বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ, ভয়-আতঙ্কের এক কালরাতের কথা

March 25, 2021 | 8:48 pm

ফিচার ডেস্ক

অপারেশন সার্চলাইট, ২৫ শে মার্চ ১৯৭১। পৃথিবীর বুকে নৃশংসতম এক গণহত্যার নাম। বাঙালি যখন তার অধিকারকে আঁকড়ে ধরেছিল, বর্বর পাকিস্তানিরা তখনই বুঝতে পেরেছিল কোনোকিছু দিয়েই এই জাতিকে দমিয়ে রাখা যাবে না। তাই একাত্তরের সেই রাতে শুরু করে জঘন্যতম গণহত্যা। যা জন্ম দেয় মুক্তিযুদ্ধের। শুরু হয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। কবির ভাষায়,

বিজ্ঞাপন

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।

পূর্ব পাকিস্তানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা ও বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম দমন করার জন্য ২৫ মার্চের যে প্রস্তুতি নিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান, তা ছিল খুবই গোপনীয়। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা, বাঙালি সামরিক সেনাসহ কারও মাঝে যাতে সন্দেহ তৈরি না হয় সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিল তারা। তবে এই গণহত্যার বিপরীতে বাঙালিরা যে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলবে তা ভাবতে পারে নি শোষকরা। অস্ত্র-সস্ত্র আর ক্ষমতা দিয়ে তারা যে গণহত্যা শুরু করেছিলো তারই প্রতিবাদে বাঙালি ঘোষণা করে স্বাধীনতা। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ কালরাতের আগের প্রেক্ষাপট

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু হয়। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে তখন আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় বিধানসভার নির্বাচন মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করে দেওয়া হয়। মার্চের শুরু থেকেই পুরো বাংলা উত্তাল হয়ে ওঠে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেন,

বিজ্ঞাপন

‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

মার্চের শুরু থেকেই উত্তাল ছিলো বাংলার রাজপথ। ঢাকা তখন মিছিলের নগরী। এর মধ্যেই ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ১৬ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক হয়। দ্বিতীয় দফা বৈঠক হয় পরদিনই। সেখান থেকে বেরিয়ে মুজিব সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনা শেষ হয়ে যায় নি।

বিজ্ঞাপন

এরপর ১৯ মার্চ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ হয় গাজীপুরের জয়দেবপুরে। যার কারণে জয়দেবপুর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

২০ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জরুরী বৈঠক করেনতার সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল হামিদ খান, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল ওমরসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সেখানেই ২৫ মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুমোদন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এরপরদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমণ্ডির বাসভবনে সমবেত জনতার উদ্দেশে স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত  শান্তিপূর্ণ অহিংস অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। নীতির প্রশ্নে কোনই আপস নাই এবং আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত পরিস্কার।’ এদিন ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পঞ্চম দফা বৈঠক হয়। এদিন ভুট্টোর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়।

পরদিন, ২২ মার্চ ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ২৩ মার্চ সারাবাংলায় মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে পালিত হয় প্রতিরোধ দিবস হিসেবে।

এদিকে ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু আন্দোলনকারিদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের মধ্যে সমস্যার কোন সমাধান না হলে বাঙালি নিজেদের পথ বেছে নেবে। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোন ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’

এদিকে ২৩ থেকে ২৪ মার্চ বাংলার বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। নীলফামারীর সৈয়দপুর, রংপুর, মিরপুরে সাড়ে তিনশ মানুষ নিহত হন। আহত হয় বহু মানুষ।

পাকিস্তানি বাহিনীর গোপন পরিকল্পনা প্রস্তুতি

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে প্রায় প্রতিদিনই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনা হচ্ছিল ঢাকায়। ২৫ মার্চের আগে তা আরো বেড়ে যায়।

মার্চের ১৭ তারিখ অপারেশন পরিকল্পনার দায়িত্ব পান ১৪ তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা। পরদিনই জেনারেল রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি অপারেশনের পরিকল্পনা তৈরি করেন।

পরিকল্পনা হয় সারাদেশে একযোগে অপারেশন পরিচালনা করার। ঢাকাকে কেন্দ্রবিন্দু ধরে খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেটে আক্রমণাত্মক অপারেশন পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাদের গ্রেপ্তারের। অপারেশন সফল হওয়ার জন্য বাঙালি সৈন্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিতে বলা হয়।

সব প্রস্তুতি ছিলো অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে। এমনকি পাকিস্তানি ইউনিট কমান্ডারদের এমনভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়াও হয়েছিলো যাতে কারো মধ্যে কোন ধরনের সন্দেহ না হয়। অপারেশনের সফলতা নিশ্চিত ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে সামরিক বাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তাদের বদলি করে সেখানে পাকিস্তানি বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

আটকে রাখা হয় সাংবাদিক

২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের আগেই বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ত্যাগ করতে বলা হয়। হত্যা হত্যাযজ্ঞের সময় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৪৮ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয় ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিকদের। হোটেল থেকে বের হলেই গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। পরে তাদের তল্লাশি চালানো হয়। বাজেয়াপ্ত করা হয় নোটবই, ছবির ফিল্ম ও ফাইল।

ভয়াল সেই কালরাত

সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে পাকিস্তানিরা বাঙালি ধ্বংসযজ্ঞে নামে। বিশ্বের নৃশংসতম গণহত্যা শুরু হয় ২৫ মার্চের মধ্যরাতে। ভয়ংকর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী। হিংস্র শ্বাপদের মতো জলপাই রঙের ট্যাংকগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ-ইপিআর ব্যারাকের দিকে ধেয়ে যেতে থাকে।

বাংলা যখন ঘুমে আচ্ছন্ন তখনই পাকিস্তানিরা অতর্কিতে হামলা চালায়। হঠাৎ করেই যেনো ঢাকার আকাশে-বাতাস গর্জে ওঠে রাইফেল, মেশিনগান আর মর্টারের গুলিতে। হত্যাযজ্ঞ চলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে। সে রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা গণমাধ্যমও রেহাই পায়নি জল্লাদ ইয়াহিয়ার পরিকল্পনা থেকে। অগ্নিসংযোগ, মর্টার শেল ছুঁড়ে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ ও জাতীয় প্রেস ক্লাব ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

২৫ মার্চ রাতে কি নৃশংসতম হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে তার পরেরদিনের লাশের মিছিল দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়। তবে সেই ভয়াল রাতে কত বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে— এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার ভাষ্য, কেবল ২৫ মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় একলাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তারা যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়— ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।

পাকিস্তানিরা বর্বর গণহত্যা আর রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে বাংলাকে দখল করে শোষণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই নির্মম আক্রমণই বাঙালিকে আরো ক্রুদ্ধ করে তোলে আর স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। তাই তো কবি লিখেছেন…

আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি তখন তেরোশত নদী
গেয়ে ওঠে আমার সোনার বাংলা,
সহস্র পাখির কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনিত হতে থাকে;
আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, তখন সাতই মার্চ
জেগে ওঠে, শেখ মুজিব ঘোষণা করেন স্বাধীনতা

সারাবাংলা/এসএসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন