বিজ্ঞাপন

পদ্মা সেতুর আদলে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের প্রস্তাব

July 6, 2022 | 3:26 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: পদ্মা সেতুর আদলে কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের প্রাথমিক নকশা তৈরি করেছে কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, সেতুর ওপরে থাকবে দুই লেইনের সড়ক এবং নিচে থাকবে দুই লেইনের রেললাইন। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর বিদ্যমান কালুরঘাট সেতু থেকে ৭০ মিটার উজানে অর্থাৎ উত্তরে নতুন সেতুটি নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা যা আগে প্রস্তাবিত সেতুর ব্যয়ের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি।

বিজ্ঞাপন

সম্ভাব্য দাতা সংস্থা কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠান ইওসিন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন বা দোহা প্রাথমিক সমীক্ষা শেষে সেতু নির্মাণের স্থান, নকশা, ব্যয় ও নির্মাণকাল নিয়ে প্রাথমিক প্রস্তাবনা বুধবার (০৬ জুলাই) রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেছে।

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে কাজ শুরুর সময় থেকে চার বছর। আর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একনেকে অনুমোদন, দরপত্রসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে তারা সেতুর কাজ শুরু করতে পারবে। সেক্ষেত্রে সেতুটি নির্মাণ শেষ হতে বর্তমান সময় থেকে পাঁচ বছর অর্থাৎ ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষীত কালুরঘাট সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়ায় গতি ফিরেছে বলে মনে করছেন সেতু এলাকা অর্থাৎ চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য মোছলেন উদ্দিন আহমেদ।

প্রাথমিক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সম্মেলন কক্ষে বুধবার সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন ও কালুরঘাট সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত ফোকাল পারসন পূর্ব রেলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. গোলাম মোস্তফাসহ রেলের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রতিনিধি ছিলেন। সমীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান দোহা’র কর্মকর্তারা পাওয়ার পয়েন্টে সেতুর প্রস্তাবিত নকশা উপস্থাপন করেন।

বিজ্ঞাপন

সভা শেষে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী প্রস্তাবিত নকশায় সেতুর মোট দৈর্ঘ্য হবে ৭৮০ মিটার। এর মধ্যে নদীর বাইরে স্থলপথে থাকবে ৫ দশমিক ৬২ মিটার। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য হবে ১০০ মিটার। মোট পিলার থাকবে ৮টি। সেতুর উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার। এর ওপরের ডেকে থাকবে সড়ক এবং নিচের ডেকে রেললাইন। উভয়ই হবে দ্বিমুখী অর্থাৎ দুই লেইনের। সড়কে হেঁটে পারাপারের জন্য দুইপাশে আলাদা লেন থাকবে।

সেতুর জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) সহজ শর্তে পুরো টাকা বাংলাদেশ সরকারকে ঋণ হিসেবে দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফোকাল পারসন রেলওয়ের কর্মকর্তা মো. গোলাম মোস্তফা।

বিজ্ঞাপন

তিনি সারাবাংলাকে জানান, নদীপথে সেতুর ওপরের অংশ পার হয়ে স্থলভাগে সড়ক হবে অর্ধবৃত্তাকারে। এর এক প্রান্ত থাকবে চট্টগ্রাম নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথার অদূরে জানে আলী হাট রেলস্টেশন পার হয়ে মূল সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত। আরেক প্রান্ত থাকবে বোয়ালখালী অংশে বিদ্যমান কালুরঘাট সেতুর সংযোগ সড়কের সঙ্গে, তবে বর্তমান সংযোগ থেকে কিছুটা দূরে। আর ডবল রেললাইনের একাংশ শুরু হবে জানে আলী হাট থেকে, এর অপর অংশ থাকবে বোয়ালখালী উপজেলার গোমদণ্ডী রেলস্টেশনে।

মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সমীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান আমাদের জানিয়েছে, আগস্টে তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর টেন্ডার হবে। নির্মাণকাল প্রায় চার বছর আমাদের বলা হয়েছে। আমাদের টেন্ডার শেষ করতে ছয় থেকে আটমাস সময় লাগবে। তারপর ইডিসিএফ ফান্ড দেবে। ফান্ড দিলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। আগামী বছর আমরা কাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। তবে সুনির্দিষ্ট সময় এখন বলা যাবে না। সব ঠিক থাকলে সেতু পুরোপুরি নির্মাণ শেষ হতে আরও প্রায় পাঁচ বছর লাগবে।’

বিজ্ঞাপন

সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাটে বিদ্যমান সেতুটি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টের সৈন্য পরিচালনা করার জন্য কর্ণফুলী নদীতে ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৩০ সালে ব্রুনিক অ্যান্ড কোম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স নামে একটি সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ব্রিজটি নির্মাণ করে। মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য ৭০০ গজ লম্বা সেতুটি ১৯৩০ সালের ৪ জুন উদ্বোধন করা হয়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুনরায় বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধে মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। দেশ বিভাগের পর ডেক তুলে ফেলা হয়।

১৯৫৮ সালে সব রকম যানবাহন চলাচলের যোগ্য করে ব্রিজটির বর্তমান রূপ দেওয়া হয়। বৃটিশ আমলে নির্মিত ব্রিজটির রয়েছে ২টি এব্যাটমেট, ৬টি ব্রিক পিলার, ১২টি স্টীল পিলার ও ১৯টি স্প্যান। জরাজীর্ণ একমুখী সেতুটিতে ট্রেনের পাশাপাশি যানবাহনও চলে। বোয়ালখালী-পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের একাংশের নগরের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই কালুরঘাট সেতু। একমুখী সেতুর একপাশে গাড়ি উঠলে আরেকপাশ বন্ধ থাকে। ফলে দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি চলছে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। এছাড়া লক্করঝক্কর সেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের ঝুঁকি তো আছেই।

১৯৯১ সাল থেকে সংসদ নির্বাচনে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের বিষয়টি রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে প্রার্থীদের প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতিতে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালুরঘাটে রেলওয়ে সেতুর পাশে রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের জন্য দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। কিন্তু সেসময় পাঁচ বছরে তারা এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়নি।

২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। প্রতিশ্রুতি ছিল, কালুরঘাটে সেতু নির্মাণ করা হবে। সেতুর দুই পাড় নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন বোয়ালখালী-চান্দগাঁও থেকে নির্বাচনে জিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছিলেন বিএনপি নেতা এম মোরশেদ খান। এলাকার মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে কালুরঘাটের বদলে আরও দক্ষিণে গিয়ে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু যা ‘শাহ আমানত সেতু’ নামেও পরিচিত, সেটি নির্মাণ করে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেতুর দাবি আরও জোরালো হয়। ২০১৪ সালে আন্দোলন শুরু করে ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’। দফায় দফায় প্রতিশ্রুতি, বিভিন্ন আশ্বাসের পরও সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সাবেক সাংসদ মঈনউদ্দিন খান বাদল সংসদে জোরালোভাবে দাবি তোলেন। এমনকি সেতু নির্মাণ না করলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি মারা যান।

২০২০ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। নির্বাচিত হওয়ার এক বছরের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, রেল মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক দৌঁড়ঝাপের পরও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি ব্যর্থ হন।

সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার কারণ বুধবার সভা শেষে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সাংসদ মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘২০১০ সালে কর্ণফুলীর তৃতীয় সেতু উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন কালুরঘাটে নতুন একটি সেতু নির্মাণ করে দেবেন, একসঙ্গে গাড়ি ও ট্রেন চলতে পারবে এমন সেতু নির্মাণ করা হবে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেতু নির্মাণের বিষয়টি একনেকের সভায় উঠেও ফেরত এসেছিল। তখন নির্মাণব্যয়ও অনেক কম ছিল। কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, দুইটা ব্রিজ করার জন্য। একটা রেল ব্রিজ, আরেকটা রোড ব্রিজ। এভাবে ডিজাইন হয়। কিন্তু সেটা যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে নেওয়া হলো, তিনি বললেন আমি তো আলাদা সেতুর কথা বলিনি। একটাই ব্রিজ হবে, এতে রেলও থাকবে, রোডও থাকবে।’

‘পরে সেতুটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্পের তালিকায় এক নম্বরে নেওয়া হয়। আমি রেল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, প্রধানমন্ত্রীর লেভেলে বারবার কথা বলি। অবশেষে নতুন করে ডিজাইন করার জন্য টেন্ডার হয়। ভাগ্যক্রমে আগে যারা ডিজাইন করেছিল তারাই কাজ পেয়েছে। আগে ছয় মাসের জায়গায় দুই বছর লেগেছিল ডিজাইন করতে। এবার কিন্তু খুব সহসাই ডিজাইন হয়ে গেছে।’

তবে নকশায় কিছুটা সংশোধনের প্রস্তাব দেন সাংসদ। তিনি বলেন, ‘দুইপাশে গাড়ি ওঠানামার জায়গার বিষয়ে একটা প্রস্তাব দিয়েছি। সেতু যেখানে নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অনেক জায়গা আছে। সেসব ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হয়। এ জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি যতদূর সম্ভব কম অধিগ্রহণ করে রেলওয়ের জায়গা ব্যবহার করে সেতুটা করার জন্য সুপারিশমালা আমরা দিয়েছি। এজন্য আগামীতে হয়ত আরেকটা বৈঠক করতে হবে।’

প্রস্তাবিত নকশায় সেতুর নির্মাণব্যয় আগের চেয়ে পাঁচগুণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ফোকাল পারসন মো. গোলাম মোস্তফা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগের নকশার সঙ্গে এখনকার নকশা মেলালে হবে না। আগে ছিল এক ডেকে রেল ও সড়ক সেতু। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে পদ্মা সেতুর আদলে দ্বিতল সেতু। আগের নকশায় সেতুর নেভিগেশন হাইট ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬ মিটার। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ দশমিক ২ মিটার। এছাড়া সেতু করা হবে বিদ্যমান সেতুর ৭০ মিটার উজানে। তখন ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। নকশায় যেহেতু ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় বেড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।’

সারাবাংলা/আরডি/এনএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন