Sunday 07 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দ্রুত সময়ে রামিসা হত্যার রায় ঘোষণা, সরকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত

গোলাম সামদানী হেড অব নিউজ
৭ জুন ২০২৬ ১৯:৫১ | আপডেট: ৭ জুন ২০২৬ ১৯:৫৪

ঢাকা : রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আর মামলার দায়ের করার দিন থেকে হিসাব করলে মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা মামলার রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কার্যত মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যেই রামিসার মতো একটি বেদনাদায়ক হত্যার ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজীরবিহীন। এতো দ্রুত সময়ের মধ্যে এই ধরনের একটি মামলার রায় দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা। একইসঙ্গে এটি ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র জন্য এক গৌরবময় ইতিহাস হয়ে থাকবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘটনার পর রামিসার বাসায় ছুটে গিয়ে দ্রুত বিচার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও তা বাস্তবায়ন করা বিএনপি’কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচারের রায় ঘোষণা- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আইনমন্ত্রী, বিচার বিভাগ এবং পুলিশের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

শুধু তাই নয়, আগামী তিন মাসের মধ্যে রামিসা হত্যার পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি প্রত্যাশা করেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ফাইল হাইকোর্টে নিয়ে আসা, পরের সপ্তাহ থেকেই পেপার বুক প্রস্তুতের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এরপর ১৫ দিনের মধ্যে পেপার বুক সম্পন্ন করে বিশেষ বিবেচনায় মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। শুনানি দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হলে মামলাটি আপিল বিভাগে যাবে। এভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে আনুমানিক সর্বোচ্চ তিন মাস সময় লাগতে পারে।

এদিকে রায় ঘোষণার দিনই রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১৪ জুন থেকে এ বিশেষ বেঞ্চ কার্যক্রম শুরু করবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। এ বিষয়ে রোববার (৭ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর কাছে অনুরোধ জানানো হলে তিনি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। ফলে আগামী তিন মাসের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচারের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাচ্ছে, তা অনেকটাই নিশ্চিত বলা যায়। ফলে বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনের ইতিহাসে এটি এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। সে সঙ্গে বিচারাঙ্গনের ইতিহাসে বিএনপি’র নামও উজ্জল হয়ে থাকবে, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কারণে।

রামিসা হত্যার ঘটনা ও বিচার প্রক্রিয়া:

গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে আট বছর বয়সী রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার সাথে সাথে ওই ফ্ল্যাটে বসবাসকারী সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী ১২ ঘন্টার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার পরদিন ২০ মে রামিসার বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতা ও লাশ গুমের অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতে সোহেল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

মামলাটি তদন্ত করে ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় গত ২৪ মে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। একইদিন মামলাটি বিচারের জন্য শিশু ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। তবে সেদিন থেকেই ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হওয়ায় ১ জুন মামলার অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করা হয়। ঈদের ছুটি শেষে ওই দিন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। অভিযোগ গঠনের দিন সোহেল ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তিকে ঘটনার জন্য দায়ী করার চেষ্টা করেন। তবে তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষ জানান, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরদিন ২ জুন মামলার ১৮ সাক্ষীর মধ্যে রামিসার বাবা, মা, বোন ও স্বজনসহ ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

এরপর ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন। এদিন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এতো অল্প সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আর কোন মামলার রায় ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।

রায় ঘোষণার পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে রামিসার মতো একটি বেদনাদায়ক ঘটনার বিচার সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। আজ যে ফার্স্ট ট্র্যাকে রামিসা হত্যার বিচার হলো এটা সরকার একা করেনি। প্রধান বিচারপতি যদি ১৫ জুন পর্যন্ত থাকা বিচারপতিদের ছুটি বাতিল না করতেন, তাহলে এই ফার্স্ট ট্র্যাক সরকারের পক্ষে সম্ভব হতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে আনুমানিক তিন মাস সময় লাগতে পারে।’

আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৮৮২ সালে নদীয়ার একটি ঘটনায় নদীয়া সেশন কোর্টে মুল্লুক চাঁদ নামে এক ব্যক্তি তার ৯ বছর বয়সী কন্যাকে হত্যার মামলার বিচার একদিনে সম্পন্ন হয়েছিল। এরপর এত দ্রুত বিচার আর সম্ভব হয়নি। আমরা আইনের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করেছি। ঘোষিত শাস্তিতে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আশা করি, উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।’

দীর্ঘ ১৭ বছর পর জনগণের রায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মুছে যাওয়ার আগেই সরকারের দেয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করেছেন।

তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার তিন মাসের মাথায় রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তার বাসায় গিয়ে পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে নিপীড়িত পরিবারের পাশে থেকে সর্বাত্মক সহায়তার পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের কারণে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে রামিসা হত্যার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর আগে মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে এক আসামিকে আদালতের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে এ মামলার রায় ঘোষণা করে আরেক বিরল নজির হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এছাড়া এক দশক পর তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়ার মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের পথ আরও সুগম হয়েছে। একইভাবে শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিকে ভারতে দ্রুত শনাক্ত করা হয়েছে।

লেখক: হেড অব নিউজ, দৈনিক সারাবাংলা ও সারাবাংলা ডটনেট

বিজ্ঞাপন

আরো

গোলাম সামদানী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর