Saturday 27 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফর / দেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে

গোলাম সামদানী হেড অব নিউজ
২৭ জুন ২০২৬ ২১:৩৭

ঢাকা: প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশিদের দেশ বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যে সংবর্ধনা পেয়েছেন সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কোনো সরকার প্রধানকে এই রকম সংবর্ধনা দেওয়া বিরল ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর দুই দেশ সফর কতটা সফল হয়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ সরকারের প্রথম বিদেশ সফরের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সমর্থনে গৃহীত ওই প্রস্তাবে সফরকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরে শনিবার (২৭ জুন) সংসদে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে আমি দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি এবং সেই স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। এ সফরে যদি ভালো কিছু অর্জিত হয়ে থাকে, তবে সেটি বাংলাদেশের অর্জন। এটি দেশের মানুষের অর্জন।’

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের দুই দিনের মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর শেষে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দফতর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এই ভিডিও‘র প্রকাশের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ তথা প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সফরকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তা বুঝা যায়। মালয়েশিয়া সফরের শেষ দিন গত ২৩ জুন মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।

ভিডিওতে দুই দেশের সরকার প্রধানের বৈঠক, মধ্যাহ্নভোজ, সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ নানা কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে। পুরো ভিডিওতে ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’ গানটি ব্যবহার করা হয়েছে, মাঝে একটি বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে। পোস্টে আনোয়ার ইব্রাহিমকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বলতে শোনা যায়, অবশ্যই, যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ এবং এখানে (মালয়েশিয়ায়) থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট সমাধানের চেষ্টা করব। ‘একইসঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কার্যালয় এবং আসিয়ানের মাধ্যমে আমরা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব, যাতে এই সমস্যার আংশিক সমাধান করা যায়।’ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য তুলে ধরার সময়ও আবহ সঙ্গীত হিসেবে ‘মহাজাদু’ বাজতে থাকে।

এ ছাড়াও মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়ায় গত ২২ জুন যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জিয়া পরিবারের সঙ্গে পুরনো সম্পর্কের কথা তুলে ধরে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যবান যে, আপনার প্রয়াত বাবা ও মায়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। আমি তাকে (তারেক রহমানকে) আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছি— যখন আমি একজন যুবনেতা হিসেবে মৌচাক ক্যাম্পে তার বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম।’ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার প্রয়াত মায়ের সঙ্গেও বেশ কয়েকবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আমার দেখা হয়েছিল।’

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশকে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে তা বুঝা যায় শুক্রবার ( ২৬ জুন) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের এক মন্তব্যে। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, “বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তনই আসুক না কেন চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু,’ ‘সুপ্রতিবেশী’ আর ‘ভালো অংশীদার’ হিসেবেই থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’ এ ছাড়াও দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পর্ক জোরদার, কৌশলগত যোগাযোগ গভীর, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের নিজ নিজ মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে একে অপরকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন চীনের প্রেসিডে শি জিন পিং।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরে মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সহযোগিতা বাড়াতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পুনরায় নিয়োগ শুরু করা হচ্ছে এবং সেখানে দক্ষ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। এ ছাড়াও আট হাজার অপেক্ষমাণ কর্মীর কাজে যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মীদের কল্যাণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়োগ ব্যয় কমানোর বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। টেকসই সমাধান এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

এ ছাড়া আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়া পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মালয়েমিয়া দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বিষয়ে দুটি নোট বিনিময় হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক পুনরায় চালুর বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া ২০২৭ সালের মধ্যে একটি পারস্পরিক লাভজনক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া যৌথ বিজনেস কাউন্সিল গঠন, ব্যবসায়ী পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। এই সফরে চীন ও বাংলাদেশের জনগণের ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ গড়ার স্বার্থে অংশীদারত্বের পাশাপাশি আলোচিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাবের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আটটি সমঝোতা স্মারক, তিনটি চুক্তি, একটি প্রোটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা সই হয়েছে।

মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, চট্টগ্রাম চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। এ ছাড়াও এই সফরে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী ড্রেজিং, আঞ্চলিক সংযোগ এবং কুনমিং থেকে বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত মাল্টিমোডাল পরিবহন সংযোগ সম্প্রসারণেও সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ব্রিকস, এসসিও ও আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ অর্জনের প্রচেষ্টায়ও চীন সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফর প্রসঙ্গে শনিবার (২৭ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।’

উল্লেখ্য, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মতোই জাতীয় স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে বিদেশ সফর শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে গত ২১ জুন দুই দিনের জন্য মালয়েশিয়ার সফর করেন। পরে তিনি গত ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়ায় সফর শেষ করে ২৩ জুন চীন সফর করেন এবং গত ২৬ জুন ঐতিহাসিক দুই দেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরেন।

সারাবাংলা/জিএস/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

গোলাম সামদানী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর