ঢাকা: হামের প্রকোপে সারা দেশে প্রতিদিন শিশু মৃত্যু ও ব্যাপক আক্রান্তের খবর জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ এবং শহুরে বস্তি এলাকাগুলোতে শিশুদের মধ্যে ছোঁয়াচে এই রোগের বিস্তার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতেও জায়গা হচ্ছে না রোগীদের। তবে হামের এই প্রাদুর্ভাবের জন্য কে দায়ী? রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য ইউনূস সরকার টিকা না কেনায় তৈরি হয় সংকট? নাকি এটা শুধু-ই গল্প! নেপথ্যে তাহলে কী? এমনই অনেক প্রশ্ন নিয়ে দেশজুড়ে এখনো চলছে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামে গত ১৫ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ৪৫৯ শিশু হাম ও হামজনিত উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া, আক্রান্ত হয়েছে ৬৫ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে হাম সন্দেহে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৮৪৬ এবং নিশ্চিত শনাক্ত হাম রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৭৬৭ শিশু। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাম ও হাম উপসর্গে শতশত শিশু মারা গেছে। এখনো প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এত হাসপাতালের বারান্দায় বাড়ছে স্বজনদের আহাজারি। অথচ, এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও এর দায় নিতে রাজি নয় কেউ-ই।
যখন থেকে দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইনের শুরু
টিকাদান কর্মসূচিতে প্রথমে এমআর ছিল না। মিজেলস ক্যাম্পিং ২০০৫ সালে করা হয়। তখন দু’টি জেলা আর একটি সিটি করপোরেশনে করা হয়। সে সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছরের নিচে ১৫ লাখ শিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়। এরপর ২০০৬ সালে পাঁচটি সিটি করপোরেশন ও ৬২টি জেলায় সাড়ে তিন কোটি শিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়। এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ ৯৫ শতাং হতে হয়। কিন্তু সেসময় ৮০ শতাংশের কিছু বেশি দেওয়া হয়েছিল। আর এই গ্যাপটাকে পূরণ করার জন্য নিয়মিত টিকাদান ছাড়াও চার বছর পর পর এই ক্যাম্পেইন করা হয়। পরে ২০১০ সালে সারা বাংলাদেশে করা হয় মিজেলস ক্যাম্পেইন। টার্গেট ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছরের নিচে ২ কোটি শিশু।
তারপর ২০১৪ সালে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ক্যাম্পিং করা হয়। এ সময়ই মূলত এমআর ক্যাম্পেইন চালু হয়। তখন সাড়ে পাঁচ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। তাদের বয়স ছিল ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের নিচে। এরপরে ২০১৬-১৭ সালে কয়েকটি জায়গায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় জেলা পর্যায়ে টিকা দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে বিশ্ব টিকা দিবসে বাদ পড়া আরও ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ এমআর ক্যাম্পেই করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকার কতটা ঘাটতি ছিল
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ভঙ্গুর। তলানিতে থাকা রিজার্ভ বাড়াতে সরকার নতুন করে কোনো প্রকল্পে হাত দেওয়া হয়নি বললেই চলে। তাই রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার টিকাও কেনেনি- এমনই অভিযোগ অনেকের। তবে অন্তবর্তী সরকারের সময়ে টিকা ছিল বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞসহ টিকা গ্রহীতারা। তাদের মতে, অন্যান্য টিকার ঘাটতি থাকতে পারে, তবে এমআর টিকা ছিল। কিন্তু, টিকা থাকলেও ঠিকমতো এর ডিস্ট্রিবিউশন করা হয়নি।
রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বরে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে শরিয়ত উল্লাহ তার শিশু সন্তানকে হামের টিকা দেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি আমার সন্তানকে আগস্ট মাসে হামের টিকা দিয়েছি। যদি ঘাটতি থাকতো তাহলে তো টিকা দিতে পারতাম না।’
মিরপুরের আরেক বাসিন্দা আয়েশা আক্তার। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার দুই সন্তানকে ২০২৫ সালে হামের টিকা দিয়েছি। কেন্দ্রে যাওয়া মাত্রই টিকা পেয়েছি।’ শরিয়ত উল্লাহ ও আয়েশার মত অনেকেই জানান, ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময় তাদের সন্তানকে হামের টিকা দিয়েছেন।
প্রত্যন্ত এলাকায় টিকা না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে নোয়াখালী থেকে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত বাচ্চাকে নিয়ে আসা মা হালিমা খাতুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘তিনবার কেন্দ্রে গিয়েও আমার সন্তানের জন্য হামের টিকা পাইনি। ডাক্তাররা বলেছিল পরে আসবে। তাই আর টিকা দিতে পারিনি।’
শতশত শিশুর মৃত্যুতে দায় তাহলে কার?
