বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৭ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ জিলহজ, ১৪৪০ হিজরি

বিজ্ঞাপন

রোগ শোক উৎসব

আগস্ট ১১, ২০১৯ | ১০:০০ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

দুটি ঈদ, পহেলা বৈশাখ ও দুর্গাপুজা, বাংলাদেশের বাঙালির চারটি উৎসব। উৎসবের আতিশয্যে, রঙে, মজলিসে, দেদার খুশি-খুশি অমোঘ প্রবণতা। কিন্তু এবার একটু অন্যরকম। এবার শোকের মাসে এসেছে ঈদ। আর আছে ভয়। একটু না, বেশ খানিকটা ভয়। কারণ রাজধানী সহ দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক ডেঙ্গু আতংক।

উৎসবের আঁচ ভাল করে নিতে বরাবরই ঢাকায় থাকি। অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে থাকি। বিশেষ করে ঈদের সময়টায় পৃথিবীর সবচেয়ে অবাসযোগ্য ঢাকায় কিছুটা হলেও যন্ত্রণার বাইরে থাকা যায়। এই সময়টাতেই ঢাকাকে একটু একটু আপন করে নেয়া যায়। কারণ দুই ঈদে ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়। তবে এবার ডেঙ্গু আক্রমণে আটকে গিয়ে অনেকে ঢাকা ছাড়েননি, অনেকে আতংক নিয়েই গেছেন।

ডেঙ্গুর প্রকোপ রাজধানীতে বেশি, তবে ঢাকার বাইরেও বহু রোগী ডেঙ্গুতে সনাক্ত হয়েছে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে। প্রশ্ন হল ঈদুল আজহার সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেলে এই ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে কিনা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অধ্যাপক এম আবদুল্লাহ বলেছেন গ্রামে ভয় নেই, কারণ সেখানে এডিস মশা নেই। তবে শহর, সেটা ঢাকার বাইরের হলেও ভয় আছে। তবে জ্বর নিয়ে ঈদ করতে ঢাকার বাইরে না যাওয়াই ভাল। গ্রামাঞ্চলে জ্বরটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা না থাকলেও নিজেদের যথাযথ চিকিৎসার জন্য ডেঙ্গু আক্রান্তদের ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে না যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ আমাদের ভুগিয়েছে। কিন্তু এর মাঝেও একটা ইতিবাচক দিক আমি দেখছি। সামাজিকভাবে একটা নাড়া পড়েছে। প্রথম দিকে দক্ষিণের মেয়র অস্বীকার করলেও, পরে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে একটা আতংকজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা আমরা দেখছিলাম, তার স্থলে একটা সিরিয়াসনেস সবার ভেতরই এখন লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রচেষ্টাকে সবাই প্রশংসা করছে। সাধারণ মানুষও ছাদ বাগান, টবে বা কোন পাত্রে জমা জলে এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি নিয়ে সচেতনতা প্রদর্শন করছে। সিটি কর্পোরেশন নির্মানাধীন বহুতল ভবন, শহরের নানা স্থানে চলা উন্নয়ন কর্মকান্ড নিয়ে যতটা ঔদাসীন্য দেখিয়েছে এতদিন, এখন ততটাই সরব এসবে নজরদারী বাড়াতে।

এতদিন আমরা কেমন ছিলাম? দেখতাম কোথাও কোথাও মশা মারতে রাস্তায় কামান দাগছেন পৌরকর্মীরা। এখন শুনছি সেই ওষুধ কোন কাজে লাগেনি। আবার দোকান থেকে বাড়ির উঠোন, জমা পানিতে কিলবিল করছে মশার লার্ভা। আর এ কারণেই ডেঙ্গু জ্বরে কাবু হয়েছে ঢাকা। সচেতনতা ছাড়া এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। মশা মারতে হবে এবং সারাবছর শহরে ঘুরে সচেতনতার কথাই লোকজনকে বলতে হবে। এবার বোঝা গেল এটা কোন মৌসুমী কাজ নয়। বিদ্যালয়ে গিয়ে, কলেজে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু সচেতনতার কথা বোঝাতে হবে। বাড়ির বাচ্চারা বড়দের বিষয়টি বোঝালে সচেতনতার কাজ ভালভাবে হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তবে আসল কাজটা করতে হবে সিটি কর্পোরেশ আর পৌরসভাগুলোকে। মশা প্রতিরোধে সব রকম পদক্ষেপ নিতে হবে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে মশার লার্ভা পরিষ্কারের কাজটি করতেই হবে। আর মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রতিটি এলাকা নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে কঠোরতা দেখাতে হবে। বাড়ির মধ্যে জমা পানিতে, আবর্জনায় এডিস মশার লার্ভা দেখা গেলে যে মানুষেরই বিপদ সেটা মানুষকে বুঝতে হবে।

পরিচ্ছন্নতার সমীক্ষায় বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে শীর্ষ স্থান পেয়ে আসছে ঢাকা। নানা সমস্যায় পরিপূর্ণ ও বসবাসের অযোগ্য এই শহরে প্রতি দিন যে কত কষ্ট করে বসবাস করতে হচ্ছে তা কেবল সাধারণ মানুষই জানে। ঢাকা মানেই- বর্ষার সময় মেঘ দেখলে ভেসে যায়, সারা বছর খুড়াখুড়িতে রাস্তার কঙ্কাল বের হয়ে থাকে। অতিকায় খানাখন্দে ভরা এই শহরে দুর্ঘটনা নিয়মিত। রাস্তাঘাট থেকে পয়ঃপ্রণালী, পরিস্রুত পানীয় জল থেকে প্রশাসনিক কাঠামো সব বিষয়েই অভিযোগের অন্ত নেই। এ শহরের মৌলিক সমস্যাসমূহের সমাধান নিয়ে হতাশ মানুষ আর কথাই বলেনা।

এবারের ডেঙ্গুর আতংক একটা কথা মনে করিয়ে দিল যে, শহরের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে চরম উদাসীনতা ছিল তাদের দিক থেকে যাদের কাছে তা প্রত্যাশিত ছিল। এ ছাড়া রাজধানীতে বা শহরগুলোতে মশকবাহিত রোগের মোকাবিলায় কাঠামো দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে এবার। একটি সিটি কর্পোরেশনকে ভেঙ্গে দুটি করে সমন্বয় শুণ্য করে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে, এই কর্পোরেশনসহ পৌরসভাগুলো ভুগছে দুর্বলতর জনবল নিয়ে। তাই রোগের নিয়মিত নজরদারি-পরিদর্শনের প্রায় কিছুই হয় না। স্থানীয় সরকার বিভাগে অধীন এই পৌর সংস্থাগুলোর স্বাস্থ্য বিভাগ বলতে আসলে সেই অর্থে কিছু নেই।

এবারের শিক্ষা হয়তো সেটাই যে বিষয়টিতে নজর বাড়বে। তবুও কিছু কিন্তু থেকে যায়, আশংকা থেকে যায়। রোগ প্রতিরোধ, উন্নত পানীয় জল ও শৌচাগারের ব্যবস্থা, জঞ্জাল সাফ রাখা, দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো জনস্বাস্থ্যের কাজ সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার কাছে কোনদিন যখন জরুরি হয়ে উঠতে পারেনি, আগামীতে কি হবে?

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হারিয়েছিলাম আমরা। তাই আগস্ট শোকের মাস। কিন্তু শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে এখন উন্নয়ন স্পৃহা। আবার সেই মানুষের সামনেই ডেঙ্গু নামের মরণ রোগের আতংক। কিন্তু তবুও উৎসব আসে। উৎসব মানে একটু আমোদে থাকা, একটু ভাল , বহু প্রত্যাশিত ছুটিতে চুটিয়ে আনন্দ করা।
সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছো।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: প্রধান সম্পাদক, সারাবাংলা ও জিটিভি।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন