ফিউশন: দুই দেশের তাঁত ও বুনন শিল্প

পোশাক কেবল আবরণ নয়, পোশাক একটি দেশের সত্তা ও ইতিহাসের ধারক। বাণিজ্য ও টেক্সটাইলের গণ্ডি পেরিয়ে সম্প্রতি বিজিএমইএ কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত যৌথফ্যাশন প্রদর্শনীতে পোশাক শিল্পকে শিল্পের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

চীনা ও বাংলাদেশি ফ্যাশন ডিজাইনাররা দুই দেশের পোশাক ডিজাইনে এনেছেন ঐতিহাসিক ফিউশন। চেচিয়াং সাই-টেক ইউনিভার্সিটি এবং চায়না একাডেমি অব আর্টের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের দিকনির্দেশনায় চীনা সিল্ক, সূক্ষ্ম কারুকাজ ও প্যাটার্নের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সিল্ক, জামদানি ও ক্যালিগ্রাফির যুগলবন্দি ঘটানো হয়েছে।

এই ফ্যাশন ডিজাইন ও দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন নিয়ে চীনা দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সেলর লি শাও ফেং বলেন, ‘আমি মনে করি, এ ধরনের ফ্যাশন শো আরও বেশি হওয়া উচিত। আমাদের সংস্কৃতির আরও বেশি বিনিময় হওয়া প্রয়োজন। উদ্ভাবন, ফ্যাশন ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই বিনিময় আরও বাড়ানো যেতে পারে। দুই দেশের মানুষের চিন্তা, ধারণা ও অভিজ্ঞতার এই পারস্পরিক বিনিময় নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

চেচিয়াং সাই-টেক ইউনিভার্সিটির ফ্যাশন বিভাগের অ্যাডভাইজার ও অধ্যাপক নুসরাত নিপা সারাবাংলাকে বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের যে একটা যাত্রা শুরু হলো, সেটাকে আমরা আরও কীভাবে বেটার করতে পারি, ওই জায়গাগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমরা ইন ফিউচার চীন ও বাংলাদেশ মিলে আরও ফ্যাশন শো করব। যেহেতু আমরা চীন ও বাংলাদেশ দুইটা কান্ট্রি গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বেস্ট। তো এই জায়গা থেকে আমাদের কোলাবরেশনটা আরও দৃঢ় হওয়া উচিত।’

সুরে সুরে ভাঙল ভাষার দেয়াল

সঙ্গীতের নিজস্ব এক মোহনীয় শক্তি আছে যা অনায়াসে ভাষার প্রাচীর ভেঙে ফেলে। সম্প্রতি আয়োজিত ‘২য় চীন-বাংলাদেশ সংগীত প্রতিযোগিতা’ দুই দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার এক অপূর্ব উদাহরণ তৈরি করেছে।

শান্ত-মারিয়াম-হোংহো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটগুলোর মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি শিল্পীরা নিখুঁত উচ্চারণে গায়ে কাঁটা দেওয়া চীনা ভাষার ধ্রুপদী ও আধুনিক গান পরিবেশন করছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিক ও ক্যালিগ্রাফাররা দরদ দিয়ে কণ্ঠে তুলে নিচ্ছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি কিংবা বাংলার মাটির গান। এক দেশের মানুষ অন্য দেশের ভাষাকে আপন করে নিয়ে তাদের সুর ও কাব্যকে বিশ্বের সামনে যেভাবে অনন্য মর্যাদায় তুলে ধরছে, তা কেবল আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নয়, একে অপরের সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগেরই বহিঃপ্রকাশ।

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

চীনের উছিয়াও স্কুলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী। ছবি: সারাবাংলা

ক্যানভাসে চীন-বাংলাদেশ ভাবনা

সাংস্কৃতিক এই সংযোগের সবচেয়ে কোমল ও ভবিষ্যৎমুখী দিকটি দেখা যায়, তরুণ-শিশুদের ক্যানভাসে। ২৫তম ‘নি হাও! চায়না’ শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় যখন ক্ষুদে শিল্পীরা তুলি ধরে, তখন তাদের ক্যানভাসে একদিকে যেমন ফুটে ওঠে গ্রেট ওয়াল কিংবা পেকিং অপেরার চিত্র, তেমনি তার পাশেই স্থান পায় বাংলাদেশের সবুজ প্রান্তর, নদী আর শাপলা ফুল।

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের তরুণ-শিশুরা রঙের ছোঁয়ায় চীনকে তাদের কল্পনা ও ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরেছে। অন্যদিকে, চীনা সরকার ও দূতাবাস প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি তরুণদের চীন সফর, উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও মূলধারার শিল্পকলায় নিয়মিত সুযোগ করে দিয়ে বাংলাদেশকে তাদের বিশ্বস্ত সাংস্কৃতিক অংশীদার হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক মেলবন্ধন ও আগামীর বিশ্বভাবনা

চীন-বাংলাদেশের এই আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কেবল সাময়িক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে একে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। এই অংশীদারিত্ব কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী করা যায় এবং দুই দেশের মৈত্রী কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, সেটা এখন গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক শতাব্দীর পর শতাব্দীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যতের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষা দুই দেশের জনগণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষা শুধু জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যম নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া, দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি।’

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও জোরদার ও বহুমাত্রিক করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেন, ‘চীন বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।’

বিশিষ্টজনরা বলছেন, আধুনিক কূটনীতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের চেয়ে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বা ‘পিপল টু পিপল কন্টাক্ট’ সবচেয়ে টেকসই ভিত্তি তৈরি করে। চীন ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের সংযোগকে আজকের দিনে সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে আধুনিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই মেলবন্ধন টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, বরং যৌথ গবেষণা, পলিসি ডায়ালগ এবং যুব বিনিময় কর্মসূচিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

অটুট থাকুক বন্ধন

হিউয়েন সাং-এর প্রাচীন সফর থেকে শুরু করে আজকের অ্যাক্রোবেটিকের দুঃসাহসিক কসরত, ড্রোনের আলোছায়া, কস্টিউম ডিজাইনের ফিউশন, নৃত্যের ঝংকার, গানের মিলনে কিংবা শিশুদের রঙিন ক্যানভাস সবখানেই দৃশ্যমান চীন ও বাংলাদেশের গভীর সাংস্কৃতিক বিনিময়। এ ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও মিডিয়ার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গভীর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের চেয়েও এই সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক যোগাযোগ অনেক বেশি আত্মিক। এক দেশ যখন অন্য দেশের ঐতিহ্যকে এত গুরুত্বের সঙ্গে নিজের সংস্কৃতিতে জায়গা করে দেয়, তখন সেই সম্পর্কের আয়ু হাজার বছর পেরিয়েও চিরসবুজ থেকে যায়।