বিজ্ঞাপন

রোদ্দুর রায়— এক নৈরাজ্যবাদী স্বর

December 7, 2019 | 9:56 pm

রাজীব নন্দী

গানতো কম বেশি সকলেই গাই। কেউ সুরে, কেউ বেসুরে। এই দুই সুরের বাইরে আরও একটি তৃতীয় চোরাসুর আছে। যাকে ‘অসুর’ বলা হয়। যা প্রথাগত সুরের তোয়াক্কা করে না তাই ‘অ-সুর’। অসুর মাঝে মাঝে সমাজের কণ্ঠ হয়ে ওঠে। আজকের এই আলোচনা তেমনিই একটি অ-সুর প্রসঙ্গ নিয়ে। যাকে নিয়ে এই নিবন্ধ- তিনি রোদ্দুর রায়। কে এই রোদ্দুর রায়? আর কেউ না, ফেসবুক-ইউটিউবে বাঙালির নতুন সেনশেসন হলো এই ব্যক্তি। আমরা সবাই মিলেই তাঁকে রোদ্দুর রায় বানিয়েছি। শীতের সকালে আলস্য ভরা আমাদের সম্মিলিত রোদ পোহানোর মতো উদযাপনের ভেতর দিয়েই এই রোদ্দুর রায়ের জন্ম। রোদ্দুর রায় ‘খারাপ’, ‘অশ্লীল’, ‘বিকৃত’ আর ‘নৈরাজ্যিক’। অবাক হলেও সত্যি, এই খারাপ, অশ্লীল, বিকৃত আর নৈরাজ্যিক স্বরের দর্শকপ্রিয়তাই চারদিকে বেশি। বলা বাহুল্য, যার নাম হুজুগে দর্শকপ্রিয়তা।

বিজ্ঞাপন

প্রথাগত ধারণা, বিশ্বাস, বিধি, গণ্ডি পেরিয়ে নিজের মতো করে পরিবেশন করা গান ‘মোক্সা সঙ্গীত’ নিয়ে হাজির-নাজির এই অভিনব রোদ্দুর রায়। রবীন্দ্র সঙ্গীতের অদ্ভুত প্যারোডি বানান এই রোদ্দুর মশাই। বিদ্রোহী, নৈরাজ্যিক, খুল্লামখুল্লা আর এলোমেলো অ-সুর সব। যতসব উল্টো-পাল্টা, নিষিদ্ধ-ট্যাবু শব্দ ব্যবহার করেন। ইউটিউব থেকে শুরু করে ছেড়ে দেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিচিত্র ছলনার জালে। যেখানে হাজারো শ্রোতা-দর্শকরা এসব ‘গান’ শোনে, অপরকে শোনায়। সবার মাঝে সমবায় করে, সম্মিলিতভাবে উত্তেজিত হয়। রোদ্দুরের উত্তেজিত শ্রোতাদের কঠিন সাঙ্গীতিক সাধনার মধ্যে যেতে হয় না। একটি এনড্রয়েড মোবাইল ফোন আর তাতে ইন্টারনেট ডাটা থাকলেই হলো। ব্যাস, জনপ্রিয় হওয়া ঠেকায় কে?

১৯২৭ সালে ব্যাংকক থেকে পিনাং যাবার পথে কাহারবা তালে রবিঠাকুর লিখেছিলেন- ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে, ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা।’ সেই সুর বিরানব্বই বছর পর রোদ্দুরের কণ্ঠের আলজিহ্বাভেদী ‘কভু খনে খনে যেন জাগে মনে, ভুলো না’ হয়ে হাজির। সেদিন রবিঠাকুরের মনে দোলা লাগা বাতাসে ছিল নিজের ‘মনের প্রলাপ জড়ানো’ নির্মল স্বর, কিন্তু আজকের বাতাসে রোদ্দুরের অভিনব প্রলাপ। সেদিন রবিঠাকুরের ‘আকাশে আকাশে’ ছিল প্রিয়জনের ‘হাসির তুলনা’, আজ দেখছি রোদ্দুরের অতুলনীয় বিকট হা-ময় দিগন্ত প্রসারিত আলজিহ্বা প্রদর্শিত হাসি! রবিঠাকুর পথে যেতে যেতে পূর্ণিমা রাতে দেখেছিলেন ‘চাঁদ উঠেছিল গগনে’। রোদ্দুর রায় সেই সেই পূর্ণিমার চাঁদকে ‘কী জানি কী মহা লগনে’ হাজির করিয়েছেন ভয়ঙ্কর শব্দ তাণ্ডবে! যে লগনে রোদ্দুরের ‘বেলা নেই’ মোটেও, ‘একাকী বিরহের ভার’ বইতে গিয়ে তাই দুম করে কষে গালি দিয়ে দেন ব্যাটা রোদ্দুর। রাখি খুলে দিতে গিয়ে তিনি এমন হুঙ্কার দেন, রাখির বদলে পুরো হাত যেন শরীর থেকে মাটিতে খসে পড়ার দশা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা বিপুল উৎসাহে রোদ্দুর রায়ের এসব শুনছে ও দেখছে। সবার বদান্যতায় রোদ্দুর রায়ের ভাইরাল হওয়া ঠ্যাকায় কে? সম্প্রতি ‘যেতে যেতে পথে, পূর্ণিমা রাতে, চাঁদ উঠেছিল’ গানের রোদ্দুর-ভার্সনটা ভয়াবহ ‘জনপ্রিয়’ হয়ে উঠেছে বাংলাভাষীদের মুখে মুখে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে এই স্বর বাংলাদেশ কিংবা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল।

বিজ্ঞাপন

কে এই বিক্ষুদ্ধ ইন্টারনেট সেনসেশন রোদ্দুর রায়? উদ্ভট সব শব্দ নিয়ে আমাদের ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হাজির রোদ্দুর রায়। ‘চরম ক্যাওড়া’র ব্যথা নিয়ে তিনি ‘ক্যালানের মত ঠ্যাং তুলে’ ভাবতে থাকেন ‘গান্ডুরা ক্যান গাঁজা খায়’? সমালোচকদের চোখে তিনি ‘বিশ্যোকোবি’। কিন্তু এই রোদ্দুর আসলে কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পরিচিত মুখ। যিনি বর্তমানে সারা জাগানো ইউটিউবার। ‘মোক্সা গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট’, ‘মোক্সা রেডিও’র সাথে যুক্ত এই রোদ্দুর কিন্তু সুন্দরবন রামপাল চুক্তি নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষে সরব। খোদ তাঁর ‘ক্যালানি’ থেকে রেহাই নেই বিজেপি-তৃণমূলও। সামাজিক যোগাযোগ সাইটে দেখছি, নিন্দার কাঁটায় রোদ্দুর বিঁধেছে। কেন? সে স্বভাব-সংগীত গায়নি বলে? চেহারায় কদাকার বলে? স্বরে বিকৃত বলে? প্রচারে ভাইরাল বলে? না কি- শুদ্ধ রবীন্দ্র সঙ্গীতকে মারলো বলে? সব ক-টাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়; ওই ‘বিকৃত’ শব্দটিতে আরও অনেকখানি অর্থ পোরা আছে। প্রথমত, রোদ্দুর রায় একটা প্রতিবাদ। হ্যাঁ। রোদ্দুর হতে চেয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে জনপ্রিয় শুদ্ধতার বহুলতম ঐশ্বরিক ক্ষমতা কাঠামো প্রদানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কিন্তু হলো না। ‘রবীন্দ্র-সঙ্গীত’ শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেই বোঝা যায়, জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনও ছোঁবে না। ভুলেও না। সেই সঙ্গীত আজন্ম সতী! রোদ্দুর রায় পুরোটা ব্যতিক্রম। তিনি তার কণ্ঠের আলজিহ্বা পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কথা নিয়েছেন, তাতে নিজের মতো অ-সুর দিয়েছেন। সেটা সম্ভব হয়েছে এই জন্যেই যে, রোদ্দুর কখনও প্রথাগত পদ্ধতিতে মন জোগাতে চায়নি; বরং ভিন্ন এক বার্তা দিয়ে খেয়ালি মনকে জাগাতে চেয়েছিল। শুধু জাগাতে নয়, বরং উসকে দিয়েছিল চারপাশের ভার্চুয়াল পৃথিবীর সবাইকে। রোদ্দুর রায় আজ আকাশ থেকে নেমে পড়া নতুন কোন অবতার নয়। প্রথাগত সঙ্গীতের এমন অভিনব (বিকৃত) উপস্থান যুগে-যুগে, সন্ধিক্ষণে গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখিয়েছে সারা দুনিয়ায়। নিন্দা, নির্যাতন আর ত্যাজ্য হিসেবেই তাঁকে বেঁচে থাকতে হয়েছিল। তাই প্রথা ও গতির একমুখিতার বিরুদ্ধে চলমান সময়কে তুষ্ট না করে, সময়ের গর্ভে নতুন সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা রোদ্দুর রায়। যদিও রোদ্দুরের কথার মধ্যে অসংলগ্নতা আছে। আছে নগ্নতা। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, রোদ্দুরের আছে সাহস। হাসি-তামাশার মেকাপের আড়ালে কঠিন সত্য বলে দেন তিনি।

ফেসবুকের ভরা মজলিশে একদিন দেখি, রোদ্দুর রায়ের গানটি অন্য দশ জনের মতো শেয়ার করছে আমারই প্রিয় এক শিক্ষার্থী। রোদ্দুর রায়ের অভিনব অভিব্যক্তিতে আকুল হয়ে ব্যাকুল প্রচারে নেমে পড়েছে সে। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসেও আমি চাপা গুঞ্জন শুনি- ‘শালা চাঁদ উঠেছিল গগনে’! একটুও অবাক হয়নি। কারণ, এই প্রজন্মটিই যে ভার্চুয়াল জেনারেশন। তবে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষার্থীদের মনের খবর জানতে আগ্রহী হই আমি। কৌতুহল থেকে আমার শিক্ষার্থীকে দুটি প্রশ্ন করি। জানতে চাই- ‘রোদ্দুর রায়কে প্রথম শোনার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া কী’? উত্তরে সে জানায়- ‘প্রথম যখন শুনি, তখন জানা ছিল না যে এটি রবীন্দ্রনাথের কোন গানের বিকৃত ভার্সন। বর্তমান ইয়ং জেনারেশন তাদের কথাবার্তায় প্রচুর স্ল্যাং ব্যবহার করে। তাছাড়া, আমাদের ঢাকাইয়া ভাষায় স্ল্যাংয়ের ব্যবহার অত্যন্ত স্বাভাবিক। বৃদ্ধরাও অনেক অনেক স্ল্যাং ব্যবহার করে। ফলে গানের বিকৃত ভার্সনটাকে আমি একেবারে সহজভাবে নিয়েছিলাম, গালি বা অশ্লীল কোনো গান হিসেবে নয়’। শিক্ষার্থীর সরল-প্রাঞ্জল উত্তর এবং সততা দেখে আমি মুগ্ধ হই। যে গালিময় ঢাকাইয়া সমাজে তাঁর বেড়ে ওঠা, সেখানে রোদ্দুর রায়ের এই গালি তাঁর ভাবজগতে নতুন কিছু নয়। তাই সে স্বাভাবিকভাবেই নেয় রোদ্দুর রায়কে। শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করি, ‘যেতে যেতে পথে গানটি সে কি রোদ্দুর রায়ের মতো গেয়ে আনন্দ পায়?’ উত্তরে সে আমাকে জানায়- ‘গানটির বিকৃত ভার্সন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল বলে স্ক্রলিং করতে গিয়ে প্রায়ই এই গানের অনেক ভিডিও চোখে পড়ত। সপ্তাহ খানেক সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই এই গান রিলেটেড কোনো না কোনো ভিডিও সামনে চলে আসত। তাই এই বিনোদন আমার মাথায় গেঁথে যায়।‘ পরক্ষণেই সে আবার বলে, ‘প্রথমে একে বিনোদন হিসেবে নিলেও বারবার দেখতে দেখতে একটা সময় এর প্রতি বিরক্তি চলে আসে’।

রোদ্দুর রায়ের এক-একটি কন্টেন্ট আধুনিক গণভোক্তা সমাজের গণআচরণের মোক্ষম উদাহারণ। মানুষ এসব কন্টেন্ট মজা নেওয়ার জন্য শুনছে, শেয়ার করছে, একে অপরের কাছে সরবরাহ করছে। এই সম্মিলিত রোদ্দুর সেবন একধরণের গণবিকার। যদিও গণবিকার সমাজে বেশিদিন স্থায়ী হয় না। নতুন আরও একটা বাজারে আসলে পুরাতনটা তার জায়গা ছেড়ে দেয়। ষাটের দশকে যোগাযোগ তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান যে গ্লোবাল ভিলেজের কথা বলে গেছেন, মিডিয়ার প্রাযুক্তিক বিস্ফোরণ এবং পুঁজির সঞ্চরণশীলতার কল্যাণে তা এখন সর্বপ্রতিষ্ঠিত। ইন্টারনেট পুরো দুনিয়াটাকে আক্ষরিক অর্থেই একটি গ্রামে পরিণত করেছে। সেই গ্রামে ‘যার কেউ নেই, তার ফেসবুক আছে। তবে, যার কেবল ফেসবুকই আছে, তার আসলে কেউ নেই’। রোদ্দুর রায় সেই গ্রামের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান। যার আছে ‘এটেনশন সিকিং’ মানসিকতা। এই মানসিকতা ভয়াবহ। রোদ্দুর রায় লিটল ম্যাগ আন্দোলন করে কিংবা শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চা করে এই এটেনশন পেতেন না। তাই তাঁর এই অভিনব রাস্তা বেছে নেওয়া। সেই রাস্তায় তিনি বেসুরো বেহাগ গাইছেন, গাঁজা খাচ্ছেন, ধুম করে সিগারেটে আগুন জ্বালাচ্ছেন! ধ্রুব সত্যকে গালাগাল দিয়ে তিনি বকছেন- বিশ্বকবি বলতে কেউ নেই। এই পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে ধ্রুব বলে কিছু নেই। রোদ্দুর এই দুনিয়ার ‘প্যারা’ নিতে পারছে না, তাই সে সবাইকে ‘প্যারা’ দিয়ে যাচ্ছে।

নিরীক্ষার নামে এইভাবে রবীন্দ্রগানের বিকৃতি ক্ষণিকের বহিরঙ্গের চটক-চমক বটে, কিন্তু তাতে সুর সাধনার রাবীন্দ্রিক ভাব প্রকাশ পায় না। রাবীন্দ্রিক-ভাবের বিচ্যুতিতে তাতে নৈরাজ্য লেগে যায় মহাধুন্দুমারে। রোদ্দুর রায় রবীন্দ্রনাথের সৎ প্রেমিক নয় বলেই তাঁর এই তথাকথিত মোক্সা বিদ্রোহটিতে আমার সমর্থন নেই। অথচ আমরা জানি, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানে দেবব্রত বিশ্বাস (জর্জ দা) ‘ভরা’ শব্দের উচ্চারণ নিয়ে কলকাতার বাবু মহলেও ‘উচ্চারণ বিকৃতি’র গুঞ্জন উঠেছিল। জর্জ দা’র ফুলের গন্ধে যেভাবে শ্রেতাদের ‘চমক’ দেন তাতে বাঙালির অনভ্যস্ত কান কিছুটা হলেও বিরক্ত হয়! কিংবা ‘আবার এসেছে আষাঢ়’ গানে ‘আষাঢ়’ উচ্চারণের মধ্যে জর্জ দা ঘরের চালে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামাতে পারলেও শুদ্ধ রাবীন্দ্রিক অনুসারীদের কাছে দেবব্রত থাকেন না, হয়ে যান- দেবব্রাত্য! দেবব্রত’র সুর আর রোদ্দুরের সুরে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। উদ্দেশ্য-বিধেয় পার্থক্য। তবুও এই তুলনা এজন্য এনেছি যে, রবীন্দ্র সঙ্গীতে সুরের নিরীক্ষার নামে আমরা দেবব্রতকে মেনে নিতে পারি, রোদ্দুরকে কোনো মতেই পারি না। ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ গ্রন্থের ‘পাগল’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন- ‘পাগল শব্দটা আমাদের কাছে ঘৃণার শব্দ নহে। খ্যাপা নিমাইকে আমরা খ্যাপা বলিয়া ভক্তি করি; আমাদের খ্যাপা দেবতা মহেশ্বর। প্রতিভা খ্যাপামির এক প্রকার বিকাশ কি না এ কথা লইয়া য়ুরোপে বাদানুবাদ চলিতেছে–কিন্তু আমরা এ কথা স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হই না। প্রতিভা খ্যাপামি বৈকি, তাহা নিয়মের ব্যতিক্রম, তাহা উলট-পালট করিতেই আসে– তাহা আজিকার এই খাপছাড়া সৃষ্টিছাড়া দিনের মতো হঠাৎ আসিয়া যত কাজের লোকের কাজ নষ্ট করিয়া দিয়া যায়– কেহ বা তাহাকে গালি পাড়িতে থাকে, কেহ বা তাহাকে লইয়া নাচিয়া-কুঁদিয়া অস্থির হইয়া ওঠে।’

আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্ভবত এই অনুচ্ছেদটি লিখেছিলেন রোদ্দুর রায়কে ভার্চুয়াল জগতে স্বাগত জানাতেই। রোদ্দুর রায় কলিযুগের নতুন হাওয়া। এই ঘোর কলিতে জীবনের সমান্তলার আরেকটি ভার্চুয়াল জীবন ফেসবুক-ইউটিউব। অদাহ্য-অকাট্য ফেসবুক-ইউটিউবই আজ বিশ্বময় নতুন প্রজন্মের শেকড় হয়ে উঠছে। ফেসবুক-ইউটিউবে রোদ্দুর রায়কে দেখে মনে হয়, গরুর হাটে কেবল গরুই থাকে না- থাকে ছাগলও! সেই হাটে রোদ্দুর রায় আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়- আমরা তলে তলে একেকজন রোদ্দুর রায়-ই বটে।

সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট অনুভব করছি। মানুষের জীবন-যাপন, যোগাযোগ, আবেগ-অনুভূতি বাটোয়ারার এত বড় সামাজিক যোগাযোগ সাইট এর আগে কখনও এতটা প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে হাজির হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে আজ ফেসবুক ইন্টারনেটভিত্তিক সাইবার কমিউনিটি গড়ে তুলেছে। এটি এখন সমাজের জনপ্রিয় ‘টুল’। গোটা ভার্চুয়াল বিশ্বের সাথে সাদৃশ্যময় কৃত্রিম জগত হলেও ফেসবুকের বন্ধন অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এখানে রোদ্দুর রায়কে দেখে উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথ মোমের পুতুল না যে, হালকা রোদ্দুরে গলে যাবে! রবীন্দ্রনাথ চোখের মণি নয় যে, রোদ্দুরে ঝলসে যাবে। বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ও বহুমাত্রিক গবেষক এবং ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন- ‘বাঙলার আকাশের নাম রবীন্দ্রাকাশ।’ সেই আকাশজুড়ে রোদ্দুরের নটরজান নৃত্য এতটুকুও মেঘ আনতে পারবে না। রোদ্দুর রায়কে নিরঙ্কুশ উপেক্ষার মধ্যেই তার বিদায় কৌশল লুকিয়ে আছে।

রোদ্দুর রায়— এক নৈরাজ্যবাদী স্বর

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক
ই-মেইল: rajibndy@gmail.com

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন