বুধবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

গোহাটির ঢাকা মিশনে ধর্ষণ অভিযোগকে সন্দেহজনক বলছে মন্ত্রণালয়

নভেম্বর ১৩, ২০১৯ | ১১:১৩ অপরাহ্ণ

এমএকে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ভারতের গোহাটিতে বাংলাদেশ মিশনের সহকারী হাইকমিশনার ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে মিশন অফিসেই আসামের একজন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছে বলে ওই শিক্ষার্থী গত বছরের মার্চে অভিযোগ করেন। দীর্ঘসময় নিয়ে একাধিকবার তদন্ত করার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অভিযোগকে ‘সন্দেহজনক’ বলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন সারাবাংলাকে এ তথ্য জানিয়েছেন। সারাবাংলা’র প্রতিবেদক এই ঘটনা অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা গেছে— আসামের ওই শিক্ষার্থী গত বছরের ২৫ মার্চ ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর কাছে ই-মেইল বার্তায় ধর্ষণের অভিযোগ করে জানান, তিনি গোহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে তিনি গোহাটিতে বাংলাদেশ মিশনের সহকারী হাইকমিশনারের একটি সাক্ষাৎকার টেলিভিশনে দেখে মুগ্ধ হন। এরপর থেকে ওই শিক্ষার্থী সহকারী হাইকমিশনারকে ফলো করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইন্সটাগ্রামের মাধ্যমে তাদের দুইজনের মধ্যে পরিচয় হয়। সহকারী হাইকমিশনার ওই শিক্ষার্থীর আহ্বানে সহজেই সাড়া দেন এবং ওই শিক্ষার্থীকে তার ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে তাদের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর কাছে ই-মেইল বার্তায় ধর্ষণের অভিযোগ করে ওই শিক্ষার্থী বলেন, কূটনৈতিক পদমর্যাদার এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা ছিল যে তিনি (সহকারী হাইকমিশনার) খুব ভালো মানুষ, দায়িত্ববান এবং জ্ঞানী হবেন। কিন্তু ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি প্রথমবার সাক্ষাতেই সহকারী হাইকমিশনার সম্পর্কে ওই শিক্ষার্থীর ধারণা উল্টে যায়।

ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্বল্প সময়ের পরিচয়ে ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি মিশন অফিসে দেখা করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানান গোহাটির সহকারী হাইকমিশনার। আমন্ত্রণ পেয়ে আমি তার অফিসে দেখা করতে গেলে তিনি আমাকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করে (হি ফোর্সড মি টু টেক অফ মাই ক্লথস অ্যান্ড টু হেভ সেক্সচুয়াল ইন্টারকোর্স উইথ হিম)। এই ঘটনা ঘটনার আগে সহকারী হাইকমিশনার যে বিবাহিত সে তথ্য আমার কাছে গোপন করেছিল।’

বিজ্ঞাপন

আসামের ওই শিক্ষার্থীর এমন অভিযোগ পেয়ে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর নির্দেশে উপ হাইকমিশনার রকিবুল হক গত বছরের ১২ থেকে ১৪ এপ্রিল অভিযোগটির তদন্ত করেন।

গত বছরের ১৬ এপ্রিল এক বার্তায় হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অভিযোগকারির অভিযোগ পুরোপুরি সত্য না হলেও সহকারি হাইকমিশনার ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে অন্যায় করেছে (মেইন চার্জ অব সেক্সচুয়াল ইন্টারকোর্স কুড নট বি সাবসটেনটেইটেড বাই দ্য একিউজার বাট সিওরলি, দেয়ার হেজ বিন ইমপ্রোপ্রিটি অন দ্য পার্ট অব … এস্টাব্লিশিং কনটাক্টস উইথ দ্যাট লেডি)’।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তার বেশির ভাগ প্রশ্নের জবাব ওই শিক্ষার্থী দিতে পারেনি। বেশিরভাগ সময়েই ওই শিক্ষার্থী বলেন যে সহকারী হাইকমিশনার তার জীবন নষ্ট করেছে এ জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে।

প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন যে তিনি দুইজনকে মুখোমুখি বসিয়ে ঘটনা সম্পর্কে জানার জন্য ব্যবস্থা নিলে তারা দুইজনই (শিক্ষার্থী এবং সহকারী হাইকমিশনার) প্রচণ্ড ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। এমন সময়ে সহকারী হাইকমিশনার মেজাজ খারাপ করে রাগান্বিতভাবে (ইরিটেবলি এন্ড এংগ্রিলি) ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। অন্যদিকে ওই সময়ে ওই শিক্ষার্থী সহকারী হাইকমিশনারের প্রতি মারমুখি আচরণ করছিলেন।

প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘সহকারী হাইকমিশনার আমার কাছে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেননি। তবে সহকারী হাইকমিশনার বলেন যে, ঘটনার দিন ওই শিক্ষার্থী তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল এবং তার প্রতি প্রেম নিবেদন করেছিল।’

তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সহকারী হাইকমিশনার পররাষ্ট্র ক্যাডারের ২৭ ব্যাচের একজন মেধাবী কর্মকর্তা। তার প্রথম বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটেছে অনেক আগেই এবং সে ঘরে একজন ছেলে সন্তান রয়েছে। প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের পর সহকারী হাইকমিশনার একই ক্যাডারের তার থেকে ৩ ব্যাচ সিনিয়র ২৪ ব্যাচের একজন কর্মকর্তাকে বিয়ে করেন। যে কোনো মেয়ে প্রথম দেখাতেই যে সহকারী হাইকমিশনারের প্রেমে পড়তে পারেন, নিজের সম্পর্কে এমন শক্ত ধারণা এই সহকারী কমিশনারের রয়েছে। তাই বিশেষ করে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে তার আরো যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। তিনি চাইলেই এই ঘটনা এড়াতে পারতেন। মিশন অফিসে কোনো নারীর সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি মোটেই দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দেয় না।’

সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই তদন্ত প্রতিবেদনের পর গোহাটির মিশন থেকে সহকারী হাইকমিশনারকে সঙ্গে সঙ্গে ফেরত ঢাকায় আনা হয়। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার বিরুদ্ধে আসা তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে মন্ত্রণালয়ের একটি উইংয়ের পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর গত ২৩ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘নারী নিপীড়ন এবং যৌন নির্যাতন বিরোধী অভিযোগ কমিটি’ গঠন করা হলে ওই কমিটিতে এই বিষয়ে আবার অভিযোগ করা হয়। পুনরায় অভিযোগের পর আগের অসমাপ্ত তদন্ত আবার শুরু হয় এবং সহকারী হাইকমিশানরকে মন্ত্রণালয়ের একটি উইংয়ের পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আনা হয়।

বিষয়টি জানার জন্য পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের কাছে গত ২ অক্টোবর জানতে চাইলে তিনি সারাবাংলা’কে বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের একটি লিগ্যাল প্রসিডিওরের মধ্যে আছে, তাই এখন কোনো মন্তব্য করা যাবে না।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো সারাবাংলাকে জানিয়েছে, দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোহাটি মিশনে ধর্ষণের অভিযোগটির তদন্ত কার্যক্রমের ইতি টেনেছে। মন্ত্রণালয়ের লোক দেখানো তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ওই হাইকমিশনার এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যাবেন। পাশাপাশি তার বর্তমান স্ত্রীকেও ঢাকা থেকে লন্ডনে পদায়ন করা হচ্ছে। এই পদায়নের বিষয়টি বেশ গোপনে হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছে।

গত ৯ নভেম্বর পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি সারাবাংলা’কে বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন সারাবাংলা’কে বলেন, ‘এইটা আমি জানি না। এ ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে মন্ত্রণালয় আমাকে জানিয়েছে যে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। যার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে, এটা হয়ত তাদের মধ্যে যৌথ সম্মতিতেই হয়েছে।  ওই নারী প্রেম করে ওকে (সহকারী হাইকমিশনার) বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের কর্মকর্তা বিদেশি মহিলা বিয়ে করেননি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ বিয়ে করতে পারে, ডিভোর্স করতে পারে, আবার বিয়ে করতে পারে। এগুলো কিন্তু নৈতিকতার স্খলন না।’

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/জেআইএল/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন