বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে সোনার বাংলা গড়তে আমরা দৃঢ়প্রত্যয়ী

December 12, 2018 | 4:05 pm

।। আ হ ম মুস্তফা কামাল।।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন স্বপ্ন দেখেছিলেন এদেশের মানুষের জন্য একটি স্বাধীন ভূ-খণ্ড এবং এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, আর সেই লক্ষ্য অর্জনে তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন। তার হাত ধরেই এদেশের মানুষ স্বাধীনতা লাভ করেছে। মাটি ও মানুষকে নিয়েই জাতির পিতা আজীবন কাজ করে গিয়েছেন। আমাদের সংবিধানে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে গিয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে বৈষম্যহীন একটি সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে জাত-পাত -এর কোন ভেদাভেদ থাকবে না। দেশের উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিমে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। নারী-পুরুষে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। গ্রাম আর শহরের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না।

‘কাউকে পেছনে ফেলে, কাউকে অর্থনীতির মূল স্রোতধারার বাহিরে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়’। এই নীতিতেই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি তিনি সাজিয়েছিলেন এদেশের মানুষকে বৈষম্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে। তিনি তার কাজটি শেষ করে যেতে পারেন নাই। ঘাতকদের নির্মম বুলেট তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার আদর্শ বিলীন হয় নাই। তার আদর্শ সকল সময়েই আমাদের সকল ভালো কাজে অনুপ্রেরণার উৎস, আমাদের চির অনুসরণীয়। তার আদর্শ এদেশের মানুষের জন্য অম্লান হয়ে থাকবে অনন্তকাল পর্যন্ত, সূর্যের মতো দেদীপ্যমান।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু সবসময় পরিকল্পিত উন্নয়নের চেষ্টা করে গিয়েছেন। বাংলার মানুষের জন্য তার দর্শন তিনি ১৯৭৩ সালে তার প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তুলে এনেছিলেন। তিনি জাতির উন্নয়নে দেশের গণমানুষের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে এনে তার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মুখবন্ধে বলেছিলেন, ‘দেশের জনগণের পক্ষ থেকে কঠোর পরিশ্রম ও প্রয়োজনে যে কোনও ত্যাগের জন্য সর্বাত্মক অঙ্গীকার ছাড়া কোনও পরিকল্পনাই, তা যত সুলিখিতই হোক না কেন, সঠিক বাস্তবায়ন হতে পারে না।’

তিনি মানুষের মুক্তির সেই দর্শনের কথা ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পুনরাবৃত্তি করেন। জাতিসংঘে প্রথমবার বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সময় বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহবান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আসুন আমরা সকলে মিলে এমন একটি পৃথিবী গড়ে তুলি, যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও মানুষের সকল কষ্ট দূরীভূত হবে, বৈশ্বিক শান্তি অর্জিত হবে এবং মানবজাতির কল্যাণ রক্ষিত হবে।’

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছিলেন, যে দর্শন উপহার দিয়েছিলেন সেটাই আজকে আমরা প্রতিধ্বনিত হতে শুনি জাতিসংঘে সর্বসম্মতিতে গৃহীত ২০৩০ সালের বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-তে, যার মূল বক্তব্যই হলো ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়, কাউকে পেছনে ফেলে নয়’। আমরা অনুপ্রাণিত হই, গর্বিত হই যখন দেখি, বঙ্গবন্ধুর স্বাপ্নিক আদর্শ বিশ্ব দরবারে আজ সমাদৃত। আজ তাঁর দেখানো পথেই হাঁটছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে হেঁটে আজ আমরা বাংলাদেশের সত্যিকারের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়তে দৃঢ় প্রত্যয়ী।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি’র কথা বলতে গেলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) প্রাসঙ্গিক ভাবেই এসে যায়। বর্তমান এসডিজি’র পূর্বে প্রথম বারের মতো ২০০০ সালে সারা বিশ্বের জন্য জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি সর্ব-সম্মতভাবে গ্রহণ করেছিল। এর আগে কখনও এতো বড় পরিসরে সবাইকে এক সাথে নিয়ে সারা বিশ্বের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক একক উন্নয়ন এজন্ডা নেওয়া হয় নি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে বাংলাদেশকে এই বৈশ্বিক এজেন্ডায় সম্পৃক্ত করেন। কিন্তু ২০০২ থেকে ২০০৬ মেয়াদে দেশের পরিচালনা উন্নয়নমুখী ছিল না, তাই এমডিজি নিয়েও দেশে  বিশেষ কোন কার্যক্রম পরিচালিত হয় নি। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরায় দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তিনি এমডিজি’র আলোকে লক্ষ্যভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এমডিজি অর্জনের লক্ষ্যে “রূপকল্প:২০২১” ও ‘ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’র মাধ্যমে দেশকে প্রস্তুত করেন। তাঁর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে এমডিজি’র ৮টি অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনেই বাংলাদেশ সফলতা দেখায়।

বিজ্ঞাপন

আমরা দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগে, ২০১৩ সালেই অর্জন করে বিশ্বকে তাক লগিয়ে দেই। দারিদ্র্য হ্রাসকরণ সংক্রান্ত এমডিজি-১ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বে অগ্রগামী ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক ‘বিশেষ স্বীকৃতি’ লাভ করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশকে এ জন্য ‘ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড’-ও প্রদান করে। একই কারণে বাংলাদেশ ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। এমডিজি’র চতুর্থ লক্ষ্য, শিশু মৃত্যহার কমিয়ে ২০১০ সালেই আমরা ২০১৫-এর লক্ষ্য অর্জন করি। এর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-কে জাতিসংঘ ‘এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০’ এ ভূষিত করে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার সংক্রান্ত এমডিজি-৪ ও এমডিজি-৫-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করেছিল। এর ফলে বাংলদেশের জন্য এ দুইটি লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হয়েছিল। এ কারণে বাংলাদেশকে আরেকটি ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়। নারী শিক্ষায় ব্যাপক সাফল্যের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে জাতিসংঘ হতে ‘ইউনেস্কো পিস ট্রি’ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এমডিজি-৫-এর আওতায় নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ‘এজেন্ট অব চেইঞ্জ’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয় এবং ইউএন-উইমেন এর পক্ষে থেকে ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ ঘোষণা করা হয়। এমডিজি-৭-এর লক্ষ্য অনুযায়ী পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত মোকাবিলায় সাফল্যের জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনাকে তার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এমডিজি’র সবগুলো লক্ষ্য অর্জনে সফলতা দেখাবার মাধ্যমে বাংলাদেশ সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। তাই জাতিসংঘের ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে এমডিজি অর্জনে সফল ১৮টি দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল বাংলাদেশ। এমনটি সম্ভবপর হয়েছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে। এমডিজি অর্জনকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেই আমরা এ সকল লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে গিয়েছি। এ সময়ে সরকার ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫)-এর মাধ্যমে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল বলেই এমডিজি’র আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ এই সফলতা দেখাতে পেরেছে। আর আজ তাই আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি।

বিজ্ঞাপন

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যেমন সফলতা আমরা দেখিয়েছিলাম, তেমনি আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা  অর্জনের ক্ষেত্রেও কাজ করে যাচ্ছি। এমডিজি-তে অনেকে আর্থ-সামাজিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অনেকগুলো অর্থনৈতিক বিষয় অনুল্লেখিত ছিল। অর্থনৈতিক নিয়ামকগুলোর সাথে পরিবেশগত বিষয়াদি এবং জলবায়ু পরিবর্তন-কে এসডিজিতে বিস্তারিতভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। এসডিজি’র এই সব নতুনত্বকে বিবেচনায় নিয়েই আমরা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সাজিয়েছি এবং সে অনুযায়ী আমরা গত তিন বছর নানামুখী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। এসডিজি বাস্তবায়নে সকল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য প্রধানমন্ত্রী’র কার্যালয় নিয়মিত তদারকি করে যাচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রয়োজনীয় সকল নীতি কাঠামো প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। এসডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য এটুআই হতে ডিজিটাল এ্যপস্ ‘এসডিজি ট্র্যাকার’ তৈরি করা হয়েছে, যার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সংযুক্ত আছে সকল মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরসমূহ। এর আলোকে আমরা গত বছর জাতিসংঘে আমাদের আংশিক অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেছিলাম আর এ বছর পরিকল্পনা কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রণয়ন করছে।

শেখ হাসিনা’র সরকারের পরিচালনায় গত দশ বছরে দেশ বদলেছে, গতিশীল হয়েছে অর্থনীতির চাকা, আর তাই নজরকাড়া উন্নতির মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হাত ধরেই আমরা ক্রমে ক্রমে এসডিজি’র অধিকাংশ অভীষ্ট লক্ষ্যের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছি। এক দশকে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ২০ লাখ কোটি টাকারও বেশি উন্নয়ন করেছি। বড় ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুরুতে কিছুটা সক্ষমতার অভাব থাকলেও এখন যেকোনও প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা শতভাগ সক্ষমতা অর্জন করেছি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি টেকসই গতিশীলতার মধ্যে এসেছে। এই প্রকল্পগুলো যখন শতভাগ বাস্তবায়ন হবে তখন বাংলাদেশ হবে একটি সমৃদ্ধ দেশ। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পরিলক্ষিত হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সূচকে আমাদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখলে দেশের মানুষ তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাবে।

এসডিজি’র প্রথম অভীষ্ট: দারিদ্র্য বিলোপ-এই ক্ষেত্রে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০১০ সালে আমাদের দারিদ্র্যের হার যেখানে ৩১.৫% ও চরম দারিদ্রের হার ১৭.৬% ছিল, সেখানে ২০১৬ সালে তা এসে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২৪.৩% ও ১২.৯%। ২০১৮ সালে দারিদ্র্যের হার আরও কমে হয়েছে ২১.৮% এবং চরম দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ১১.৩%-এ। আমাদের সরকারের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুবিন্যস্ত ও গভীরতর করায় আমরা দেশের দারিদ্রতা কমিয়ে আনতে পেরেছি।

এসডিজি’র দ্বিতীয় অভীষ্ট: ক্ষুধা মুক্তি-এর পুষ্টি সূচকের ক্ষেত্রে শিশুদের খর্বিত বিকাশ ২০১৬ সালে ছিল ৩৮.৫৯%, তা কমে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৭.৮২%। কৃষি খাতে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে, চাল উৎপাদনে আজ বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে বিশ্বের রোল মডেল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ধানের মোট উৎপাদন ছিল ৩৩.৮০ মিলিয়ন টন, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৬.২৮ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ২০০৫-০৬ সালের ৩.১ টন থেকে ২০১৭-১৮ সালে ৪.২ টনে উন্নীত হয়েছে।  এছাড়াও, ২০১৫-১৬ সালে আবাদ যোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ যেখানে ছিল ৫৮.১৩% তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬-১৭ সালে ৫৮.১৯% হয়েছে। এই সফলতা অর্জিত হয়েছে আমাদের সরকার সময়মতো কৃষকদের মাঝে সার, উন্নত বীজ, কৃষি ঋণ বিতরণ, সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির জন্য।

এসডিজি’র তৃতীয় অভীষ্ট: সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ -এর ক্ষেত্রে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহার ২০১৬ সালে প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে ছিল ৩৫ জন, যা ২০১৭ সালে কমে ৩১ জন হয়েছে এবং নবজাতক মৃত্যুহার ২০১৬ সালে প্রতি হাজারে ১৯ জন থেকে কমে ২০১৭ সালে ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মাতৃ মৃত্যুহার ২০১৬ সালে প্রতি হাজারে ছিল ১৭৮ জন, যা ২০১৭ সালে কমে গিয়ে হয়েছে ১৭২ জন।

এসডিজি’র চতুর্থ অভীষ্ট: গুণগত শিক্ষা-এর ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষায় ২০১৬ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৯.২% (ছেলে ২২.৩% এবং মেয়ে ১৬.১%)। আমাদের সরকার কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়ায়, কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ২০০৬ সালের ২ শতাংশ থেকে ২০১৫ সালে, অর্থাৎ, এমডিজি সময়কালে ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়, যা ২০১৮ সালে এসে ১৭ শতাংশ হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বিদেশে আমাদের প্রেরিত কর্মীদের দক্ষতায়ও। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায় যে, মালয়েশিয়ায় ম্যানেজারিয়াল পদে নিযুক্ত বিদেশী কর্মীদের মধ্যে ৩৭ শতাংশই বাংলদেশী।

এসডিজি’র পঞ্চম অভীষ্ট: জেন্ডার সমতা-এর ক্ষেত্রে জেন্ডার ক্ষমতায়নে বর্তমানে বাংলাদেশের বৈশ্বিক র‌্যাংকিং ৪৭তম। সামগ্রিক বৈশ্বিক জেন্ডার গ্যাপ সূচকে বাংলাদেশ মোট জেন্ডার পার্থক্যকে প্রায় ৭২ শতাংশে নামিয়ে এনে ২০১৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে।

বিগত দিনে এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের স্বীকৃতির অংশ হিসেবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পানি সংক্রান্ত এসডিজি’র ষষ্ঠ অভীষ্ট: নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন-এর জন্য জাতিসংঘের পানি সম্পর্কিত উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল-এর সদস্য করা হয়েছে। ২০১৭ সালের হিসাব মতে বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যার ৯৮% নিরাপদ খাবার পানি পাচ্ছে এবং ৭৬% নিরাপদ স্যানিটেশনের সুবিধা পাচ্ছে।

এসডিজি’র সপ্তম অভীষ্ট: সাশ্রয়ী, দূষণমুক্ত জ্বালানি -এর ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮৫.৩% মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেতো, যা বর্তমানে প্রায় ৯০%। এর বিপরীতে বিশ্বব্যাপী ২০১৫ সালে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনসংখ্যার হার ছিল ৮৭%।

এসডিজি’র অষ্টম অভীষ্ট: শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি-এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বেশ ভাল। বিগত তিন বছরে (২০১৪-১৫ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে) বাংলাদেশের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশেরও বেশি, আর গত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৮৬ শতাংশ। জিডিপির অভূতপূর্ব অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে নিম্নগতি। ফলশ্রুতিতে, মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময় সার্বিক বেকারত্ব পরিস্থিতির উন্নতিও লক্ষণীয়; ২০১০ সালের ৪.৬ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে এ হার ৪.২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৫-০৬ সালে যেখানে কর্মসংস্থান ছিল ৪৭.৩ মিলিয়ন, তা ২০১৬-১৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬০.৮ মিলিয়নে। গত এক দশকে এক কোটি ৩৫ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৫ অর্থবছরে প্রবাসে গমনকারী বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ ৬১ হাজার; গত দুই অর্থবছরে প্রায় ১৫ লক্ষ ৯০ হাজার কর্মী বিদেশে গমন করেন। প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ২০১৫-১৬ সালে ১৪.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রবাসী কর্মসংস্থানের উর্ধ্বমুখী গতিধারার কারণে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছর আমাদের রেমিট্যান্স ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ২০১৬ সালে আমাদের বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা ছিল ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৮ সালে বেড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

এসডিজি’র নবম অভীষ্ট: শিল্প,  উদ্ভাবন এবং অবকাঠামো-এর ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে শিল্প, বিশেষত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান ক্রমবর্ধমান ধারা প্রদর্শন করছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমরা জিডিপি’তে ১৮.৯৯% ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান অর্জন করেছি। মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত জনসংখ্যার অনুপাত তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ২০১৭ সালেই প্রায় ৯২.৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ছিল ২০২০ সালের লক্ষ্যমাত্রা। চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তিও এখন অনেকের কাছেই পৌঁছে গিয়েছে, আর আমরা পঞ্চম প্রজন্ম দেশে নিয়ে আসার দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। দেশের ৬৪টি জেলায় ১১৪টি উপজেলা থেকে ১১০৪টি ইউনিয়নে প্রায় ৮,০০০ কি.মি. অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন করা হয়েছে। সারা দেশে ২৮টি হাইটেক পার্ক হচ্ছে, যেখানে তথ্য প্রযুক্তি পণ্য তৈরি হচ্ছে ও বিদেশে সেবা রপ্তানি হচ্ছে।

এসডিজি’র দশম অভীষ্ট: অসমতা হ্রাস -এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমাদের ১৫০টিরও অধিক প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী চলমান আছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের সরকার পরিকল্পিত অর্থনীতিতে সমতা অব্যাহত রাখায় সচেষ্ট আছে। এর ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বৈষম্য অনেক কমে এসেছে। সম্প্রতি উন্নয়ন বিষয়ে সমীক্ষায় পুরো বিশ্বে আমরা বাংলাদেশকে ৩৪তম স্থানে বাংলাদেশকে দেখতে পাই। যেখানে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ৬২তম, পাকিস্তান ৪৭তম এবং শ্রীলঙ্কা ৪০তম।

এসডিজি’র একাদশ অভীষ্ট: টেকসই নগর ও জনপদ-কে কেন্দ্র করে বড় শহরগুলো-তে বিশেষত ঢাকা ও চট্টগ্রামের জন্য পরিবহন, রাস্তা-ঘাট উন্নয়ন, পয়ঃনিষ্কাশন, ভূ-উপরিস্থিত পানি সরবরাহ ইত্যাদি নানা খাতে অনেক গুলো বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

এসডিজি’র দ্বাদশ অভীষ্ট, পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদন, এসডিজি’র ত্রয়োদশ, অভীষ্ট জলবায়ু কার্যক্রম, এসডিজি’র চতুর্দশ, অভীষ্ট জলজ জীবন এবং এসডিজি’র পঞ্চদশ অভীষ্ট, স্থলজ জীবন সংক্রান্ত সবগুলো পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনেই সরকার সচেষ্ট আছে। সকল প্রকল্প ও কার্যক্রমে জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়টি-কে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এসডিজি’র ষোড়শ অভীষ্ট, শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অর্জনের জন্য সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান-কে শক্তিশালী করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য দেশের সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তাদের জন্য বসবাসের জায়গা, নিরাপত্ত, খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাই তো যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে  তাকে আজ বিশ্বের কাছে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এসডিজি’র সর্বশেষ অভীষ্ট, অংশীদারিত্ব-’র ক্ষেত্রে যেখানে, ২০১৬ সালে প্রকৃত উন্নয়ন ঋণ সহায়তা ছিল ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের মত একটি সমন্বিত ও বহুমুখী উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না।

বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে দেশকে অনেক দূর নিয়ে এসেছেন। তার হিরন্ময় নেতৃত্বে আমরা গত দশ বছরে জনবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেছি যার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি দারিদ্র্য ও অসমতার হ্রাস। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন নীতিমালা, বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ তা সুবিন্যস্ত করে এর গভীরতা বাড়ানো, অনগ্রসর অঞ্চলের উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের জন্য ঋণের যোগান, কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব প্রদান, কর ব্যবস্থার গণমুখী সংস্কার প্রভৃতি নীতি মানুষে মানুষে বৈষম্য, গ্রাম-শহরের পার্থক্য, অঞ্চলভিত্তিক অসমতা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা’র হাত ধরেই আমরা ২০১৫ সালের আগেই এমডিজি অর্জন করেছি। আর তাই, যাকে বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস, ২০১৮ সালে বিশ্বের ২৬তম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে মনোনীত করেছে; তার হাত ধরেই আমাদের সরকারের গৃহীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে ২০৩০ সালের আগেই বাংলাদেশ এসডিজি’র সকল লক্ষ্য অর্জন করে সারা বিশ্বের উপরে থাকবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

লেখক: মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

সারাবাংলা/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন