Wednesday 16 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক কাল / ইউপি নির্বাচন ঘিরে সরকার-ইসি টানাপোড়েন!

নাজনীন লাকী
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৪৪

বাংলাদেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশন। ফাইল ছবি

ঢাকা: স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণস্তর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনকে কেন্দ্র করে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন অনেকটাই মুখোমুখি অবস্থানে। নির্বাচন কমিশন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে নিজস্ব গতিতে কাজের সিদ্ধান্ত জানালেও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সরকারকে না জানিয়েই তৈরি করা হয়েছে ইউপি ভোটের প্রাথমিক রূপরেখা। ফলে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ইসি ঘোষিত ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সূচিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার এখতিয়ার, প্রশাসনিক শিষ্টাচার ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসি ঘোষিত রোডম্যাপ ও সাত ধাপের হিসাব

বিজ্ঞাপন

এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনপরবর্তী ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকারের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত ভোটের উদ্যোগ নিয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের জানান, দেশের মোট ইউনিয়ন ৪ হাজার ৫৮০টি। এসব ইউনিয়নে সাত ধাপে ভোট করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্ভাব্য তারিখগুলো হলো- প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে।

নাখোশ সরকার ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ

ইসির সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার পর পরই সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল প্রতিনিধি ইসির কার্যপদ্ধতি ও এখতিয়ার নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ভোটের তারিখ জেনেছেন। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় ও আইনশৃঙ্খলা বৈঠকের পর তারিখ ঘোষণার কথা।’

এদিকে একইদিনে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলনকক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে ইসি কেবল সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ। অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনে ইসিকে সরকারের সঙ্গে কোলাবোরেট (সমন্বয়) করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারিখ পেছাবে না এগোবে, তা আলোচনার বিষয়।’

এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। বিষয়টিকে ইসির একটি ‘টেনটেটিভ প্ল্যান’ হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন অনুসারে সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়া নির্বাচন করা যাবে না। ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর চূড়ান্ত সিডিউল বা তফসিল ঘোষণা হবে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাস

জিয়াউর রহমানের আমল: জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন সিইসি ইউপি নির্বাচন করতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে ভোট আয়োজন করেছিল, যেখানে ইসির কোনো কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন না।

এরশাদের আমল: এইচ এম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একদিনে চার হাজার ইউপিতে ভোট হয়। সেই নির্বাচনে নজিরবিহীন সহিংসতা ও সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।

২০০০ সালের নির্বাচন: ২০০০ সালে সিইসি এম এ সাঈদের মেয়াদে উপজেলা নির্বাচন আয়োজনে সরকার অনুরোধ জানালেও ইসি তা যথাসময়ে না করে প্রায় একবছর পর আয়োজন করে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জেসমিন টুলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিষয়টি মূলত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। তবে নির্বাচন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইসিকে। সরকারের অনুরোধের পর ইসি ভোটের উদ্যোগ নেয় এবং তফসিল দেয়।’

ঘোষিত তারিখগুলোকে ইসির একধরণের ‘কর্মপরিকল্পনা’ বা ‘রোডম্যাপ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখনো বিস্তারিত সময়সূচি বা তফসিল ঘোষণা হয়নি। ইসির আগাম পরিকল্পনার কারণে সামনে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সুবিধা হবে। তবে স্থানীয় নির্বাচন করতে সরকারের সব সহায়তা দরকার, তাই সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই এটি করতে হবে।’

এদিকে ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা চিঠি চালাচালি ছাড়াই ইসি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এমন অভিযোগ সঠিক নয়। কমিশন কেবল সরকার বা মন্ত্রণালয় নয়, বরং মাঠপর্যায় থেকেও তথ্য নিয়ে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ ও প্রথম সভার তথ্য প্রয়োজন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সীমানা/ওয়ার্ড বিন্যাস দ্রুত সম্পন্নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। এজন্য গত ৯ জুলাই সংস্থাটির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে ‘ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিমিত্ত সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও অন্যান্য তথ্যাদি প্রেরণ’ শীর্ষক একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে এসব তথ্য নির্দিষ্ট ছক আকারে দিতে বলা হয়েছিল।

ইসির এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-১ শাখার উপসচিব জিয়াউর রহমান ইসির সিনিয়র সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়, ‘নির্বাচন কমিশনের পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রেরিত ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিমিত্ত সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও অন্যান্য তথ্যাদি পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে প্রেরণ করা হলো।’

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এই চিঠির ভিত্তিতেই সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিশেষ সভায় বসে কমিশন। এতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা তফসিল ঘোষণা করিনি। ভোটের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছি। এখন আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হবে। সম্ভাব্য তারিখগুলো নিয়ে আলোচনা হবে, এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’

টেবিল আলোচনার ওপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সরকার ও ইসির পালটাপালটি বক্তব্যের মুখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের বক্তব্যের জবাবে কোনো পালটা মন্তব্য করার ‘ধৃষ্টতা’ দেখাবেন না তিনি। তবে তিনি বলেন, ‘উনাদের বক্তব্য আমাদের কাছে শিরোধার্য। কার সঙ্গে কখন কথা হয়েছে, তা বলতে চাই না। নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাই সব প্রশ্নের সমাধান দেবে।’

তাই সব বিতর্ক আর উত্তাপের চোখ এখন আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের দিকে। সরকারের স্বরাষ্ট্র, অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মতি এবং মাঠ প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন এককভাবে ভোটের মাঠে নামতে পারছে না। কারণ, মাঠ প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা সূচির মতো বাস্তবভিত্তিক বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে ইসির পক্ষে এককভাবে এত বড় নির্বাচন সফল করা কঠিন। ফলে সব চোখ এখন ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের ওপর।

বিজ্ঞাপন

আরো

নাজনীন লাকী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর