বৃহস্পতিবার ২৭ জুন, ২০১৯ ইং , ১৩ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

ফাতেমারা যে কারণে গার্মেন্টসের কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়…

মার্চ ২৮, ২০১৮ | ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ

ফাতেমা, কতইবা বয়স হবে, খুব বেশি হলে ১৯ বা ২০। একটা সময় মেয়েটি আমার কাছে থাকতো। তারপর একদিন গার্মেন্টসে কাজ নিয়ে চলে গেল। এরপর ২/৩ বছর তেমন কোন যোগাযোগ ছিলনা। তবে একবার এসে বলেছিল ও ভাল আছে। ভাল আয় করছে। স্বাধীন জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু এর ২/৩ বছর পরে হঠাৎ একদিন এসে বলল, ”খালাম্মা আমাকে একটা কাজ যোগাড় করে দেন। আমি আর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে চাইনা।” জানতে চাইলাম, ”কেন তুমিতো ভালই ছিলে গার্মেন্টেসে। তাহলে ছাড়লে কেন?” ফাতেমা বলল “ছিলাম ভালই খালাম্মাা। কিন্তু সুপারভাইজার খুব খারাপ ব্যবহার করে। আজেবাজে কথা বলে। কোন কারণ ছাড়াই শরীরে হাত দেয়। সবারই একই অবস্থা। কিন্তু উপায় নাই দেখে সবাই মেনে নেয়।” আমি বললাম, ”নালিশ জানাতে পারো না? বলেছিল, কারে জানামু, কেউ কথা শোনার নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা কি জানেন, আমাদের সাথের বেশিরভাগ মেয়ে বুঝতেই পারেনা যে তাদের ইজ্জত কিভাবে নষ্ট হচ্ছে।” ফাতেমার এই ঘটনা প্রায় ১৪/১৫ বছর আগের।

আজ এতবছর পর এসে আবার আমার ফাতেমার কথা মনে হল। মনে হওয়ার কারণও আছে। ফাতেমার কথাগুলোর সত্যতা ফুটে উঠলো একটি গবেষণায়। গবেষণা প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই বুঝতে পারেন না যে কাজ করতে গিয়ে তারা নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কারণ তাদের যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা কারখানার নিয়মিত কাজের পরিবেশের সাথে এমনভাবে মিলেমিশে গেছে এবং কাজের জায়গায় প্রতিদিনের যৌন হয়রানির মাত্রা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, তাদের প্রতি যে যৌন হয়রানি করা হচ্ছে, অনেকসময়ই তাদের এই বোধটাও কাজ করে না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে করা ’বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় শ্রমিকদের অধিকার’ বিষয়ক একটি গবেষণা থেকে এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কারখানার ভেতরে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন কিনা জানতে চাওয়া হলে, শ্রমিকরা না-সূচক জবাব দিয়েছিল। কিন্তু তাদের যখন কাজের পরিবেশ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হয় এবং জানতে চাওয়া হয় যে প্রোডাকশন ম্যানেজার (পিএম) ও সুপারভাইজার এর আচরণ কেমন, তখন তারা যৌন হয়রানি ও সহিংসতার নানা অভিযোগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে কর্মচারিদের প্রতি পিএম ও সুপারভাইজারদের আচরণ খুব খারাপ। যেকোন ছোটখাট কারণেই অত্যন্ত বাজে গালাগালি করা হয়। কাজে ভুল হলে বা দেরি হলে এমন গালি দেয়া হয়, যা কর্মীরা মুখে উচ্চারণ করতেও রাজি হয়নি। তবে গার্মেন্টসকর্মীরা সাধারণত এই আচরণকে যৌন হয়রানি বলে মনে করেন না । তারা মনে করেন শরীরে হাত দেয়া ও ধর্ষণ করাটাই যৌন হয়রানি ও সহিংসতা।

খবরটি দেখে আমার মনে হয়ে গেল বহুবছর আগে ফাতেমাতো ঠিক একই কথা বলেছিল। এরপর অনেকেই নানা সময় এধরণের অভিযোগ করেছে। নানা ফোরামে আলোচনায় এসেছে এই প্রসঙ্গ। যার ফলে মহামান্য আপিল বিভাগ প্রদত্ত কর্মস্থলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও সরকার ও গার্মেন্টস মালিক কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তা পালনে কোন উদ্যোগ ও তৎপরতা না থাকায় পোশাক শিল্প কারখানায় যৌন হয়রানি ও ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
গবেষণায় আরো বেড়িয়ে এসেছে যে পোশাক শিল্প খাতে এত বেশি হারে অসাম্য ও কর্তত্ববাদী সম্পর্ক বিরাজমান, যা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং সার্বিক কল্যাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নারী শ্রমিকদের অবস্থা এতটাই নাজুক যে তারা অব্যাহতভাবে যৌন হয়রানি-শোষণ ও জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হওয়া সত্ত্বেও চাকরি হারানোর এবং পারষ্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হওয়ার ভয়ে কোন অভিযোগ করেনা। শুধু হয়রানি নয়, মধ্য স্তরের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শ্রমিকরা কর্পোরেল শাস্তির মুখে পড়ে, এমনকি বয়স্করা পর্যন্ত এই শাস্তির হাত থেকে রক্ষা পায়না।

বিজ্ঞাপন

অথচ পোষাক শিল্প কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় অনেক বেশি। আমরা বড় মুখ করে বলে থাকি যে, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি এই তৈরি পোষাক শিল্প। আর সেখানে অর্থনীতির চাকা যারা ঘুরাচ্ছেন, তারা নারী শ্রমিক। কিন্তু গবেষণায় ফুটে উঠেছে সেই ইন্ডাস্ট্রিতে নারীর অবস্থান কতটা নাজুক। সেখানে নারীকে কতটা অবমাননার শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ১৫/১৬ বছর আগেও যেমন ছিল, এখনও তাই। পোষাক শিল্পের ব্যবসা ফুলে ফেপে উঠেছে, দেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, মালিকদের লাভের কোন শেষ নাই। কিন্তু শ্রমিকের বিশেষ করে নারী শ্রমিকের অবস্থা কেমন, কিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তারা, এই খোঁজ কে রাখে?

কাজের প্রয়োজনে লাখ লাখ নারী পোষাক শিল্প কারখানায় চাকরি নিচ্ছে। এরা যে খুব আরাম-আয়েশে জীবন কাটাচ্ছে, তা নয়। তাদের সঞ্চয়ও যে খুব একটা থাকছে তাও নয়। তবে হ্যাঁ একটা টাকা আয় হচ্ছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে, নিজের খরচ নিজে বয়ে বেড়াতে পারছে, ঘর থেকে বাইরের জগতে পা রাখতে পারছে। এই শিল্পে কর্মরত আছিয়া, ফরিদা এবং মাজেদা আমাকে বলেছিল। “আপা শুধু বেতনের জন্য না, আমরা এখানে কাজ করতে আসছি, কারণ আমাদের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি হয়। বাসা বাড়িতে কাজ করলেও আমরা টাকা পাই কিন্তু সেখানে আমাদের কোন পরিচয় বা আইডি কার্ড থাকেনা। সবাই বলে কাজের মেয়ে। কিন্তু এখানে আমরা শ্রমিক হিসাবে কাজ করি। কাজের পর স্বাধীন জীবন কাটাই।” এই একই কথা বলেছিল ফাতেমাও। কিন্তু পরবর্তীতে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে ফাতেমা কাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। বাকিদের কথা আমি আর জানতে পারিনি।

জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী ভ’মিকা রাখার পরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই তৈরি পোশাক খাত জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খুবই সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে নিয়োগের ক্ষেত্রে চুক্তিপত্রের অভাব, দীর্ঘ কর্মঘন্টা, অতিরিক্ত ওভারটাইম, দেরিতে বেতন ভাতা, মানসম্মত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এর সংবাদ বারবার বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প কারখানার সার্বিক কাজের পরিবেশ, শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা, অধিকারহীনতা ও সহিংসতা খতিয়ে দেখাই এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। ঢাকা, চট্রগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকদের উপর এই জরিপ চালানো হয়েছিল। এদের মধ্যে শতকরা ৮১ জন নারী ও ১৯ জন পুরুষ।

জরিপে দেখা যায় শতকরা ৭২.৭ জন শ্রমিকের চাকরির কোন চুক্তিনামা নেই। বাকি শতকরা ২৭.৩ জন শ্রমিকের চুক্তিপত্র আছে। অথচ পরিচয়পত্রের ক্ষেত্রে দেখা গেছে শতকরা ৭২.৫ জনেরই পরিচয়পত্র আছে এবং ২৭.৫ জনের নেই। শতকরা ৯৭.৭০ ভাগ কর্মী মাসভিত্তিক বেতন পেলেও, মাত্র ৪২.৯৩ শতাংশ মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বেতন পায়। ২৯.৭০ শতাংশের বেতন কাটা হয় নানা অজুহাতে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে শ্রমিকরা জানতেও পারেনা কেন বা কিভাবে তাদের বেতন কাটা হচ্ছে। গবেষণায় ঢাকা ও গাজীপুরের তুলনায় চট্রগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের অবস্থা কিছুটা ভাল বলে দেখা গেছে।

দেখা গেছে বেশ ভাল সংখ্যক শ্রমিক সরকারি দল যে তাদের কারখানা পরিদর্শন করবে বা করতে হবে, সে ব্যাপারে সচেতন।
এই সংখ্যা ঢাকা গাজীপুরে জানে ৭২.৯০ শতাংশ ও চট্রগ্রাম – নারায়ণগঞ্জে জানে ৭৭.১০ শতাংশ । ঢাকা-গাজীপুরে ৩৫.৭০ শতাংশ শ্রমিক সরকারের পক্ষ থেকে কারখানা পরিদর্শন করতে দেখলেও শতকরা ৬০.৬০ জন বলেছেন তারা কখনই সরকারি কোন টিমকে দেখেনি যে কারখানা পরিদর্শন করছে। নারায়ণগঞ্জ-চট্রগ্রামে এই চিত্র ঠিক বিপরীত। কিন্তু ঢাকা-গাজীপুরের শতকরা ৭২.২০ ভাগ শ্রমিককে কখনই ইন্টারভিউ করা হয়নি কোন সরকারি টিমের পক্ষ থেকে। আর চট্রগ্রাম-নারায়নগঞ্জে এই হার শতকরা ৮১.২০। একটি বিষয় এখানে পরিস্কার যে যেহেতু এই শিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি, তাই পক্ষান্তরে নারীরাই বেশি সবধরণের শোষণের শিকার হচ্ছে।

যাদের কাঁধে ভর দিয়ে তৈরি পোষাক শিল্প কারখানা দাঁড়িয়ে আছে, সেই সিংহভাগ নারী শ্রমিকের উপর যৌন হয়রানিমূলক আচার-আচরণ চলছে বছরের পর বছর ধরে। কেউ প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা। অপরাধীদের বিচার হচ্ছেনা। এই অত্যাচারের মাত্রা এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেয়েছে যে নির্যাতিত নারীও বুঝতে পারছেনা যে তারা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে।
বাহ কি চমৎকার! নারীর এবং তার শ্রমের লাগাতার অমর্যাদা হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে সফল ও অর্থকরী বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে, কিন্তু দেখার কেউ নেই!

সারাবাংলা/এমএম

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন