কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রাম জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় জেগে উঠা নতুন চরগুলোতে এখন কাশফুলের সমারোহ। আপনা-আপনি গজিয়ে উঠা এসব কাশবন হয়ে উঠেছে নির্জন চরাঞ্চলে অপার সৌন্দর্যের লীলা ভুমি।
স্থানীয়রা জানান, এই কাশবন শুধু শরতের সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, চরবাসীরা এই কাশের বাগান গজিয়ে উঠার পর তাদের গবাদি পশুদের চারনভূমি হিসেবে ব্যবহার করেন আবার এই কাশ আঁটি বেধে ভালো দামে বিক্রি করে নিজেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। গবেষকরা বলছেন, এই কাশ গাছের অনেক ঔষুধি গুন রয়েছে। পাশাপাশি এই কাশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে লেখার দামী কাগজও।
সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চর, উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগার চরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, আকাশে শরতের সাদা মেঘ, জমিনে কাশফুলের বিছানা। বাতাসে সাদা ফুলের মিশ্রন। এ যেন সাদায় সাদায় মিতালী। এই দৃশ্য এখন কুড়িগ্রামের নদ-নদী অববাহিকার সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চলের। আকাশে, বাতাসে, জমিনে প্রকৃতির এই অপরুপ সৌন্দর্যে যে কারো মন হারিয়ে যেতে পারে।

জানা গেছে, এবারের বন্যার পর ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার, সোনাভরিসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকার কাশফুলের দৃশ্য এগুলি। জেগে উঠা বালু চরে প্রকৃতিগত ভাবেই গজিয়ে উঠা এসব কাশবন শুধু ফুলের সৌন্দর্যই মানুষের মনের খোড়াক জোগায় না। বর্তমানে এই কাশ বন হয়ে উঠেছে চরাঞ্চলের মানুষের রুটি-রুজির উৎসও।
একদিকে চরাঞ্চলের পতিত ধুধু বালু জমিতে বিনা খরচে উৎপাদন হওয়া এই কাশের খড় বিক্রি করেই চলছে কারো কারো সংসার। অন্যদিকে শরতের স্বাক্ষী বহনকারী কাশফুলের দৃশ্য উপভোগ করতে ছুটে আসছেন অনেক প্রকৃতি প্রেমী।
সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চরের বাসিন্দা মইন উদ্দিন জানান, এই কাশবন চরাঞ্চলের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি চরের মানুষের জীবন- জীবিকার মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। গাছ থেকে কাশফুল পড়ে গেলে গাছ কেটে আঁটি বেধে ১ হাজার আঁটি ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, আমার ইউনিয়নটা পুরোটাই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চরাঞ্চল। এখানে নদের দুই পাড়ে জেগে উঠা নতুন সব চরই এখন কাশবন। অনেক আগে চরবাসীরা এই কাশবন শুধু গবাদি পশুর চারনভুমি হিসেবে ব্যবহার হতো। কিন্তু বর্তমানে এই চাহিদা বাড়ার জেলার বাইরে থেকে ক্রেতারা এসে কিনে নিয়ে যায়। এতে করে চরবাসীরা কিছুটা হলেও আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা ফিরে পায়।
সদর উপজেলার ধরলা নদীর অববাহিকার হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব চর এলাকার মজিবর রহমান জানান, শুধু সৌন্দর্য আর অর্থের উৎস নয়, বন্যার মতো দুর্যোগের সময় গো-খাদ্যেরও অভাব মেটাতে ভুমিকা রাখে এই কাঁশবন।
একই চরের তালুকদার জানান, এই কাশের খড় পানের বরে ব্যব হারের জন্য বেশ উপযোগী তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে প্রতি হাজার কাশের আঁটি ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে যায়।
শহর থেকে কাশবনের সৌন্দর্য দেখতে আসা জুয়েল রানা জানান, বিশেষ করে শরতের সময় এই কাশবন ফুলে ফুলে সাদা হয়ে উঠে। আমি প্রতি বছরই এই সময়টাতে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে বেড়াই। এটা আসলে মানুষের বিনোদনের জন্য একটা বিশাল প্লাটফর্ম।
কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও উপাধ্যক্ষ মীর্জা নাসির উদ্দিন জানান, কুড়িগ্রাম ১৬টি নদ-নদী বেষ্টিত একটি জেলা। এখানে রয়েছে সাড়ে ৪ শতাধিক চর। এই চরগুলোতে প্রচুর পরিমান কাশবন রয়েছে। এই কাশবন গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ঔষধী গুনও রয়েছে, বিশেষ করে অনিদ্রার জন্য এর ব্যবহার হয়। আর এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব হলো, ভারতসহ অন্যান্য দেশে এই কাঁশ থেকে উন্নতমানের লেখার কাগজ এবয় ছাপার কাগজ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আর একটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় কয়লা চালিত যে পাওয়ার প্লান্ট তৈরি হচ্ছে এই পাওয়ার প্লান্টের বর্জ শোধনে কাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। নদ-নদী ময় কুড়িগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের পতিত বালু জমির এই কাঁশবন শুধু সৌন্দর্য আর অর্থনীতির কাজে আসে না। এই কাঁশবন পতিত জমিকে আবাদী জমিতে পরিনত করার পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়ও ভুমিকা পালন করে থাকে।