বিজ্ঞাপন

করোনায় বন্ধ আর অটোপাসে গেল ২০২০

December 31, 2020 | 2:31 pm

তুহিন সাইফুল ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: চার কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীকে ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি বই দিয়ে ২০২০ সালকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশের শিক্ষাবিষয়ক দুই মন্ত্রণালয়। এরপর সবকিছুই চলছিল ঠিকঠাক। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও হয়ে যায় যথা সময়ে। প্রস্তুতি চলছিল এইচএসসি পরীক্ষার। ঠিক তখনই বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। থমকে যায় সব। বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর পর স্থগিত করে দেওয়া হয় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও। সারাদেশে লকডাউন দেওয়ায় প্রথম কিছুদিন ছুটির আমেজে কাটায় শিক্ষার্থীরা। এরপর শুরু হয় অনলাইনে ক্লাস। প্রথমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই পদ্ধতিতে ক্লাস শুরু করলেও পরে কলেজ পর্যায়েও এটি চালু হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের নির্দেশে টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে শুরু হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ভার্চুয়াল ক্লাসও।

মোটা দাগে বলতে গেলে ২০২০ সালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হলো এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল। পরীক্ষা বাতিলের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এসএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে তৈরি করা হবে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফল। যা এখনো প্রক্রিয়াধীন।

বিজ্ঞাপন

এসএসসির ফল

এবছর ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয় এসএসসি পরীক্ষা, শেষ হয় মার্চের প্রথম সপ্তাহে। সেই হিসাবে এপ্রিলের শেষ দিকে ফলাফল প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু লকডাউনের কারণে সারাদেশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষকরা যথা সময়ে খাতা দেখে বোর্ডে পাঠাতে পারেননি। আটকে যায় ওএমআর শিট যাচাইও। পরে মে মাসে ২০ দিন সময় নিয়ে ওএমআর শিট যাচাই করা হয়। ফল বের হয় মে মাসের ৩১ তারিখে। শেষ পাঁচ বছরের এবারই প্রথম এসএসসির ফল প্রকাশ করতে ৬০ দিন বা দুই মাসের বেশি সময় নেয় বোর্ড। এসএসসিতে এবার পাশের হার ছিল ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি

এসএসসির ফল প্রকাশের পর নতুন করে জল ঘোলা হতে থাকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নিয়ে। করোনা সংক্রমিত হতে পারে এই শঙ্কায় এবছর একাদশের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করতেও দেরী হয়। আজ কাল করতে করতে ভর্তি আবেদন শুরু হয় আগস্টে। পুরো সেপ্টেম্বর জুড়ে চলে ভর্তির কাজ। এরপর অক্টোবরে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অনেক কলেজ অনলাইনেও ক্লাস শুরু করতে পারেনি। তবে ঢাকা কলেজ ও ভিকারুননিসার মতো অনেক কলেজ আবার ক্লাস শেষ করে প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষাও নিয়ে ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

এমপিও

গেল বছরে যে এক হাজার ৬৩৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেওয়া হয়েছিল তার প্রজ্ঞাপন এবছরের ২৯ এপ্রিল জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়াও এর একদিন পর ৯৭৩টি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় এমপিও কোড। পাশাপাশি এ বছর ২ হাজার ৩২ জন শিক্ষক কর্মচারীকে এমপিও দেওয়া হয় সেপ্টেম্বরে। নভেম্বরে এই তালিকায় যুক্ত হয় আরও এক হাজার ৪৬৩টি নাম। সব মিলিয়ে এই বছরে পাঠদান বন্ধ থাকলেও পাঠে সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগের দাবি-দাওয়া সরকারের পক্ষ থেকে মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল।

বিজ্ঞাপন

এইচএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা বাতিল

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আলোচনায় আসে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি। এই পরীক্ষা নিতে সারা বছর ধরে সরকার সবধরনের চেষ্টা করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা মিলে দফায় দফায় মিটিং করেছেন শিক্ষাবিদদের সঙ্গে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে শক্ত কোনো মতামত হাজির করেননি। ফলে শেষ মুহূর্তে এসে ৭ অক্টোবর পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এটিই এখন পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা। তবে পরীক্ষা বাতিল হলেও এর ফলাফল এসএসসি ও জেএসসির ফলের ভিত্তিতে দেওয়া হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

এরই ধারাবাহিকতায় বাতিল হয়ে যায় চলতি বছরের জেএসসিসহ বাকি সব পাবলিক পরীক্ষা। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল করে চালু করা হয় বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি। তবে এসব ছাপিয়ে এখনও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার ফল। কারণ এই সপ্তাহেই পরীক্ষাটির ফল প্রকাশ করার কথা রয়েছে।

দীর্ঘতম বন্ধ

গত ১৮ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর এই বন্ধের সময় দফায় দফায় বাড়তে থাকে। যা ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘতম বন্ধের রেকর্ড। এমনি কি ভারতবর্ষে বিদ্যালয় স্থাপনের পর কখনোই এত দীর্ঘ সময় শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়নি। এর আগে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সর্বোচ্চ নয় মাস বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

বই উৎসব

চলতি বছরে বই উৎসব দিয়ে বছর শুরু হলেও আগামী বছরটি আর উৎসব দিয়ে শুরু করা সম্ভব নয়। এর বদলে এবার ভার্চুয়ালি উৎসবের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর বই প্যাকেট করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে। এ বছরের মতো আসছে বছরও প্রায় ৩৬ কোটি বই বিতরণ করা হবে শিক্ষার্থীদের মাঝে। সবকিছু ঠিক থোকলে ফেব্রুয়ারি থেকে বই হাতে স্কুলে যেতে পারবে শিক্ষার্থীরা।

এর বাইরেও এ বছর শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ছিল প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ আর শিক্ষক আন্দোলন। বন্যায় এ বছর কয়েক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতক্ষ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজাতে সরকার খরচ করছে ১২৮ কোটিরও কিছু বেশি টাকা। একইসঙ্গে প্রাথমিকে দেওয়া হচ্ছে ৩২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ। এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শিক্ষক আন্দোলনও হয়েছে এবছর। প্যানেল করে নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন করেছে প্রাথমিকের চাকরিপ্রার্থীরাও।

এই শিক্ষাবর্ষ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, ‘এবার কোনো কিছুই আমাদের হাতে ছিল না। তারপরও আমরা চেষ্টা করেছি। গেল ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যেভাবে সাজিয়েছে আমরা তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। মহামারি না হলে হয়তো অনেক কিছুই সহজে করা যেত। তারপরও যতটুকু হয়েছে আমরা সন্তুষ্ট। আসছে শিক্ষাবর্ষে করোনার প্রকোপ কমবে বলে আশা করছি। শিক্ষাক্ষেত্রগুলোও মুখর হবে শিক্ষার্থীদের পদচারণায়।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ‘একেবারেই নতুন একটি সময়কে আমারা ফেস করেছি। মহামারি ঠেকাতে পুরো পৃথিবীকে হিমশিম খেতে হয়েছে। আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। মহামারির পরও যেভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে সেটি নিঃসন্দেহে অভাবনীয়।’

সারাবাংলা/টিএস/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন