Friday 09 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে রাজশাহীর প্রত্ন-ঐতিহ্য ‘ঢোপকল’

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০৮

রাজশাহীর প্রত্ন-ঐতিহ্য ‘ঢোপকল’। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

রাজশাহী: পদ্মাপাড়ের ঐতিহাসিক শহর রাজশাহী একসময় শিক্ষা, সংস্কৃতি আর আধুনিক নাগরিক সুবিধার সূতিকাগার হিসেবে সুপরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তন, নগর উন্নয়ন আর দীর্ঘদিনের চরম অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই শহরের আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রথম স্মৃতিচিহ্ন— ‘হেমন্ত কুমারী ঢোপকল’। ১৯৩৭ সালে স্থাপিত প্রায় ৮৮ বছরের পুরোনো এই প্রত্ন-ঐতিহ্য আজ তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। শতবর্ষ ছুঁইছুঁই অনন্য এসব পানির আধার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোথাও ভাঙাচোরা, কোথাও আগাছায় নিমজ্জিত, আবার কোথাও স্রেফ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে বিলুপ্তপ্রায় এক স্মারক হয়ে।

বিজ্ঞাপন

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে রাজশাহী শহরে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। নগরবাসী মূলত পুকুর, পাতকুয়া ও অনিরাপদ জলাশয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল থাকায় কলেরা, আমাশয় ও ডায়রিয়ার মতো প্রাণঘাতী পানিবাহিত রোগে প্রতিনিয়ত প্রচুর মানুষ মারা যেতেন। এই ভয়াবহ মহামারি থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় এগিয়ে আসেন তৎকালীন রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান রায় ডি.এন. দাশগুপ্ত (১৯৩৪-১৯৩৯)। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে তিনি শহরে একটি আধুনিক ওয়াটার ওয়ার্কস ও ফিল্টারড ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্টের পরিকল্পনা নেন।

১৯৩৭ সালের আগস্টে তদানীন্তন ‘মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটা’র অধীনে ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, যাতে তৎকালীন সময়ে ব্যয় হয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এই বিপুল ব্যয়ের বৃহৎ জনকল্যাণমূলক প্রজেক্টে সর্ববৃহৎ একক অনুদান দিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান পুঠিয়ার মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করেন নগদ ৬৫ হাজার টাকা। তার এই অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা বোর্ডের জমিতে নির্মিত পানি শোধনাগারটির নামকরণ করা হয় ‘মহারানী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। পরবর্তী সময়ে এর অধীনে শহরজুড়ে বসানো বিশেষ আকৃতির সুপেয় পানির কলগুলো সর্বসাধারণের কাছে ‘হেমন্ত কুমারী ঢোপকল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রকৌশল ও কারিগরি দিক থেকেও ঢোপকল ছিল তৎকালীন সময়ের এক অনন্য সৃষ্টি। সিমেন্ট, ইটের খোয়া ও বিশেষ কাস্টিং প্রযুক্তিতে তৈরি প্রায় ১২ ফুট উঁচু এবং ৪ ফুট ব্যাসের ঢেউ খেলানো গোলাকার এই ঢোপকলগুলো দূর থেকেই সহজে নজর কাড়ত। শোধনাগারে পাথরকুচি ও বালুর স্তরের মাধ্যমে পানি প্রথম দফা শোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢোপকলে পাঠানো হতো। এরপর প্রতিটি ঢোপকলের ভেতরের ‘রাফিং ফিল্টার’ পানিকে দ্বিতীয়বার পরিশোধিত করত। প্রতিটি ঢোপকলের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪৭০ গ্যালন। দিনে মাত্র ২ ঘণ্টা মূল পাম্প সচল থাকলেও ঢোপকলের জমানো পানি দিয়ে নগরবাসী সারা দিন ধরে ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারতেন।

ঢোপকল থেকে একসময় নিয়মিত পানি সংগ্রহ করতেন রাজশাহীর স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনি স্মৃতিচারণ করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘একসময় ঢোপকল ছিল বিশুদ্ধ পানির উৎস। সবাই এই পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। জিনিসটা দারুণভাবে মানুষের উপকারে আসত। কিন্তু বর্তমানে এর তেমন তত্ত্বাবধান চোখে পড়ে না। পাশাপাশি ওয়াসা ও ফিল্টারের পানির কারণে এর কদর কমেছে। অনেক জায়গায় নষ্টও হয়ে গেছে। তবে এখনো অনেক মানুষ এর পানি পান করে। প্রশাসনের কাছে দাবি থাকবে এগুলোকে সংস্কার এবং তত্ত্বাবধান করে যেন এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা হয়।’

একসময় রাজশাহী শহরজুড়ে শতাধিক ঢোপকলের অস্তিত্ব থাকলেও বর্তমানে বেলদারপাড়া, ফায়ার সার্ভিস মোড়, পাঠানপাড়া, রানীবাজার, অলোকার মোড় ও কুমারপাড়াসহ হাতে গোনা কয়েকটি এলাকায় মাত্র চার-পাঁচটি ঢোপকল কোনোমতে টিকে আছে। সম্প্রতি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্তকরণ ও ড্রেন নির্মাণকাজের কারণে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঢোপকল ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে নগরে কতটি ঢোপকল অবশিষ্ট রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য রাসিকের কাছে নেই। অন্যদিকে, রাজশাহী ওয়াসা বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরেরও এই ঢোপকলগুলো সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ বা প্রকল্প দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে খোলাসা হতে কথা হয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের রাজশাহী আঞ্চলের পরিচালক কে এম সাইফুর রহমানের সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ঢোপকল সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সামগ্রী হলেও ছোট আকারের স্থাপনা। ফলে এগুলোকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গেজেটভুক্ত করা বেশ জটিল।’ তবে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

নগর গবেষক, ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ঢোপকল শুধু পানির কল নয়, এটি রাজশাহীর জলসভ্যতা ও নগর জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল। এটি রক্ষা করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ও রাসিকের যৌথ উদ্যোগে অবশিষ্ট ঢোপকলগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন। যে স্থানগুলোতে সড়ক প্রসস্তকরণ কাজের প্রয়োজন, সেখানে ধ্বংস না করে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে স্থানান্তর করে নিরাপদ স্থানে পুনঃস্থাপন এবং পাশে সংক্ষিপ্ত ইতিহাসসংবলিত তথ্যফলক স্থাপন করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢোপকল আমাদের ঐতিহ্য। সড়ক উন্নয়ন কাজের প্রয়োজনে নগরীর কয়েকটি জায়গায় ঢোপকল স্থানান্তর করতে হয়েছে। তবে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নগরীর ইতিহাস তুলে ধরতেই নতুনভাবে এগুলোর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

সড়ক উন্নয়ন কাজের প্রয়োজনে কয়েকটি ঢোপকল আপাতত সরাতে হলেও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার স্বার্থে পরবর্তী সময়ে নতুনভাবে সেগুলো পুনঃস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে রাসিকের। তবে প্রতিশ্রুতির মুখাপেক্ষী না থেকে রাজশাহীর এই অনন্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত বাস্তবমুখী ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায় নগরবাসী।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর