বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট, কতটুকু প্রস্তুত বাংলাদেশ?

December 21, 2020 | 11:16 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের মহামারি পরিস্থিতি থামেনি বিশ্বের কোথাও। এর মধ্যেই যুক্তরাজ্যে এই ভাইরাসের নতুন একটি ‘ভ্যারিয়েন্ট’ ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগেও করোনাভাইরাসের জিনগত নানা ধরনের পরিবর্তন বা মিউটেশন দেখা গেছে। তবে নতুন রূপের এই করোনাভাইরাসের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ছড়িয়ে পড়ার হার ৭০ শতাংশের বেশি।

বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯ ভাইরাসের নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট দেখা যাওয়ায় বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে যুক্তরাজ্য নিজেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। একই পথে হেঁটেছে কানাডা ও ভারত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।

আকাশপথে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নিয়মিত ফ্লাইট চালু থাকায় দেশটিতে করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশেরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বিমানবন্দরে বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি প্রয়োজনে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধের পথে যাওযার পরামর্শ দিচ্ছেন। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ভাইরাসের নতুন এই রূপটি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।

বিজ্ঞাপন

করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্টে যেসব পরিবর্তন

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে বিজ্ঞানী-গবেষকরা করোনাভাইরাসের একটি নতুন বংশানুক্রমিক শাখা (ফাইলোজেনিক ক্লাস্টার) শনাক্ত করেছেন। এর নামকরণ করা হয়েছে B.1.1.7 lineage। ধারণা করা হচ্ছে, এটিই যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যপক হারে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত GISAID জিনোম ডাটাবেজে এই নতুন ভ্যারিয়েন্টের ৫৬ হাজার ৪১৪টি ভাইরাস নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স জমা পড়েছে। এই নমুনাগুলোতে ১৪টি অ্যামাইনো এসিড পরিবর্তনকারী এবং তিনটি ডিলিশন মিউটেশন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এই ভ্যারিয়েন্টে করোনার পরিবর্তনগুলোর মাঝে অন্যতম N501Y মিউটেশন, যেটি করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের রিসেপ্টর বাইন্ডিং ডোমেইনে ঘটেছে। দেখা গেছে, এই পরিবর্তনটির ফলে ACE2 রিসেপ্টরের সঙ্গে ভাইরাসটির বন্ধন সক্ষমতা বেড়ে যায়। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো, স্পাইক প্রোটিনের ৬০-৭০ পজিশনে ডিলিশন অর্থাৎ মুছে যাওয়া। এর ফলে ভাইরাসটি আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার আরেকটি সুযোগ পায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবি গুপ্ত জানিয়েছেন পরীক্ষাগারে এই মিউটেশনটির কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রবণতা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।

এখানেই শেষ নয়, নতুন ভ্যারিয়েন্টটির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশনটি হচ্ছে P681H, যেটি ঘটেছে ভাইরাসটির স্পাইক প্রোটিনের ফিউরিন ক্লিভেজ সাইট নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। এই জায়গাটি মানুষের দেহকোষের সঙ্গে লেগে যাওয়ার পর করোনাভাইরাসকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে সুবিধা দিয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীদের ধারণা, সম্ভবত দীর্ঘ মেয়াদে আক্রান্ত রোগীদের থেকে এই নতুন ভ্যারিয়েন্টটি তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রকরণটি সংক্রমণের দিক থেকে বেশি ক্ষমতাধর হলেও রোগের তীব্রতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে এখনই কোনো তথ্য মিলছে না। আবার এই ভ্যারিয়েন্টের মিউটেশনগুলো করোনাভাইরাস প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত উৎপাদিন ভ্যাকসিনগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট তথ্য নেই; যদিও বিজ্ঞানীদের ধারণা— ভ্যাকসিনে এর প্রভাব নাও পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসের নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও চিকিৎসা জীবপ্রযুক্তিবিদ ডা. মো. মারুফুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, নভেম্বর থেকেই কিন্তু যুক্তরাজ্যে অনেক বেশি হারে করোনাভাইরাসের পুনঃসংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। উচ্চ ভাইরাল লোড আছে— এমন রোগীদের প্লাজমা থেরাপি দেওয়ার ফলে রোগী থেকে রোগীতে প্রাপ্ত ভাইরাস জিনোমের মধ্যে বেশি পার্থক্য দেখা গেছে। প্লাজমা থেরাপির অ্যান্টিবডি দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত হওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া (ইমিউনোকম্প্রোমাইজড) রোগীদের শরীরে অবস্থিত ভাইরাসের ওপর বিশেষ মিউটেশন প্রেশার তৈরি করতে পারে। ফলে এই অ্যান্টিবডি ফাঁকি দিয়ে বেঁচে থাকা ও সংক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার মতো মিউটেশন অর্জিত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সংক্রমণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। তাতে হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ তৈরি হতে পারে বিবেচনায় যুক্তরাজ্যে কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। অনেক দেশই যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত। কেননা ফ্লাইট চালু থাকার কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর যাত্রী যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন এবং সেখান থেকে দেশে আসছেন।

ডা. মারুফুর রহমান বলেন, আমাদের জনসংখ্যা ও ঘনবসতি বিবেচনায় করোনাভাইরাসের এই নতুন প্রকরণটি দেশে এলে আমাদের দেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। তাই আমি মনে করি, আমাদের এখনই এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে যাওয়া উচিত। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুতই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ আপাতত স্থগিত করা উচিত। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত এ ধরনের সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।

দেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা সারাবাংলাকে বলেন, যুক্তরাজ্যের এই পরিস্থিতিটি সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ পেয়েছে। তবে গত দুয়েকদিনে আমাদের কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। এ অবস্থায় আমি ব্যক্তিগতভাবেই অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। জাতীয় কারিগরি কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনার পরে আশা করছি অন্যদের মতামত জানাতে পারব। তবে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে নতুনভাবে যে বৈশিষ্ট্যের কারণে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে, সেটি উদ্বেগজনক। তবে ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এটি কতটুকু প্রভাব রাখতে পারে, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু ভাইরাসটির এই রূপ যেন আমাদের দেশে প্রবেশ না করতে পারে, সেজন্য আগে থেকেই ব্যবস্থা নিয়ে হবে। এক্ষেত্রে যারা যুক্তরাজ্য থেকে আসছেন, তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। সিলেটের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের যোগাযোগটা বেশি। সেক্ষেত্রে ঢাকা ছাড়াও সিলেট বিমানবন্দরে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো যাত্রীকেই ওঠানো যাবে না। এমনকি কোভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ নিয়ে এলেও তাদের আলাদাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে নেওয়া প্রয়োজন।

কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটির অন্যতম সদস্য এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, যুক্তরাজ্যে নতুনভাবে কোভিড-১৯-এর যে বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে আসলে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এই ভ্যারিয়েন্ট বা ভ্যাকসিনের ওপরে এর প্রভাব নিয়েও আলাদাভাবে এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না। সংক্রমণের ঝুঁকি বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকেই যাত্রী আসুক না কেন, সব ক্ষেত্রেই থাকতে পারে। এক্ষেত্রে আসলে বিমানবন্দরে বর্তমানে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা আছে, সেটিকে ঠিকভাবে পালন করতে হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান সারাবাংলাকে বলেন, বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীর কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরীক্ষা করার ব্যবস্থা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে আছে। এক্ষেত্রে যদি সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ মনে করে কোনো দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করা প্রয়োজন, তবে সেটি তাদের এখতিয়ার। এক্ষেত্রে আসলে আমাদের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো কিছু বলার নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী সারাবাংলাকে বলেন, নতুন এই স্ট্রেইন আসলে ভ্যাকসিনের ওপর তেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। কারণ এখনো এমন মিউটেশন দেখা যায়নি যার জন্য ভ্যাকসিনে প্রভাব পড়তে পারে। এই স্ট্রেইনটি তেমন ডেডলিও না। তবে এটি খুব দ্রুত ছড়ায় বলেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে যেটা দেখা গেছে, সেটা একদিকে যেমন বেশি ছড়ায়, অন্যদিকে তেমনই প্রাণঘাতী।

তিনি বলেন, যেকোনো দেশে নতুন স্ট্রেইন মোকাবিলার ক্ষেত্রে আসলে আইডিয়াল পরিস্থিতি হলো সেটিকে আসতে না দেওয়া। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের এই স্ট্রেইনটি যেন আমাদের দেশে আসতে না পারে, সেজন্য সম্ভব হলে তাদের সঙ্গে ফ্লাইট যোগাযোগ বন্ধ রাখা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অনুযায়ী যদি সেটি সম্ভব না হয়, তবে অবশ্যই ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে আসলে বিমানবন্দরে কঠোর সতর্কতা ব্যবস্থা নিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি কেউ নেগেটিভ সনদ নিয়ে আসার পরও তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তত তিন দিন কোয়ারেনটাইনে রাখা যায়। তিন দিন পর আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করে নেগেটিভ এলে তবে ছাড়পত্র দেওয়াটাই দেশের জন্য নিরাপদ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র ও এমআইএস শাখার পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত আসলে এই নতুন স্ট্রেইন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে উচ্চ পর্যায় থেকে। তখন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যুক্তরাজ্য থেকে আসা যাত্রীদের বিষয়ে আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল-আহসান সারাবাংলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। যদি আসে, তবে সেটি আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দেবো।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হকের যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। আর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী সারাবাংলাকে বলেন, আমরা এখনো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। যদি কোনো গুরুতর অবস্থা দেখা দেয়, তবে অবশ্যই খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন