Saturday 27 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সিলেটের সংবাদপত্র জগতের অন্তঃপ্রাণ এক অভিভাবকের বিদায়

জুলফিকার তাজুল ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৭ জুন ২০২৬ ১৯:৫৮ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ২০:০০

সিলেটের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ইসমাইল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

সিলেট: জেলার গণমাধ্যম ও সংবাদপত্র জগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। সংবাদপত্রের প্রচার, বিপণন ও সাংবাদিক তৈরির নেপথ্যের কারিগর হিসেবে পরিচিত আলমগীর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এবং বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি হাজী ইসমাইল হোসেন আর নেই।

শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় কানাডার আলবার্টা প্রদেশের রাজধানী এডমন্টনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার মৃত্যু কেবল একজন সংবাদপত্র ব্যবসায়ীর বিদায় নয়, এটি সিলেটের সংবাদপত্র ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি। দীর্ঘ সাড়ে ৩ দশক ধরে তিনি সিলেটের সংবাদপত্র জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। নিজে কখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও অসংখ্য সংবাদকর্মীকে সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
  • সাংবাদিক তৈরির নেপথ্যের কারিগর

সিলেটের অনেক প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের পেশাগত যাত্রার শুরুতে ছিল ইসমাইল হোসেনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা। নতুন কোনো সাংবাদিক নিয়োগের আগে অনেক সম্পাদক ও প্রকাশক তার মতামত নিতেন। সংবাদকর্মীর যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও সম্ভাবনা মূল্যায়নে তার বিচক্ষণতা ছিল সর্বজনস্বীকৃত।

নতুন কোনো জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকা বাজারে এলে সিলেট অঞ্চলে তার প্রচার ও পাঠক তৈরির কৌশল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তিনি। ফলে সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন আস্থার এক প্রতীক।

  • ঢাকার মিডিয়া অঙ্গনে ইসমাইল হোসেনের কদর

ঢাকা থেকে নতুন পত্রিকা বের হওয়ার পূর্বে ইসমাইল হোসেনের ডাক পড়তো, পত্রিকার প্রচার বাড়ানোর জন্য সম্পাদকদের তিনি পরামর্শ দিতেন—সিলেট অঞ্চলের কোন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলে পাঠকের আগ্রহ বাড়বে। এসব পরামর্শ তিনি দিতেন বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে।

বাজারে নতুন পত্রিকা আসলে তার বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক প্রমাণিত হতো। কারণ তার নিউজ সেন্স ছিল দুর্দান্ত। তিনি পত্রিকার মান দেখেই অকপটে বলতে পারতেন কোন পত্রিকা কতদূর এগোতে পারবে বা কোন জায়গায় পত্রিকাটি তার অস্তিত্ব হারাবে।

এছাড়াও প্রথম সারির পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার। তার মধ্যে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, যুগান্তর সম্পাদক প্রয়াত গোলাম সারোয়ার, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সাবেক বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক শাহজাহান সরদার, ইনকিলাব সম্পাদক এম এম বাহাউদ্দীন দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদক প্রয়াত বজলুর রহমান, দৈনিক বাংলার সম্পাদক তোয়াব খান, দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ ও যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমানসহ দেশের বহু খ্যাতিমান সাংবাদিক তাকে আন্তরিক স্নেহ ও মতামত-কে গুরুত্ব দিতেন। কারণ তারা জানতেন বাজারে পত্রিকার বাস্তব চিত্র ইসমাঈল হোসেনের জ্ঞানগর্ভ অতুলনীয়।

  • পত্রিকা-অন্তঃপ্রাণ এক যাযাবর

ইসমাইল হোসেনের কাছে সংবাদপত্র শুধু ব্যবসা ছিল না, এটি ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ছিলেন এক সত্যিকার ‘পত্রিকা-অন্তঃপ্রাণ’ মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এবং অনলাইনের জোয়ারে ছাপা পত্রিকার সেই সোনালী জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। পত্রিকার সার্কুলেশন কমেছে, মানুষ কাগজের পাতা উল্টানোর চেয়ে স্ক্রিনে চোখ রাখতে বেশি অভ্যস্ত হয়েছে। কিন্তু পত্রিকার এই চরম দুঃসময়েও ইসমাইল হোসেনের পত্রিকা-প্রীতিতে এতটুকু জং ধরেনি।

প্রতিদিন বিকেল হলেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেতো সিলেটের রাস্তায়। ইসমাইল হোসেন এক তাড়া নতুন পত্রিকা হাতে নিয়ে চিরচেনা ভঙ্গিতে ঘুরতে বের হতেন। পথে যার সাথেই দেখা হতো, পরিচিত হোক কিংবা অপরিচিত—মুচকি হেসে তার হাতে একটি পত্রিকা উপহার হিসেবে তুলে দিতেন। পরম মমতায় বলতেন, ‘নেন, খবরটা একটু পড়েন।’ মানুষকে পত্রিকা পড়ানোর, সমাজকে সচেতন করার এই যে নিঃস্বার্থ তাড়না, তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। বর্তমান যুগে পত্রিকার প্রতি এমন নিখাদ ভালোবাসা এবং আত্মিক টান রাখা মানুষ সিলেটে সত্যিই বিরল, এক কথায় বলতে গেলে আর দ্বিতীয় কেউ নেই।

  • ইসমাইলের মৃত্যুতে সিলেটের মিডিয়া অঙ্গনে শোক

ইসমাইল হোসেনের মৃত্যুতে সিলেটের মিডিয়া অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার প্রতিবেদকের। আলাপকালে তারা ইসমাইল হোসেনের  স্মৃতিচারণ করেন—

দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার কূটনৈতিক প্রতিবেদক ‘মিজানুর রহমান বলেন, সকালে মৃত্যু সংবাদটি শোনার পর থেকে কর্মবিমুখ সময় কাটাচ্ছি। জুমআ’তে তার জন্য দোয়া হয়েছে। গত রমজানে অফিসের একটা এসাইনমেন্টে জন্য সিলেটে পুরো রমজান মাস থাকতে হয়েছে। সেখানে প্রায় রাতের একটা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আমার অন্য সহকর্মী বন্ধুদের সঙ্গে ইসমাইল ভাইও হোটেলে আমাদের আড্ডায় থাকতেন। সাধারণত তারাবিহ শেষেই জড়ো হতাম আমরা।

রমযানে ‘সিলেটিদের মসজিদকেন্দ্রীক জীবন’ নিয়ে ইসমাইল ভাই একটি রিপোর্ট করার আবদার করেছিলেন- করেছিও। সেই রিপোর্টের পর যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন ইসমাইল ভাই। কতো কথা, কত স্মৃতি। আমাদের বকাঝকা করার অধিকার ছিল এই বয়োজ্যেষ্ঠের।

আমেরিকার থেকে প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও ‘আমার সিলেট’ সম্পাদক এমদাদ চৌধুরী দিপু বলেন, মানুষ জন্মালে মৃত্যু অনিবার্য। সবারই একদিন মরতে হবে। তবে কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়। তারমধ্যে ইসমাইল ভাই একজন। তার সঙ্গে সিলেটের সাংবাদিকদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

ইসমাইল ভাইয়ের সঙ্গে কয়েকটি স্মৃতি স্মরণ করতেই চোখের জলে স্মৃতিগুলো ঝলমল করে ভেসে উঠে। তাকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখে শেষ করা যাবে না। সাদাসিধা বিনয়ী এ মানুষটির মৃত্যুতে সংবাদপত্র জগতের যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে তা অপূরণীয়। বিদায় ইসমাইল ভাই, সিলেটের গণমাধ্যম আপনাকে আজীবন বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।

চ্যানেল আই সিলেট প্রতিনিধি সাদিকুর রহমান সাকি বলেন, শুক্রবার যখন ইসমাইল ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি শুনলাম, বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠছে পুরোনো দিনের কত শত স্মৃতি। কত শ’ সাংবাদিকের যে প্রথম পথচলা শুরু হয়েছিল ইসমাইল ভাইয়ের হাত ধরে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

সংবাদপত্র জগতের পরম আপনজন আজ আমাদের ছেড়ে বহুদূরে, পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। কানাডার বরফঢাকা মাটিতে হয়তো তার দেহ শান্তিতে ঘুমাবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া স্মৃতি চিরকাল সজীব থাকবে সিলেটের প্রতিটি নিউজরুমে, প্রতিটা প্রেসের কালির গন্ধে।

রাত বিরাতে ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে আড্ডায় অতিবাহিত করতেন তার মধ্যে সাংবাদিক মুজিবুর রহমান ডালিম। তিনি বলেন, ইসমাইল ভাই কানাডায় ইন্তেকাল করেছেন। তিনি আমার অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। শেষ বিদায় দিয়েছিলাম বিমানবন্দরে। এটি যে শেষ বিদায় হবে জানতাম না! তার সঙ্গে আমাদের রাত-বিরাতে কতশত স্মৃতি।

আমাদের প্রায় রাতে তিনি ওয়াজ মাহফিল ও মাদরাসায় নিয়ে যেতেন। রমজান মাসের শেষ দিন প্রাণ খুলে অসহায়দের পাশে থাকতেন ইসমাইল ভাই। গাজী বুরহান (র.) মাদরাসার উন্নয়নে তার অবদান ও ফিকির ছিল একটু বেশি। দানের ক্ষেত্রে ছিলেন প্রচার বিমুখ। তিনি অনেক সহকর্মীকে সহযোগিতা করেছেন নীরবে নিভৃতে।

স্টার নিউজে কর্মরত সাংবাদিক ‘ইয়াহইয়া মারুফ বলেন, বছর খানেক আগেও সংবাদপত্রে কাজ করতাম। আজকের পত্রিকা, যুগান্তর, ভোরের কাগজসহ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন আমার কর্মস্থল সকল পত্রিকার পরিবেশক। তার নাতির বয়সী হলেও কখনো ‘ভাই’ ছাড়া সম্বোধন করতেন না। যখনই দেখা হতো পরামর্শ দিতেন। কখনো কখনো হতাশ করে এই পেশা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলতেন। আবার ভালো ভালো রিপোর্টের প্রশংসা করতেন। জোর করে চা-বিস্কুট, চকলেট ও পান খাওয়াতেন।

সেই মানুষটি আজ না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন, অত্যন্ত সজ্জন ও ভাল মানুষ আমাদের সবার প্রিয় ইসমাঈল হোসেন ভাইয়ের জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুক এই কামনা করি।

  • সিলেটের ২ মন্ত্রীর শোক

সিলেটের প্রবীন সংবাদপত্র এজেন্ট হাজী ইসমাইল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বানিজ্য, শিল্প ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

পৃথক শোক বার্তায় তারা বলেন- হাজী ইসমাইল হোসেন সিলেটে সংবাদপত্রের পাঠ্যভাস করে গড়ে তোলতে নিরলসভাবে পরিশ্রম করেছেন। তিনি সংবাদপত্র অঙ্গনের একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন। তার মৃত্যুতে সিলেটের সংবাদপত্র বিপনন খাতে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে সেটি কখনও পূরণ হবে না। তারা মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

  • ‘বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের’ শোক

বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের’ সহ-সভাপতি ইসমাইল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংগঠনের সভাপতি মো: আইয়ুব খান ও সাধারণ সম্পাদক মো. আবু বকর সিদ্দিক।

এক শোকবার্তায় তারা বলেন, ‘মরহুম ইসমাইল একজন সদালাপী, সৎ, মিতব্যয়ী ও কর্মঠ সংগঠক ছিলেন। সংবাদপত্র অ্যাজেন্টদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশ সংবাদপত্র অ্যাজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে সংবাদপত্র অ্যাজেন্ট সমাজ একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠককে হারিয়েছে।’

ইসমাইল হোসেন হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু সিলেটের সংবাদপত্র জগতের প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি নিউজরুম এবং অসংখ্য সাংবাদিকের পেশাগত জীবনের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে থাকবে চিরকাল। সংবাদপত্রের প্রতি তার যে ভালোবাসা, মানুষের প্রতি যে আন্তরিকতা এবং নীরবে কাজ করে যাওয়ার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

জুলফিকার তাজুল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর