বিজ্ঞাপন

গৃহহীন শাহানা’রা এখন স্বাবলম্বী

March 21, 2023 | 7:54 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

গোয়াইনঘাট (সিলেট) থেকে: আশ্রয়ণের ঘর পেয়ে আমরা এখন সুখে শান্তিতে বাস করছি। স্বামী যা আয় করেন তার অর্ধেক সঞ্চয় করতে পারছি। দুই বছরের মাথায় এক গরু থেকে এখন আমাদের ছয়টি গরু হয়েছে। ছাগলও রয়েছে একটি। দুই ছেলেই স্কুলে পড়াচ্ছি। এক সময়ের গৃহহীন আমরা এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে৷ কথাগুলো এমনভাবেই বলছিলেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বিন্নাকান্দি গ্রামের শাহানা বেগম। এক সময় ঝুপড়ি কিংবা অন্যের বাসায় থাকা গৃহহীনদের আরও অনেকেই জানালেন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। কেউবা এরইমধ্যে সঞ্চয়ী হয়েছেন, কেউবা সঞ্চয় জমিয়ে কিনেছেন মোটরসসাইকেলও।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২১ মার্চ) সকালে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে এক সময়ের গৃহহীনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। গৃহহীনদের সরকার সারাদেশে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ঘর করে দিচ্ছে। বেশ কয়েক ধাপে এরইমধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এখনও ২২ হাজারের বেশি ঘর নির্মাণাধীন রয়েছে।

এদিকে, আগামীকাল ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ জেলার ৩ টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের গৃহ হস্তান্তর করবেন। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের নওয়াঁগাও আশ্রয়ণ প্রকল্প ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বানারীপাড়া পৌরসভায় উত্তরপাড় আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।

বিজ্ঞাপন

গৃহহীন শাহানা’রা এখন স্বাবলম্বী

প্রকল্পের অধীনে ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২ শতক জমিসহ সেমিপাকা একক ঘর পাচ্ছেন গৃহহীন মানুষেরা। প্রকল্পের আওয়াতায় প্রথম পর্যায়ে ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ৬৩ হাজার ৯৯৯টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে একই বছরের ২০ জুন ৫৩ হাজার ৩৩০ টি, তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম ধাপে গত বছরের ২৬ এপ্রিল ৩২ হাজার ৯০৪ টি, দ্বিতীয় ধাপে ২১ জুলাই ২৬ হাজার ২২৯ টি গৃহ হস্তান্তর করেন।

বিজ্ঞাপন

তথ্যমতে, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ে হস্তান্তরিত গৃহের সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৮২৭ টি। চতুর্থ পর্যায়ে অবশিষ্ট নির্মাণাধীন গৃহের সংখ্যা ২২ হাজার ৬ টি। চতুর্থ পর্যায় পর্যন্ত বরাদ্দকৃত গৃহের সংখ্যা ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৩১ টি। চতুর্থ পর্যায়ে চরাঞ্চলে বরাদ্দকৃত বিশেষ ডিজাইনের গৃহের সংখ্যা ১ হাজার ৩৭৩ টি ও পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ ডিজাইনের মাচাং ঘর ৬৩৪ টি।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বিন্নাকান্দি গ্রামের শরিফ উদ্দিন দুই বছর আগে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন। আগে খাস জমিতে মাটির ঘর ছিলো। তার স্ত্রী শাহানা বেগম (৩৫) সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে মাটির ঘর ছিল। কোনো রকম থাকা যেত। ঘর পাওয়ায় আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। দুই বছর আগে আমাদের একটি গরু ছিল। এখন ছয়টি গরু আছে। একটি ছাগল আছে।’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন: আরও ৩৯ হাজার গৃহহীন ঘর পাচ্ছেন, চোখেমুখে ইদের আনন্দ

স্বামী মিশুক গাড়ি চালায় জানিয়ে শাহানা বেগম আরও বলেন, ‘আমার স্বামী দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করে। সংসার চালিয়ে দিনে ২০০ টাকার মতো থাকে। তা দিয়েই সঞ্চয় করে গরু ছাগল কিনেছি।’

বিজ্ঞাপন

তিন ছেলের জননী শাহানা আরও বলেন, ‘আমাদের তিন ছেলে। বড় ছেলে আশরাফ উদ্দিন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। মেজো ছেলে রিফাত উদ্দিন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। আর ছোট ছেলের বয়স ১৫ দিন। সবমিলিয়ে আমরা ভালোই আছি।’

একই উপজেলার একই গ্রামে এক বছর আগে আশ্রয়ণের ঘর পেয়েছেন হোসেন আহমেদ। তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুর। বাসাবাড়িতে কাজ করে। বাড়িতে হাঁসমুরগি পালন করি। এক বছর আগে ঘর পেয়েছি। আগে এখানে ছোট একটা ঘর ছিল। ঝুপড়ির মতো। বৃষ্টি হলে ঘরে পানি পড়ত। খুব কষ্ট করছি। দুই বাচ্চা সিজারে হয়েছে। তখনকার কষ্ট বলে বোঝানো সম্ভব নয়। অসহায় দেখে সরকার ঘর দিয়েছে। আগে থেকেই খাস জায়গায় থাকতাম।’

গৃহহীন শাহানা’রা এখন স্বাবলম্বী

তিনি বলেন, ‘আগে বউ বাচ্চা রেখে স্বামী কাজে যেতে পারত না। এখন বউ বাচ্চা রেখে উনি কাজে যেতে পারে। এতে তিনি টেনশনমুক্ত হতেছেন। মেয়ে সামিয়া (১০) ও ছেলে তোফাজ্জল (৮) দুজনই মাদরাসায় পড়ে। আগের চেয়ে এখন আমরা অনেক ভালো আছি। প্রধানমন্ত্রী ঘর দিয়েছেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চির ঋণী।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘এখনও গরু ছাগল কিনতে পারিনি। স্বামী মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করে। সে টাকা দিয়ে পরিবার চলে ও কোনোরকমে বাচ্চাদের লেখাপড়া করাই।’

একই গ্রামে ঘর পেয়েছেন রুকিয়া বেগম। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্বামী আবদুল্লাহ পাথরের কাজ করে। আগে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকতাম। বাসা ভাড়া ছিলো ৫০০ টাকা। কাজ টাজ করে বাসা ভাড়া দিতাম। কখনও ভাবিনি নিজের বাড়ি হবে। বাড়ি পেয়ে আমরা খুব খুশি।’

তিন সন্তানের জননী রুকিয়া আরও বলেন, ‘হাঁস মুরগি আছে। সেগুলো পালন করি। স্বামী যে টাকা পায় তা দিয়েই সংসার চালিয়ে নিচ্ছি। ছেলে মেয়ে তিনজন। ছেলে-মেয়েকে মাস্টার বানানোর ইচ্ছে আছে। নতুনবা তাদের সরকারি চাকরি করাতে চাই।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা সঞ্চয় করে মোটরসাইকেল কিনেছি। স্বামী দিনে পাথরের কাজ করে বাসায় ফিরে রাতে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালায়। এতে আমাদের ভালোই আয় হয়। এক বছরের মধ্যে আমরা টেলিভিশনও কিনেছি।’

সারাবাংলা/ইএইচটি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন