ঢাকা: দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই–ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ৩০ জুন বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ২১ জুন মনিটরি পলিসি কমিটির ১২তম সভায় মুদ্রানীতি বিস্তারিত আলোচনার জন্য তোলা হবে। তার আগে ৪ জুন অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, গবেষক, ব্যবসায়ী, ডেপুটি গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে মুদ্রানীতি নিয়ে সভার আয়োজন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে চলছে। সবশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএলফ রেট সাড়ে ১১ শতাংশ ও এসডিএফ ৮ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে শুরু করলে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৮৮ পয়সা দরে বিক্রি হয়।
নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানোর কোনো সুযোগ আপাতত নেই। ফলে নতুন মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের বাজার পরিস্থিতি, এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের চাহিদার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল্যস্ফীতি কমে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার না কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমকি শুণ্য ৪ শতাংশ। এই হার তার আগের মাস মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। সুতরাং এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনো স্থিতিশীল হয়নি। বরং এপ্রিলের তথ্য দেখাচ্ছে, মূল্যচাপ আবার কিছুটা বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও মার্চের ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এপ্রিলে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে। এর মানে চাপটি শুধু চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস বা সবজির বাজারে সীমাবদ্ধ নয়; বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, পোশাক, জ্বালানি-সম্পর্কিত খরচসহ জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতবিদ ড. জাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, এখন সংকোচনমূলক মুদ্রনীতি বলে তেমন কিছু নেই। কেবল বাড়তি নীতি সুদহার সংকোচমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে যায়। এর বাহিরে কারখানায় নগদ সহায়তা, ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা, বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অব্যাহত ডলার কেনায় বাজারে প্রচুর নগদ টাকা বাড়ছে। এতে বিনিয়োগ কিছুটা বাড়বে। তবে ইরান হামলার ঘটনায় দেশে রাজনৈতিক সরকার থাকা সত্ত্বেও তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নতুন বিনিযোগ আসতে অনিশ্চয়তাপ থেকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার যা আছে সেটাই রাখা ছাড়া উপায় নেই। এর পক্ষে ও বিপক্ষে নানা যুক্তি ও সমালোচনা থাকতে পারে। সবকিছু বিবেচনায় শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে সামষ্টিক অর্থনীতি এবং রাজতৈনিক প্রজ্ঞার সমন্বয় জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, মূল্যস্ফীতি কমানো একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বিত প্রচেষ্টার বিষয়।
তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা থাকে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে। কিন্তু বাস্তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যার কারণে এটি সহজ নয়।
তিনি আরও বলেন, শুধু নীতি সুদহার নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।