ঢাকা: শুধুমাত্র স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি করলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না। পাশাপাশি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিকদের জন্য শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা ও পরিবার কার্ডভিত্তিক সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানী জাতীয় প্রেস ক্লাবে বেসরকারি সংস্থা পিনেট আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য বাজেট: অধিক বরাদ্দ ও সঠিক বাস্তবায়নের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণ বিশেষজ্ঞরা এসব বিষয় তুলে ধরেন।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশের মানুষ এমন একটি স্বাস্থ্য বাজেট প্রত্যাশা করে যা সকলের জন্য-বিশেষত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য-সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, প্রতিরোধমূলক ও স্বাস্থ্য উন্নয়নমূলক সেবার সম্প্রসারণ, জনগণের পকেট থেকে ব্যয় কমানো এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। যদিও সময়ের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, উপস্থাপনায় দেখানো হয় যে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয় যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অদক্ষতার পেছনে খণ্ডিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সেবার পুনরাবৃত্তি, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতি, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অনুপস্থিতি এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভাবকে প্রধান কারণ।
ড. হামিদ বলেন, উল্লেখযোগ্যভাবে বাজেট বৃদ্ধির দাবি করার আগে স্বাস্থ্যখাতকে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, বরাদ্দকৃত অর্থের পূর্ণ ব্যবহার, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি জোরদার, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং উন্নত সেবাদান সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে।
উপস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল বিদ্যমান “পরিবার কার্ড”-কে একটি পূর্ণাঙ্গ “স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড”-এ রূপান্তর করা, যা হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসা এবং জটিল রোগের চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় প্রতিটি পরিবারকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার জন্য বার্ষিক নির্ধারিত আর্থিক কভারেজ প্রদান করা হবে, যা বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেবে। পরিবার কার্ডকে স্বাস্থ্য কার্ডে রূপান্তরের মাধ্যমে জনগণ সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত সেবার আর্থিক মূল্য সম্পর্কে সচেতন হবে, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং হাসপাতালে ভর্তি ও জরুরি চিকিৎসাজনিত অতিরিক্ত ব্যক্তিগত ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। এ জন্য সরকারকে কেবল সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত সেবার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
প্রস্তাবনায় মধ্যম স্তরের সেবার জন্য-যেমন রেফারকৃত বহির্বিভাগ সেবা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা ও মৌলিক জরুরি সেবা-প্রতি পরিবারের জন্য বার্ষিক প্রায় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজের প্রস্তাব করা হয়। অন্যদিকে জটিল রোগ, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও তৃতীয় পর্যায়ের সেবার জন্য প্রতি পরিবারের বার্ষিক কভারেজ ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
উপস্থাপনায় কৌশলগত ক্রয় ও টেকসই অর্থায়নের জন্য একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠনেরও সুপারিশ করা হয়। এ তহবিল সরকারি রাজস্ব, বিশেষ স্বাস্থ্য কর, মোবাইল গ্রাহক অবদান, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, দাতব্য সহায়তা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অবদানের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি সুস্পষ্ট সুবিধা প্যাকেজ, ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন, শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, আমরা আজকে যে সমস্যা নিয়ে কথা বলছি, সেটা ইংল্যান্ডে ৩০ বছর আগে কথা বলেছি। আমাদের চিকিৎসক খুবই কম রয়েছে অন্যান্য দেশের তুলনায়। আমাদের ১০ হাজার রোগীর জন্য রয়েছে ৫ জন নার্স। প্রধানমন্ত্রীর কথা মত যদি প্রান্তিক অঞ্চলে যদি ১ লাখ স্বাস্থ্য কর্মী কাজ করতে পারে তাহলে এই সমস্যার সমাধান হবে অনেকটা। স্বাস্থ্য থেকে যদি সব বাজেট আসে তাহলে চালানো যাবে না, এর সঙ্গে সোশ্যাল ওয়ার্ক যুক্ত হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব। বিদেশেও একইভাবে কাজ করা হয়।
আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের পথ কেবল ব্যয় বৃদ্ধি নয়; বরং জবাবদিহিতা, দক্ষতা, কৌশলগত ক্রয় এবং বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যখাতে কেবল নতুন বরাদ্দ চাওয়ার আগে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, পূর্ণ বাজেট বাস্তবায়ন, দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
বক্তারা বলেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পিনট এর কো-অর্ডিনেটর নাজমুল হাসানের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন, সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুই, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসাইন, শিশু ইউরোলজিস্ট ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম প্রমুখ।