।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ।।
ঢাকা: ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে শিশুদের অধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। বাজেটে শিশুদের জন্য বরাদ্দকে ইতিবাচক অভিহিত করলেও সংস্থাটি বলছে, শিশুদের সুরক্ষায় কোনো ধরনের বরাদ্দ না থাকা ও শিক্ষা খাতে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ বৃদ্ধি না পাওয়াকে এই বাজেটের দুর্বল দিক। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হলে তা দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট শিশুদের চাহিদা কতটা পূরণ করছে এবং বাজেটে আর কী করা সম্ভব ছিল— তা নিয়ে অনুষ্ঠিত এক পর্যবেক্ষণ সভায় এসব কথা বলেছেন সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মকর্তারা। সোমবার (১১ জুন) রাজধানীতে সেভ দ্য চিলড্রেন ঢাকা কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস, চাইল্ড গভর্ন্যান্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের ডেপুটি ডিরেক্টর (গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পাবলিক ফাইন্যান্স) আশিক ইকবাল। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্ন্যান্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রটেকশন সেক্টরের পরিচালক লায়লা খন্দকার ও প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোয়ালিটি বিভাগের পরিচালক রিফাত বিস সাত্তারসহ অন্যান্য কর্মীরা।
সভার শুরুতেই লায়লা খন্দকার জাতীয় বাজেটে শিশুদের খাতকে আলাদা চিহ্নিত করে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সরকারকে ধন্যবাদ দেন। তিনি বলেন, এই বরদ্দকে ইতিবাচকভাবে দেখছে সেভ দ্য চিলড্রেন।
এরপর আশিক ইকবাল ‘শিশু বাজেট ২০১৮-১৯: আমরা কি শিশুর প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারছি?’ শিরোনামে একটি একটি পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন। কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে শিশু বাজেট আরো বেশি শিশুবান্ধব হতো তা এই পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেন তিনি।
আশিক বলেন, গত ২৩ মে সারাদেশের শিশুদের নিয়ে গঠিত চাইল্ড পার্লামেন্ট সরকারকে তাদের কিছু চাহিদার কথা জানিয়েছিল। বিশেষ করে চর ও হাওর এলাকায় স্কুলের সংখ্যা বাড়ানো, পাঠাগার-গবেষণাগার, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, দক্ষ শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর মতো বেশকিছু চাহিদার কথা জানায় তারা। এ ছাড়া প্রতিটি জেলায় মেয়ে শিশুরাও নিরাপদে খেলতে পারবে— এমন জায়গা তৈরির দাবি জানায় তারা।
আশিক জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে সমাজকল্যাণে বরাদ্দ কমেছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ এই বরাদ্দ টাকাই মূলত শিশুদের উন্নয়নে কাজে আসত। আর বাজেটে ক্রীড়া উপকরণ কেনার কথা বলা থাকলেও নিরাপদ খেলার স্থান যুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষাখাতে প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১.২ শতাংশ কম। আশিক বলেন, বাজেট যে পরিমাণে বড় হয়েছে সে পরিমাণে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়েনি। এ বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। এতে ব্যয়ের সক্ষমতায় প্রভাব পড়বে বলেও আশঙ্কা করেন সেভ দ্য চিলড্রেনের এই ডেপুটি ডিরেক্টর।
শিশু বাজেটে প্রতিবন্ধী শিশুদের সুরক্ষা খাতে দ্বিগুণ করা ও স্কুলের ফিডিং প্রোগ্রামে একশ ৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দকে ইতিবাচক মনে করছে সেভ দ্য চিলড্রেন। আশিক বলেন, এই বরাদ্দের ফলে পরিবার ও সমাজে প্রতিবন্ধী শিশুদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তারা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ পাবে। আর স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামের কারণে শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে না এবং তাদের শারীরিক বিকাশে প্রয়োজনীয় পুষ্টিও পাচ্ছে। এই খাতে বরাদ্দ বাড়লে তা সুফল বয়ে আনবে।
শিশু সুরক্ষায় বরাদ্দ না থাকাকে বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সেভ দ্য চিলড্রেনের পর্যবেক্ষণে। শিশুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ছাড়াও শিশুদের সঙ্গে ব্যবহারের নির্দিষ্ট নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হলেও এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দের উল্লেখ করা হয়নি বাজেটে। এ ছাড়া বাল্য বিয়ে রোধেও কোনো অর্থ বরাদ্দ হয়নি। সেভ দ্য চিলড্রেন আশঙ্কা করছে, এই বরাদ্দ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত অর্জনে সরকার ব্যর্থ হতে পারে।
লায়লা খন্দকার বলেন, ‘নো ভায়লেন্স ইন চাইল্ডহুড নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, সারাবিশ্বে শিশুদের ওপর নির্যাতনের ফলে প্রতিবছর প্রায় সাত ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার জিডিপি ক্ষতি হয়। আমরাও যদি শিশুদের ওপর সহিংসতা রোধ না করতে পারি, এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে থাকবে।’
শিশু বাজেট বিশ্লেষণের জন্য তৈরি মডিউল সম্পর্কে জানতে চাইলে আশিক ইকবাল জানান, এটি কার্যকর একটি মডিউল এবং এটি দিয়ে আগের অর্থবছরগুলোতে বরাদ্দ করা অর্থ কোন খাতে কতটা ব্যবহার করা হয়েছে, কোনটা প্রয়োজন হয়নি— তা দেখা সম্ভব। ফলে আগামীতে এই মডিউল বাজেট করতে সরকারের জন্যও সহায়ক হবে বলে মনে করেন তিনি।
সারাবাংলা/এমএ/টিআর