দেশে অন্যান্য টিকার ঘাটতি থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমআর টিকার কোনো সংকট ছিল না বলে তদন্তে জানা যায়। ইপিআর এ টিকা মজুদ থাকার কারণেই হামের প্রাদুর্ভাবের সময়ে দ্রুত টিকা ক্যাম্পেইন সরকার শুরু করতে পেরেছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তবে বর্তমান সরকার বলছে, তড়িৎ গতিতে তারা টিকা কিনেছে।
এদিকে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘অন্তবর্তী সরকারের সময় হামের কোনো টিকা কেনা হয়নি। সেই কারণে সংকট তৈরি হয় ও টিকা না থাকায় সে সময় টিকাদান কর্মসূচিও চালানো হয়নি। সে কারণেই হঠাৎ করেই হামের প্রাদুর্ভাব।’
হামে শতশত শিশুর মৃত্যুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কোনো দায় আছে কি না জানেন না সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রোববার (১৭ মে) সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না আমার কোনো অবহেলা আছে কি না। হামের প্রথম রোগী পাওয়ার পর ১৮ ঘণ্টার মধ্যে আমরা আইসিইউ চালু করেছি। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনো মজুত ছিল না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং টিকার তীব্র ঘাটতি বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ।’
তিনি বলেন, ‘২০২০ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ হামের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি হয়েছে। তার পরে আমরা শুরু করার আগ পর্যন্ত হামের কোনো টিকা দেওয়া হয়নি। এমনকি হামের একটি টিকাও আমাদের হাতে ছিল না। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি কোনো টিকা পাইনি।’
ইপিআই জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরেও তাদের হাতে টিকা ছিল। শুধুমাত্র লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে দিতে পারেনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘বিশ্বের ৫৪টি দেশে হাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী হাম বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশে। এ ছাড়া ২০২০ সালের পর হামবিরোধী ক্যাম্পেইন না হওয়ায় এবং আগের সরকারের গাফিলতির কারণে বর্তমানে হামের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা টিকা না কিনে সংকট তৈরি করেছিল। সময় মত ক্যাম্পেইন করলে আজ এত শিশু মারা যেত না।’
হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকার বিষয়ে জানতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে একাধিকবার ফোনে কল করেও পাওয়া যায়নি। এমনকি তিনি বর্তমানে কোথায় থাকেন সে তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিশেষ স্বাস্থ্য সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) ডা. মো. সায়েদুর রহমান টিকা না কেনা ও সংকটের অভিযোগের বিরোধিতা করে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ক্রয়ে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। টিকা ক্রয় বন্ধ করা হয়েছিল বলে ইউনিসেফের বক্তব্য সঠিক না। আর বর্তমান সরকারের সময়ে চলমান হাম ক্যাম্পেইনের টিকা ২০২৫ সালে সই করা চিঠির আলোকেই দেশে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
এ বিষয়ে টিকা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক গবেষক (আইসিডিডিআর,বি) ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০২৪ সালে আবেদন করা হয় যে, ২০২৫ সালে এমআর ক্যাম্পেইন করা হবে। আবেদনপত্রটি অনুমোদনও করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চে অনুমোদন করে গ্যাভি জানায় যে, তারা সাপোর্ট দিবে। ওই আবেদনপত্রে ৫৮টি জেলায় টিকা দেওয়ার কথা বলা হয়। এই ক্যাম্পেইনের জন্য প্রথম চালানে ২২ লাখ টিকা আসে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। ওই মাসে প্রথমে ক্যাম্পেইন করার কথা ছিল। তখন ক্যাম্পেইন না করে ইপিআই জানায়, ডিসেম্বর বা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু তখনও ক্যাম্পেইন হয়নি। ইপিআই জানায়, ২০২৬ সালের জুনে করা হবে। কিন্তু এর মধ্যে নতুন সরকারের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। ফলে সরকার ক্যাম্পেইন এগিয়ে ৫ এপ্রিল করে। আর এই ক্যাম্পেইনের টিকা ইপিআই হেডকোয়ার্টারে ছিল। এর পর দ্বিতীয় শিফটে টিকার চালান আসে ২০২৬ সালের মার্চের শেষে। টিকা যেহেতু আগেই এসেছিল, তাই সময় মতো এই টিকা দিলে এই শত শত শিশু মারা যেত না।’
এ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশে হামের টিকা ছিল। কিন্ত এই টিকা ছিল ইপিআই হেডকোয়ার্টারে। এখান থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পৌঁছানো যায়নি। টিকা বণ্টনের টাকা অপারেশন প্লানে (ওপি) ধরা ছিল। অন্তবর্তী সরকার মার্চে ওপির সিস্টেম বন্ধ করে দেয়। ফলে গাড়ির তেল কিনতে না পাড়ায় টিকা জেলা পর্যায়ে যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি সমস্যা হলো- যারা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে তাদের টাকা প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ ছিল। তারা তো আর বিনা বেতনে এই দীর্ঘ সময়জুড়ে কাজ করবে না। তাই টিকাগুলো কেন্দ্রে পৌঁছায়নি। তৃতীয় আরেকটি বিষয় হলো- এই টিকা প্রদান করে স্বাস্থ্য সহকারীরা। তাদের অনেক ফাঁকা পদ আছে, যেখানে লোক নেওয়া হয়নি। লোকবল সংকট ছিল। দাবি-দাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য সহকারীরা অন্তবর্তী সরকারের সময়ে তিন বার আন্দোলনও করে। এই সবগুলো কারণ মিলিয়ে শিশুরা টিকা পায়নি। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আর এ কারণেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে।’
অন্তবর্তী সরকারকে দায়ী করার সুযোগ আছে কি না?- এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সুযোগ আছে। সরকার ভালো-মন্দ সবকিছুর জন্যই দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা বলেছে, সেক্টর প্রোগ্রামে চুরি হয়, তাই ওপি বন্ধ করে দিয়েছে। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিলে তার বিপরীতে তো আরেকটা চালু করতে হবে। বিকল্প পদ্ধতি না করে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দেওয়ায় টিকাদান ব্যাহত হয়েছে। এর দায় দায়িত্ব তো তাদের নিতেই হবে।’