রয়্যাল প্যালেসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি শিশুসুলভ দেবদূত ভাস্কর্যটি শহরের ব্যস্ততার মাঝেও একটুখানি স্থিরতা এনে দেয়। পথচারীরা হয়তো কয়েক মুহূর্ত থেমে যায়, তাকিয়ে থাকে, এবং অনুভব করে, শিল্প কখনও কেবল দেখার বিষয় নয়; এটি অনুভব করার, স্মরণ করার, এবং সময়ের সঙ্গে সংলাপ করার এক মাধ্যম। এই ভাস্কর্যটি বেলজিয়ামের রানি এলিজাবেথকে (Queen Elisabeth of Belgium) উৎসর্গ করা হয়েছে।
শিশু দুটি একটি বৃত্তাকার মেডেলিয়ন ধরে আছে, যাতে রানি এলিজাবেথের প্রতিকৃতি খোদাই করা রয়েছে। মেডেলিয়নটির বাম পাশে একটি শিশু দেবদূতকে শিঙা বা ট্রাম্পেট বাজাতে দেখা যাচ্ছে।
বেলজিয়ামের রাজকীয় উদ্যানের নিভৃত কোণে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্রোঞ্জ স্মৃতিস্তম্ভটি কেবল একজন রানির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, বরং এটি শিল্প আর সুরের এক অপার্থিব মেলবন্ধন। রানি এলিজাবেথকে উৎসর্গ করা এই ভাস্কর্যটি যেন শতবর্ষের নৈঃশব্দ্য ভেঙে প্রতিনিয়ত ঘোষণা করে চলেছে,একজন রানি কেবল সিংহাসনের অধিপতি নন, তিনি হতে পারেন একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মার পরম আশ্রয়দাতা।
এই ভাস্কর্যটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক মায়াবী আখ্যান। কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুটি চঞ্চল শিশুসুলভ দেবদূত বা ‘পুত্তি’ যেন স্বর্গীয় কোনো বার্তাবাহক। তাদের একজন দুহাতে উঁচিয়ে ধরেছে একটি শিঙা, যার সুর যেন অদেখা কোনো দিগন্তের পানে ছড়িয়ে দিচ্ছে রানির মহিমা আর তার বর্ণাঢ্য জীবনের কীর্তিগাঁথা। অন্য দেবদূতটি অত্যন্ত সযত্নে তুলে ধরেছে একছড়া পুষ্পমাল্য; যা একই সঙ্গে সম্মান, ভালোবাসা আর শাশ্বত স্মরণের এক জীবন্ত প্রতীক। এই দুই দেবদূতের মাঝখানে অতি সংগোপনে ধরে রাখা হয়েছে একটি বৃত্তাকার পদক, যেখানে খোদাই করা রানির অবয়বটি স্থির অথচ প্রাণবন্ত— যেন এক নিবিড় ধ্যানের গভীরতায় নিমগ্ন।
ভাস্কর জিন কানিস এই অনন্য সৃষ্টিতে ব্রোঞ্জের এক অদ্ভুত জাদু ফুটিয়ে তুলেছেন। সময়ের আবর্তে আর প্রকৃতির ছোঁয়ায় ব্রোঞ্জ আজ ধারণ করেছে এক প্রাচীন নীলাভ-সবুজ আস্তরণ। এই রঙ কেবল সময়ের জীর্ণতা নয়, বরং ইতিহাসের সেই গভীরতা যা স্মৃতিকে আরও উজ্জ্বল আর চিরস্থায়ী করে তোলে। রাজপ্রাসাদের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্যটি শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততার মাঝেও এক অদ্ভুত স্থিরতা দান করে।
পথচারীরা যখন এই উদ্যানের পথ ধরে হাঁটেন, তারা হয়তো অজান্তেই থমকে দাঁড়ান। চোখের সামনে ভেসে ওঠা এই শিল্পকর্মটি তাদের জানিয়ে দেয়,শিল্প কেবল দর্শনের বিষয় নয়, এটি অনুভবের এক গূঢ় মাধ্যম। ব্রাসেলসের এই নিভৃত কোণে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিস্তম্ভটি তাই কেবল একজন রানির প্রতিকৃতি হয়ে থাকেনি, এটি হয়ে উঠেছে বেলজিয়ামের শিল্পবোধ আর সুরের প্রতি নিবেদিত এক অমর মহাকাব্য।