বিজ্ঞাপন

সেদিন ছিল ১০ নভেম্বর

November 10, 2022 | 11:12 am

রহমান মুস্তাফিজ

কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা ছিল। ‘চল চল ঢাকা চল’ কর্মসূচি। মিছিল, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিলি… মশাল মিছিলেও থাকলাম। হঠাৎ মাথায় বজ্রপাত। তারিখটা ছিল ৯ নভেম্বর ১৯৮৭, আব্বা ডেকে জানিয়ে দিলেন পরদিন বাসার বাইরে যাওয়া চলবে না। সারাদিন বাসায় থাকতে হবে। আম্মার ওপর হুকুম জারি হলো আমার দিকে নজর রাখতে। বোনদেরও জানিয়ে দেয়া হলো আমাকে যেন চোখে চোখে রাখেন।

বিজ্ঞাপন

হাজার হাজার মানুষকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে আসার আহ্বান জানিয়ে শেষে কিনা নিজেই যেতে পারবো না!

রাতভর ভাবলাম। উপায়ও বের হলো। পরদিন সকালে লুকিয়ে লুঙ্গির নিচে প্যান্ট পরলাম। হালকা শীত বলে হাফ শার্টের পরিবর্তে খদ্দেরের পাঞ্জাবি গায়ে দেয়াটা কারো নজর কাড়লো না। খাদিমের সাদা কেডস জোড়া লুঙ্গির নিচে প্যান্টের দুই পকেটে ঢুকিয়ে নিলাম।

বিজ্ঞাপন

এরপর বাসায় হাঁটাহাটি করছি, বারান্দায় যাচ্ছি। দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় আম্মা জিজ্ঞেস করলেন কই যাস? বললাম, সিরাজ ভাইয়ের দোকানে যাচ্ছি (বাসার সামনে পান, সিগারেট, বিস্কিট, চানাচুরের দোকান; কারকুন বাড়ি লেন মসজিদের গেটে)।

আস্তে আস্তে বাসা থেকে বের হলাম। সিরাজ ভাইয়ের দোকানের সামনে কিছুক্ষণ থেকে আমাদের প্রেসে গেলাম। আব্বা প্রেসে ছিলেন। আমাকে বাসায় ফিরতে বললেন। প্রেস থেকে বের হয়ে সামনে হাঁটাহাটি করতে করতে কলতাবাজারের পথ ধরলাম।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে হাতের বাঁয়ে মুদি দোকান। সেখানে লুঙ্গি আর সেণ্ডেল রেখে ধোলাইখালের শর্টকাট পথ ধরি। নারিন্দা দিয়ে ওয়ারি, তারপর জয়কালি মন্দির এলাকায় হাজির হলাম। সকাল তখন ৮টা বা সাড়ে ৮টা হবে। ততোক্ষণে আরও ২/১ জন এসেছে। আমি সে সময় কবি নজরুল সরকারি কলেজ শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। কলেজের ছেলেরাও আসতে শুরু করলেন। একে একে এলেন মাধব দা (প্রয়াত), বজলু ভাই (প্রয়াত), শামসুদ্দিন ভাই (প্রয়াত), ইলিয়াস মল্লিক ভাই (প্রয়াত), মুসলেহ ভাই, জাহাঙ্গীর ভাই, কৃষ্ণা দি (নারী মুক্তিযোদ্ধা কৃষ্ণা রহমান), পি.কে দা-সহ অন্যরা। বন্ধুদের মধ্যে আলাউদ্দিন মল্লিক (উন্নয়ন কর্মি), সৈয়দ হাফিজুর রহমান (বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক), বিকাশ সাহা (সিপিবি নেতা), সৈয়দ মামুন মাহবুব (আইনজীবী নেতা), সত্যজিৎ সূত্রধর (ব্যবসায়ী), আশীষ সাহা (ব্যবসায়ী), বিমল মজুমদার (চাকরিজীবী), খালেদুর রহমান কমল (ব্যবসায়ী)-সহ অন্যরা। সব মিলিয়ে সংখ্যা তখন দুই-আড়াইশ’। এটা আমাদের সূত্রাপুর থানার সংগঠিত জমায়েত। পথে আরও ২০/৩০ জন মিছিলে যোগ দিবেন।

মিছিল নিয়ে রওনা হলাম। সেই উত্তাল দিনগুলোতে মিছিলের স্লোগানে সাধারণত আমি, মামুন আর বিকাশ লিড দেই। পথে পথে বাধা ডিঙ্গিয়ে পৌঁছে যাই গন্তব্যে। সেখানেই দেখা পাই নূর হোসেনের। তখন নাম জানতাম না। বুকে পিঠে অক্সাইড দিয়ে লিখে এসেছেন ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। গুলিস্তান থেকে পল্টন, পাশাপাশি অনেক বার ছিলাম মিছিলে।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও ১৫ দলের শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা জোটের নেতাদের নিয়ে মিছিলে এলেন। মিছিল যেন তখন মহাসাগরকেও হার মানিয়েছে। সেদিনের সেই মিছিলে কতো লোক হয়েছিল- ৫০ লাখ, ৮০ লাখ, ১ কোটি, নাকি তারচেয়েও বেশি? জানি না। সব প্রশ্নের উত্তর সব সময় খুঁজতে নেই।

শেখ হাসিনাকে বহন করা গাড়ি জিরো পয়েন্টের দিকে যাচ্ছে। তখন উল্টো দিক থেকে এলো ঘাতকবাহী লরি। তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগুলো। ৮ থেকে ১০ ফুট দূরে বুকে পিঠে লেখা ছেলেটাকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখলাম। আশপাশে আরও অনেকের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারি হয়ে উঠতে শুরু করলো।

বিজ্ঞাপন

রাইফেলের গুলি, আর্তচিৎকার, আর চিৎকার করে পাশে থাকা বন্ধুকে ডেকে নিশ্চিত হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা অক্ষত আছে কিনা জানার… এমনটাই গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, পল্টন এলাকার।

নূর হোসেনকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখে আত্মরক্ষার সহজাত ইচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। ফুটপাথের পাশে প্রায় ৬ ফুট উঁচু গ্রিল। গ্রিলের ওপাড়ে আউটার স্টেডিয়াম (এখন মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম)। কিভাবে যেন মুহূর্তের মধ্যেই টপকে গেলাম গ্রিলটা, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না।

আউটার স্টেডিয়ামের করিডোরে তখন মানব চেইন তৈরি হয়েছে অনেকগুলো। পিলারের সারির পিছনে তৈরি হয়েছে এসব চেইন। একজন আরেক জনের কোমর ধরে, মাথা নিচু করে পাশে সরে যাওয়া আর সুযোগ পেলে পরের পিলারের দিকে দৌড়ে যাওয়া। এক সময় এই মানব চেইনকে লক্ষ্য করে শুরু হয় গুলি বর্ষণ।

এভাবে এক পিলার থেকে আরেক পিলারে যাচ্ছি। হঠাৎ পিছন থেকে একজন পিঠে ধাক্কা মেরে আমাকে ফেলে দিলেন। পড়ে গিয়ে তাকালাম তার দিকে। বয়েস ষাট হবে। গায়ের রঙ কালো। সবচুল পাকা। ক্লিন শেভড। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, একই রঙের ঢোলা পায়জামা।

যে হাতে আমাকে ধাক্কা মেরেছেন সেটি তখনও সামনে বাড়ানো। হাতের তালুতে ছোট একটা গর্ত। গর্তের চার পাশে বৃত্তাকারে লাল হয়ে উঠছে। বুঝলাম, ধাক্কা খেয়ে পড়েছি আমি, আর গুলিটা এসে বিঁধেছে ভদ্রলোকের হাতে। ক্ষণের ব্যাপার মাত্র। গুলিটা আমার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে যেত যদি তিনি আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে না দিতেন।
তিনি চিৎকার করে বললেন, ক্রল করে সামনে যাও, এখানে দাড়ায়োনা।

আমি তখন কাঁপছি। রাস্তায় অসংখ্য মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তখন বেঁচে গেছি। আরেক দফা বাঁচলাম অচেনা ভদ্রলোকের কারণে। কিছুদূর গিয়ে আউটার স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলাম। তালা দেয়া। জেলখানার গরাদের মতো গেট। বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে পাড় হলাম তা। লাফিয়ে নিচে নামলাম। হাত-পা, সব মনুষ্য বিষ্ঠায় মাখামাখি। ওসব কেয়ার করার সময় নেই তখন। মাঠের ভিতর দিয়ে অনেকের সাথে ছুটলাম। বেরিয়ে এলাম মোহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রায় ১২ ফুট দেয়াল ডিঙিয়ে। সাহায্য পেলাম একটা নারকেল গাছের।

দৈনিক বাংলার মোড়ে এসে বেকায়দায় পড়লাম। পিছনে ফেরার উপায় নেই। ওদিকেও গুলি শুরু হয়েছে। সামনে দৈনিক বাংলা মোড় পাহারা দিচ্ছে পুলিশ, আরেকটু সামনে যুব সংহতির অফিস ঘিরে জাতীয় পার্টির সশস্ত্র কর্মি বাহিনী। আবারও ঝুঁকি নিলাম। আচমকা দৌড়ে রাস্তা পেরুলাম। খানিকটা এগিয়ে ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের অফিসের পাশ ঘেষে পিছনের গলিতে। একটা বাউণ্ডারি দেয়া জায়গায় আশ্রয় নিলাম। ২/৩ মিনিটের মধ্যেই টের পেলাম ওটা সাপের চেয়েও ভয়ংকর জামাতিদের অফিস। দ্রুত বের হলাম, নিরাপত্তার স্বার্থেই।

এরপর পুরানা পল্টনের গলিতে ঢুকতেই আবার পুলিশের ধাওয়া। ছুটলাম। আশ্রয় নিলাম নোয়াখালী হোটেলের সামনে ডাস্টবিনের নিচে দিয়ে বয়ে যাওয়া ড্রেনে। মাথায় ডাস্টবিনের ময়লা পানি পড়ছে, হাঁটু পর্যন্ত ড্রেনের নোংরা পানি, সাথে নয়া পল্টন বস্তির (এখন সেখানে কালভার্ট রোড) কাচা পায়খানার বর্জ্য। পুলিশের বুটের শব্দ মিলিয়ে যেতে ডাস্টবিনের নিচ থেকে আমরা ৩/৪ জন বেরিয়ে এলাম।

গলির ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম জোনাকি হলের সামনে। ৮/১০ মিনিট অপেক্ষা করে রাস্তা পেরিয়ে আবার গলিতে। বাসায় ফেরার পথ নেই। গেলাম শাহজাহানপুর। অনেক আগেই পাঞ্জাবি ছিড়েছে, এক পাটি কেডস তলা খুলে গেছে লোকজনের পায়ের চাপে। আরেক পাটি কখন পা থেকে খুলেছে টের পাইনি। ওই অবস্থায় শাহজাহানপুরে গিয়ে এক ভাইয়ের কাছ থেকে তার পুরনো একজোড়া সেণ্ডেল নিলাম। মতিঝিল ঘুরে যখন বাসায় ফিরলাম ততোক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে।

বাসায় ঢুকলাম ভয়ে ভয়ে। কপালে খারাবি আছে নির্ঘাত। কিন্তু না, সবাই উল্টো আমাকে নিয়েই চিন্তিত। শুধু আব্বার মুখ গম্ভীর। কিছুই বললেন না। বলার কিছু ছিলও না। বলবেন কি করে, আমার শরীরে তারইতো রক্ত। রাজনীতিতে এসেছিলাম রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে। জাতির এমন দুর্দিনে আমি ঘরে বসে থাকলেই বরং আব্বা হয়তো ব্যথিত হতেন।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা; প্রধান বার্তা সম্পাদক, সারাবাংলা ডট নেট

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন