বিজ্ঞাপন

সংস্কৃতির সংকটকালে ওয়েব কন্টেন্ট দমন ও নিয়ন্ত্রণের বাসনা

July 14, 2020 | 5:43 pm

বেলায়াত হোসেন মামুন

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতি বা দৃশ্য-সংস্কৃতির এখন ঘোর বিপদের কাল চলছে। এমনটা নয় যে এটা কেবল এই করোনা মহামারি বা অতিমারির প্রকোপ। এটা আসলে বেশ অনেকদিন ধরেই দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতিকে রাহুগ্রস্ত করছিল। করোনা মহামারি এই বাস্তবতাকে নিকটবর্তী করেছে মাত্র।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের দৃশ্য-সংস্কৃতির এই সংকটকাল অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন কঠিন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। যে কোনো অর্থেই এটা খুব দুঃখজনক বাস্তবতা আজ। এই বাস্তবতায় আদতে আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতি এখন নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের মধ্যভাগে অবস্থান করছে।

এই পরিস্থিতি খুব কঠিন, কারণ চলচ্চিত্র অথবা দৃশ্য মাধ্যমের অপর যে কোনো কন্টেন্ট নির্মাতাদের সাথে কেবল অভিনয়শিল্পীরা নন, কারিগরি ব্যবস্থাপনা, বিপণনসহ বিভিন্ন স্তরে প্রচুর মানুষ এই মাধ্যমের সাথে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। এই সব মানুষ যদি বর্তমান বাস্তবতায় কর্মহীন থাকতে থাকতে পেশা বদল করেন তবে আগামী দিনে দৃশ্য মাধ্যমে যথেষ্ট ‘পেশাদার’ মানুষ না-থাকার আরেক সঙ্কট আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

দৃশ্য-সংস্কৃতি খুব জটিল একটি মাধ্যম। এই মাধ্যমে যারাই যত রকমের কাজে যুক্ত আছেন তাতে তাদের নিজস্ব কিছু প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা আছে। আছে দীর্ঘদিনের চর্চা ও অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সহজাত গুণ। এসব প্রয়োজনীয় মানুষ একবার হারালে রাতারাতি আবার এসব মানুষ তৈরি করা সহজ কাজ নয়।

একটি দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতির বাতাবরণ তৈরি হতে যদি পঞ্চাশ-ষাট বছরের একটি জার্নি থাকে তবে সে জার্নির অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এই সংস্কৃতিকে চলমান রাখতে প্রাণরস ও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। তাই আমরা এই মাধ্যমের সকল মানুষের একই সাথে কর্মহীন হয়ে পড়ার বাস্তবতায় এবং জীবনধারণের প্রয়োজনে পেশাবদলের এই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারি না। এটা আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতির জন্য ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। এই বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগ ও ভাবনা জরুরি। প্রয়োজন সত্যিকার কার্যকর কিছু উদ্যোগের। যাতে দৃশ্য-সংস্কৃতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সবাই এই সংকটকাল সহজে অতিক্রম করতে পারে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

যখন আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করা দরকার তখন দুটি ঘটনা আমাকে আরও বিচলিত করেছে। ঘটনা দুটি ভিন্ন হলেও এর অভিঘাত সাংঘাতিক ক্ষতিকারক এবং তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

গত ২৪ ও ২৫ জুন তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি পৃথক পদক্ষেপে আমি ভাবিত হয়েছি। ২৪ জুন তথ্য মন্ত্রণালয় দেশে সম্প্রতি আলোচিত ওয়েব সিরিজ বিতর্কে সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যা আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে আরও সংকটপূর্ণ করেছে। অন্যদিকে ২৫ জুন তথ্য মন্ত্রণালয় ২০১৯-২০২০ সালে চলচ্চিত্র অনুদানপ্রাপ্তদের তালিকা ঘোষণা করেছে। এই তালিকা দেখে মনে হয়েছে; আমাদের কোনো একটি ক্ষেত্রও বিনষ্ট হতে বাকি নেই। এটা ভীষণ পরিতাপের হলেও এটাই সত্য। যদিও আজকের আলোচনায় অনুদান প্রসঙ্গটি আপাতত উহ্য রাখছি।

কিন্তু পরপর দুই দিনে চলচ্চিত্র অনুদান ও ওয়েব কন্টেন্ট বিষয়ে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ হতাশ করলেও তা আমাদের অবাক করেনি। আমরা অবাক হইনি, কারণ চলমান বাস্তবতায় এর থেকে ব্যতিক্রম কিছু আমরা আশাও করিনি। কিন্তু এটা তো আমাদের হতাশারই উচ্চারণ। নয় কি?

ওয়েব নির্ভর বিনোদন বাণিজ্যে এক বিস্ময়কর বিস্তার ঘটে গেছে গত দশ বছরে। কোনো সন্দেহ নেই এই বিস্তার সামনের দিনগুলোতে আরও অপ্রতিরোধ্য হবে। এই অপ্রতিরোধ্য ওয়েব নির্ভর ‘বিনোদন’ দুনিয়ায় আমরা কেবল নতুন নই; আমরা অপ্রস্তুত এবং নাবালক। আমাদের এই নাবালকত্বের উদাহরণ অনেক আছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো, বাংলাদেশে নির্মিত দুই বা তিনটি ওয়েব সিরিজ নিয়ে ‘শ্লীল নাকি অশ্লীল’ বিতর্ক। ব্যক্তিগত ডিভাইসভিত্তিক ‘বিনোদন’ প্রপঞ্চে আমাদের দেশের ‘সংস্কৃতিজনের’ আলোচনার টপিক হলো ‘পরিবারের সবাই’ মিলে দেখার মতো বিনোদন কন্টেন্ট। আজকের দিনে এ ধরনের আলোচনার টপিকই যে কতটা হাস্যকর তা যদি আমাদের ‘অগ্রসর’ মানুষজনই না বুঝতে পারেন তবে ‘চিলে কান নেয়া’ উড়ো কথায় আস্থাশীল দেশের অধিকাংশ জনতার আর কি দোষ?

এই যখন সামাজিক পরিস্থিতি তখন গত ২৪ জুন তথ্য মন্ত্রণালয় দুটি অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কাছে তাদের প্রচারিত ওয়েব সিরিজে ‘সেন্সরবিহীন ও কুরুচিপূর্ণ’ দৃশ্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। আর এই চিঠিতে তথ্য মন্ত্রণালয় মোট ৫টি আইনের বিভিন্ন ধারায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।

খেয়াল করুন, তথ্য মন্ত্রণালয় ‘ব্যাখ্যা’ চাওয়ার জন্য দেশে অলরেডি বিদ্যমান ৫টি আইনের কথা উল্লেখ করে সেই সব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। অর্থাৎ ওয়েব নির্ভর এই নতুন ‘বিনোদন’ তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে সরকারের আসলে ‘নতুন’ কোনো আইন প্রণয়নেরও প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান গোটা পাঁচেক আইনের বিভিন্ন ধারায় চাইলে সরকার এই ওয়েবের দুনিয়ার জন্য কন্টেন্ট প্রস্তুতকারী যে কোনো নির্মাতা-অভিনেতা-কলাকুশলীর বিরুদ্ধে নানাবিধ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনতে পারেন। তো এই ভয়ের খড়গ মাথায় নিয়ে সৃজনশীল ও চিন্তাশীল কাজ হবে?

ওয়েব কন্টেন্ট নিয়ে ওঠা এই সামাজিক বিতর্কের চাপ এবং সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘কারণ দর্শানোর’ এই চিঠি আর নানাবিধ হুমকির পর ওয়েব কন্টেন্ট নির্মাণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা অর্থ লগ্নি করার কথা ভাবছিলেন তারা পিছিয়ে গেছেন বলে শুনছি। আর যারা নির্মাণ করার ইচ্ছে নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, যারা অভিনয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিলেন তাদের উদ্দীপনা আর আগের মতো নেই। এই ভীতি তৈরির প্রকল্পে আসলে সত্যিকারের ক্ষতিটা হলো কার?

আলোচনায় এসেছিল ‘শ্লীল-অশ্লীল’ বিতর্ক। আগামীকাল হয়ত অন্য কিছু নিয়ে বিতর্ক হবে। বিতর্ক সমাজে হতেই পারে। বিতর্ক হওয়াটা স্বাস্থ্যকর বিষয়। যে সমাজে বিতর্ক ও মুক্ত মত প্রকাশের অবাধ স্পেস থাকে না, সে সমাজ তো মৃত সমাজ। এটা ভালো যে আমাদের সমাজে বিতর্ক এখনও কিছু কিছু হয়। বিতর্ক হয়, তাই বলে সামাজিক এই বিতর্কে ভয়ভীতি হয়ে অথবা অতি উদ্দীপনায় চটজলদি তা বন্ধ করতে তৎপর হতে হবে? সামাজিক চাপ ও কিছু মানুষের হুমকি-ধমকিতে শিল্প ও শিল্পীর প্রতি রাষ্ট্রের দায় আমরা ভুলে যাবো?

রাষ্ট্রের কর্তব্য শিল্প ও শিল্পীর সুরক্ষা দেওয়া। শিল্পীর চিন্তায় ভয় বিস্তার নয়। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে পদক্ষেপ তাতে সামাজিক এই বিতর্কে আমাদের রাষ্ট্র শিল্প ও শিল্পীর তৎপরতাকে লাল ফিতার ভয়ই দেখিয়েছে। এটা দুঃখজনক।

আগের কথার রেশ ধরে বলছি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শুধু নয়, পুরো দৃশ্য-সংস্কৃতিই এখনও অবিকশিত রয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রতিমুহূর্তে দুনিয়ার সবরকম দৃশ্যমাধ্যমের সুবিধা ও সুযোগ গ্রহণ করছে। কিন্তু সে সুযোগ ও সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে আমাদের এই বিপুল জনগোষ্ঠী মূলত অপর দেশের পণ্যের ভোক্তা বা খরিদদার মাত্র। বাংলাদেশের কিছু মানুষের অপর দেশের হাজার রকমের ‘বিনোদন পণ্যের’ কাস্টোমার হওয়াটাতে কোনো আপত্তির কিছু নেই, যত আপত্তি কেবল নিজের দেশের কন্টেন্টের বিষয় ও ভঙ্গিতে। অদ্ভুত এই ডিলেমা।

অথচ সবাই জানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ভীষণভাবে মুক্ত স্পেস। কেউ চাইলেও তা সীমায়িত করা যায় না। কিন্তু এই অসম্ভবকে ‘সম্ভব’ করার গোঁয়ার্তুমি আমরা দেখছি বাংলাদেশে। অনলাইনের সবরকম কন্টেন্টকে ‘সেন্সর’ করার এই যে সামাজিক চাপ ও সরকারি বাসনা; তা আদতে অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। আর এই অজ্ঞতার মাশুল আমাদেরকে চড়া মূল্যে দিতে হতে পারে। কারণ প্রতিদিন আমাদের নিজের দেশের বাজার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর নিজের দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতি প্রায় মরতে বসেছে। এটা একবার যদি পুরোপুরি ধ্বসে পড়ে তবে একে পুনরায় ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ শুধু নয়, এটা শতভাগ কঠিন কাজ হবে। অথচ আজকের দিনের কিছু সচেতন ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত এই পরিস্থিতিটা বদলে দিতে পারে। কিন্তু সে চেষ্টা এখনও কারো মধ্যে দেখছি না।

বিনোদন ও চিন্তাশীল উভয় কাজের জন্য অনলাইন মাধ্যমের সম্ভাবনা বিপুল। এই সম্ভাবনাকে ‘বিপদ’ ভেবে আমাদের সমাজ ও সরকার একে লাল ফিতায় বাঁধতে তৎপর হয়েছেন। জানা কথা, এটা আখেরে আমাদের কোনো কাজে আসবে না। আমরা আমাদের দেশের দর্শককে অপর দেশের বানানো কন্টেন্টে আসক্ত হতে দেখছি। এটা চলছে এবং সময়ের সাথে সাথে এটা বাড়বে। এতে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক দেউলিয়ানা তরান্বিত হচ্ছে কেবল। যা থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে ‘সেন্সরবিহীন ও কুরুচিপূর্ণ’ এসব কথার মোরাল পুলিশিং সামাজিকভাবে বন্ধ করতে হবে।

কারণ ‘সেন্সর’ শব্দটিই বর্তমান দুনিয়ায় একটি আধিপত্যকামী ও দমনমূলক শব্দ। এটি এখন আর কোনো সভ্য রাষ্ট্রের ভাষা নয়। ‘কুরুচিপূর্ণ’ শব্দটিও ভীষণভাবে আপেক্ষিক। কারণ রুচি যার যার ব্যক্তিগত। আপনার রুচিতে যা অস্বস্তিকর তা আপনি দেখবেন না। কিন্তু কাউকে দেখতে দেবেন না; এটা কোনো গণতান্ত্রিক আচরণের মধ্যে পড়ে না। একইভাবে ‘আপত্তিকর’ শব্দটিও আপেক্ষিক। আপনার কাছে যা ‘আপত্তিকর’ তা অন্যের কাছে নাও তো হতে পারে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানুষের সব বিষয়ে স্বাধীনতা ভোগ করার কথা। তার চিন্তার যেমন স্বাধীনতা আছে, আছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু কারো মত পছন্দ না হলেও তা অপরকে মানতেই হবে এমন জবরদস্তি নিশ্চয়ই সংবিধান সম্মত হতে পারে না।

আফসোসের বিষয় হলো, আমরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু ব্রিটিশ অনেক আইন থেকে আজও মুক্ত হতে পারিনি। আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হয়েছি কিন্তু পাকিস্তানী আমলাতন্ত্রকে বাতিল করিনি বরং তা নিজেদের মধ্যে আত্তীকরণ করে নিয়েছি। আর এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা নিজেরাই এমন সব আইন তৈরি করেছি যা আমাদের নিজেদের হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলছে।

এখন আমাদের সচেতন হওয়া উচিত আমাদের নিজেদের ঘরকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় চিন্তায়। আমাদের উচিত দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যকামী সকল আবর্জনা দূর করার। আমাদের উচিত আমাদের প্রশাসনিক ও আইনগত সকল শোষণমূলক ব্যবস্থা ও দমনমূলক আইন বাতিলের জন্য নিজেদের একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ করায় মনোযোগী হওয়া। সংস্কৃতি ও শিল্পের নিরঙ্কুশ মুক্তির জন্য যদি আমাদের সংবিধান নতুন করে লিখতে হয় তবে তাই করতে হবে। কারণ যা আমাদের বেঁধে রাখে তা যত মূল্যবানই হোক না কেন তা আদতে এক শৃঙ্খল। যে শৃঙ্খল বেঁধে রাখে তা স্বর্ণের হোক আর পাটের; সে দড়ি কেটে ফেলাতেই মুক্তি।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও সংগঠক, সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন