শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৮ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বিস্মৃতপ্রায় জগতজ্যোতি, রাষ্ট্র যাকে ভুলে গেছে নিদারুণ অবলীলায়!

নভেম্বর ১৬, ২০১৯ | ৪:৫৯ অপরাহ্ণ

রহমান রা’আদ

সেদিন জগতজ্যোতি দাস শ্যামার দলটি ছিলো ৪২ জনের। খালিয়াজুড়ির কল্যাণপুর থেকে কয়েকটি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটির মূল অপারেশন ছিলো আজমিরিগঞ্জ পেরিয়ে বাহুবল গিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন উড়িয়ে দেওয়া। যাবার পথে মুক্তিযোদ্ধা সুবল দাসের দলকে সাহায্য করার জন্য ঘুঙ্গিয়ার গাও, শাল্লায় পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে গুলি বিনিময় করে জ্যোতির দল। সেখান থেকে ভোরে রওয়ানা হয়ে সকাল নয়টায় ইউনিয়ন অফিসের সামনে হঠাৎ তাদের চোখে পড়ে রাজাকারদের নৌকা, এরা নিরীহ জেলেদের নৌকা আটকে লুটপাট করছে। এক জেলে ইলিয়াসকে চিনতে পেরে আকুল স্বরে অনুনয় করলো, ‘ও দাসবাবুর ভাই, আপনারা আমাদের বাঁচান।’

বিজ্ঞাপন

তৎক্ষণাৎ আক্রমণে কয়েকজন রাজাকার মারা যায় সেখানেই। বাকিরা দুই নৌকায় ইঁদুরের বাচ্চার মত পালিয়ে আসতে থাকে। জ্যোতি বাকিদের অপেক্ষা করতে বলে বারোজন সঙ্গে নিয়ে তাড়া করেন সেই পলায়নপর রাজাকারদের। অন্যরা তার সঙ্গে আসতে চেয়েছিলো, জগতজ্যোতি ধমক দিয়ে বলেন, 'কয়টা রাজাকার ধরতে সবার আসার কী দরকার?'

নৌকা পারে ভিড়িয়ে শুকনো বিল পেরিয়ে রাজাকাররা পালিয়ে যায় জলসুখার দিকে। জলসুখা জ্যোতির গ্রাম। নাড়িপোতা ঠিকানা। কিন্তু জ্যোতি তখন অপারেশনে, তাই কাছে এসেও ফিরে যান। যাওয়ার সময় মর্টারের রেঞ্জের কাছাকাছি এক রাজাকারের বাড়িতে মর্টার শেলিং করেন।

ফেরার সময় হঠাৎ পাল্টে যায় সবকিছু। হঠাৎ চায়নিজ রাইফেলের গুলির আওয়াজ ভেসে আসে অনতিদূর থেকে। চায়নিজ রাইফেল পাকিস্তানীদের অস্ত্র। রাজাকারদের কাছে চায়নিজ রাইফেল থাকার কথা নয়। ওদের দৌড় বন্দুক পর্যন্তই। বিলের কাছে আসার পর ওরা দেখে, একদিকে আজমিরিগঞ্জ, অন্যদিকে শাল্লা ও মাকুলির দিক থেকে গানবোটে করে পাকিস্তানি আর্মিরা এসে নদীর পারে পজিশন নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ঠিক উল্টোদিকের বদলপুরেও গুলির আওয়াজ। রাজাকারগুলো ছিলো আসলে ঘুঁটি, ওদের টোপ হিসেব কাজে লাগিয়ে শেষপর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানীদের ঘোর দুঃস্বপ্ন আর ত্রাস হয়ে ওঠা দাস পার্টিকে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে পাকিস্তানি সেনারা। সু-প্রশিক্ষিত হিংস্র পাকিস্তানি সৈন্যরা এতদিন সকাল-বিকেল মার খেয়েছে দাস পার্টির দুর্ধর্ষ গেরিলাদের হাতে, আজ তারা আটঘাট বেঁধেই নেমেছে।

দুইদিক থেকেই পাকিস্তানি সেনারা পজিশন নেয় নদীর পার জুড়ে। আর জ্যোতির দলের ১২ জন পজিশন নেয় নদী আর শুকনো বিলের মাঝে। দূরত্বটা এতোই কাছে যে, পাকিস্তানি জওয়ানদের পজিশন নেওয়ার জন্য অফিসারদের দেওয়া উর্দু কমান্ডও শুনতে পাচ্ছিলেন জগতজ্যোতিরা। জ্যোতি আর তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ইলিয়াস সামনের সারিতে। দুজনের হাতেই মেশিনগান আর দুই ইঞ্চি মর্টার। এরপরের সারিতে মতিউর, রশিদ, আইয়ুব আলী, বিনোদ বিহারী বৈষ্ণব, ধন মিয়া, কাজল, সুনীল, নীলু, কাইয়ুম ও আতাউর। বিপরীতে অগণিত পাকিস্তানি সেনা- যুদ্ধ শুরু হলো সামনাসামনি।

মাত্র ১২ জন যোদ্ধা নিয়ে নিতান্তই এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত জগতজ্যোতির কণ্ঠ চিরে হঠাৎ বের হয় এক অদ্ভুত উৎসাহের কথা, 'চল, আজ শালাদের জ্যান্ত ধরবো, একেবারে হাতেনাতে।' মৃত্যুভয়কে তুড়ি মেরে অকুতোভয় দুঃসাহসে যুদ্ধ করে যাওয়া ছোট্ট দলটি ছোবল দিতে আপ্রাণ চেষ্টায় মাতে। আইয়ুব আলির মাথায় গুলি লাগে, তাকে দুজনের জিম্মায় দিয়ে পিছিয়ে বদলপুরের দিকে পাঠিয়ে দেন জ্যোতি। ভয়ঙ্কর একপেশে সেই যুদ্ধে একটু পর আহত হন আরেক মুক্তিযোদ্ধা। মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের ফগার- শিকারি হাউন্ডের মত।

ওদিকে বদলপুরে থাকা মূল দলের বাকি ৩০ জনকে আটকে রাখে পাকিস্তানীদের আরেকটি দল। কোনও সাহায্য পৌঁছায় না জ্যোতির দলের কাছে। দলের মাথাটা বাগে পেয়েছে আজ পাকিস্তানিরা, কেটে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করে যায় তারা। ক্রমশ কঠিন হয়ে যাওয়া যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইলিয়াস জিজ্ঞেস করেন, 'দাদা, কি করবো?' নির্মোহ গলায় জ্যোতির শান্ত জবাব, 'তোর যা খুশি কর।' কমান্ডার যেন বুঝতে পেরেছিলেন এটাই তার শেষ যুদ্ধ। শেষ যুদ্ধ পরিচালনার ভার তাই প্রিয় সহযোদ্ধার কাঁধে দিয়ে জ্যোতি মন দেন নিখুঁত নিশানার দিকে। ফুরিয়ে আসতে থাকে গুলি। ইলিয়াস বিনোদবিহারীসহ আরও দু-তিনজনকে পাঠান বদলপুর থেকে যেভাবেই হোক গুলিসহ রসদ আনার জন্য। বিকেল সাড়ে তিনটায় হুট করে গুলি লাগে ইলিয়াসের বুকের বাম পাশে। হাত দিয়ে দেখেন, কী আশ্চর্য, হৃদপিণ্ড ভেদ না করেই গুলি বেরিয়ে গেছে যেন কিভাবে।

মাথার গামছা খুলে বুকের ক্ষতস্থান বেঁধে দিতে দিতে জ্যোতি জিজ্ঞেস করেন, 'বাঁচবি?' বুকে বুলেটের ক্ষত নিয়ে আহত ইলিয়াস জবাব দেন, 'মনে হয় বাঁচতে পারি।' কমান্ডার নির্দেশ দেন, 'তবে যুদ্ধ কর।'

১২ জন থেকে যোদ্ধার সংখ্যা এসে দাঁড়ায় পাঁচজনে। একটু পরে স্রেফ ইলিয়াস আর জ্যোতি ছাড়া আর কারো অস্ত্র থেকে গুলির শব্দ শোনা যায় না। এমনকি জ্যোতির এলএমজির গুলি সরবরাহকারীও নেই আর। মধ্য নভেম্বরের দীর্ঘ বিকেলের সেই ক্লান্ত সময়ে এক অসম্ভব যুদ্ধে লিপ্ত হোন দুই যোদ্ধা। ইলিয়াস গুলি লোড করতে থাকেন, আর জ্যোতি ১০০ গজ দূরে সারিবদ্ধ পাকিস্তানীদের গুলি করতে থাকেন অকুতোভয় তীব্রতায়, নিখুঁত নিশানায়, একের পর এক । মাথার ওপর দিয়ে তীব্র গর্জন করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানীদের একটার পর একটা গুলি। তাতে বাঁধা দিতে মাঝে মাঝেই মর্টার থেকে শেলিং করছেন তারা। মনে ক্ষীণ আশা, সন্ধ্যা হয়ে গেলে হয়তো পাকিস্তানীদের ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যাবে।

হায়!, সময় ওটুকু সময়ও দেয়নি সেদিন। সন্ধ্যা হবার ঠিক আগে আচমকা জ্যোতির মাথা ভেদ করে যায় একটি পাকিস্তানি বুলেট। গলাকাটা মহিষের মত ছটফট করে জ্যোতির শরীর, ইলিয়াস জড়িয়ে ধরেন তাকে। ডাকেন, 'দাদা, ও দাদা'। জ্যোতি একবার মাথা তোলেন, মাথা পড়ে যায়। যাবার আগে মাতৃভাষায় স্রেফ দুটি ক্লান্ত শব্দ উচ্চারিত হয় পাকিস্তানীদের সীমাহীন আতঙ্ক আর ভয়ের কারিগরের কণ্ঠ থেকে, 'আমি যাইগ্যা'।

সেদিন কাঁদতে পারেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের কাঁদার নিয়ম নেই যে! ইলিয়াস কাঁদেন ৪৩ বছর পরও, ২০১৫ সালের ২০শে জুন, স্বাধীন মাটিতে সেদিনের সেই যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, তার দাদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, চিৎকার করে কাঁদেন। কাঁদেন তার কমান্ডারের জন্য… এ কান্না বড় শোকার্ত, তীব্র আর্তনাদের। এ কান্না হৃদয়ের গহীন ভিতরের, বড় যন্ত্রণার।

নিষ্ঠুরের মত ইলিয়াসের ঘোর ভাঙ্গেন সাক্ষাৎকার নিতে থাকা হাসান মোরশেদ। প্রশ্ন করেন, 'তারপর কী হলো ইলিয়াস ভাই?' ইলিয়াস বলেন সেই অসম্ভব যন্ত্রণার গল্প। প্রিয় কমান্ডারের নিথর শরীর বিলের কাদাপানির ভেতর যতটা সম্ভব পুঁতে ফেলতে হয় তাকে, যেন শত্রুর হাতে এই বীরের কোনও অবমাননা না হয়। নিজের এলএমজিটার সঙ্গে তুলে নেন দলনেতার এলএমজিটাও। বুকে বাঁধা গামছা থেকে চুইয়ে পড়তে থাকা রক্ত উপেক্ষা করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পেছনে ফিরতে থাকেন ইলিয়াস।

ইলিয়াসের চেষ্টাটুকু সফল হয় না। পরদিন সকালে লাশ কাদা পানি ভেতর থেকে ভেসে ওঠে। রাজাকাররা বেরিয়ে আসে তখন, টেনে-হিঁচড়ে লাশটা নিয়ে যায় তাদের ঘাঁটিতে। তারপর জগতজ্যোতির মা-বাবাকে লাশের সামনে টেনে আনে তারা। পাথরের মত পাষাণ হয়ে মা বললেন, এই লাশ তার জ্যোতির না, জ্যোতির বাম হাতে একটা আঙ্গুল বেশি!

কেন জ্যোতির মা সন্তানের লাশকে অস্বীকার করেছিলেন? মা হয়ে কিভাবে এ সাহস করলেন তিনি? তিনি কি তখন তার স্বামী আর বেঁচে থাকা অপর সন্তানের জীবন বাঁচানোর কথা ভাবছিলেন? জানা যাবে না আর কখনই। মারা গেছেন তিনি ক’বছর আগে। অবশ্য মায়ের এ চেষ্টায় তখন লাভ হলো না। বাড়ি ফিরে যেতে যেতে জ্যোতির বাবা-মা দেখলেন, তাদের ভিটায় আগুন, জ্বলছে সব। ওদিকে রাজাকাররা জ্যোতির লাশটা নৌকার সামনে বেঁধে নিল, আজমিরিগঞ্জ থেকে জলসুখা পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে উৎকট উৎসাহের সঙ্গে প্রদর্শন করলো 'গাদ্দার'-এর লাশ,পৈশাচিক উল্লাসে।

তারপর আজমিরিগঞ্জ পৌঁছে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেয়নেটে ক্ষতবিক্ষত লাশটা বেঁধে রাখলো তারা। সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে জানালো, এই হচ্ছে সেই কুখ্যাত ভারতীয় দালাল, গাদ্দার।

১৬ই নভেম্বর জগতজ্যোতির মৃত্যুদিন। প্রথম বীরশ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল জগতজ্যোতি দাসের। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে জগতজ্যোতির মৃত্যুর পর তাকে সর্বোচ্চ বীরত্বভূষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিলো বারবার। কিন্তু অজানা কোনও কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। বীরশ্রেষ্ঠ তো দূরে থাক, ভাটি অঞ্চলের কিংবদন্তী জগতজ্যোতিকে আজ প্রায় কেউই চেনে না। একাত্তরে শাল্লা-জামালগঞ্জ-তাহিরপুর-টেকেরহাটে ছোট্ট কিন্তু দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধার দল 'দাস পার্টি'র নেতৃত্বে ছিল যে বীর। মাত্র একুশ বছর বয়সের অসমসাহসী এই বীর যোদ্ধা ৩৬ জনের গেরিলা দল নিয়ে হাজারও পাকিস্তানি-রাজাকার বাহিনীর বুকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বৃহত্তর সিলেটের হাওর অঞ্চলে। ঢাকার বুকে ক্র্যাক প্লাটুন ছিলো যেমন দুর্ধর্ষ, ঠিক তেমনি ভাটি অঞ্চলে পাকিস্তানীদের সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে এসেছিলো দাস পার্টি।

হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জের জলসুখা গ্রামে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে বাবা জীতেন্দ্র চন্দ্র দাস ও মা হরিমতি দাসের ছোট সন্তান জগতজ্যোতির জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিলে। বাবা ও বড় ভাই ছিলেন রাজমিস্ত্রি, কিন্তু জগতজ্যোতি ছিলেন পড়ালেখায় খুবই মেধাবী। ১৯৬৮ সালে ২য় বিভাগে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হয়েছিলেন সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী, ২১ বছর বয়সী এক তরুণ!

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে মেঘালয়ে ট্রেনিং নিতে চলে যাওয়া জগতজ্যোতি ট্রেনিং চলাকালে ইকো-১ ট্রেনিং ক্যাম্পের ডিউটি সার্জেন্ট ছিলেন। অল্প সময়েই অ্যামবুশ থেকে বাঁচার কৌশল, গ্রেনেড থ্রোয়িং, শত্রুর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ ইত্যাদি নানা কৌশল শিখে নিজেকে একজন দক্ষ সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলেন। ট্রেনিং নিয়ে ফেরার পর ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে দাস কোম্পানি নামে এক দুর্ধর্ষ গেরিলা দল গড়ে তোলেন জগতজ্যোতি, সহ অধিনায়ক ছিলেন ইলিয়াস। জগতজ্যোতি দাস বীর বিক্রম ছিলেন প্রথম কোম্পানি কমান্ডার। দ্বিতীয় কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন তারই সহযোদ্ধা ইটনার ছিলনী গ্রামের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীর বিক্রম। এবং সবশেষ কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন মতিউর রহমান বীর বিক্রম।

শুধুমাত্র তার সাহসী অভিযানের কারণে পাকিস্তান সরকার রেডিওতে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়,'এই রুট দিয়ে চলাচলকারী ব্যক্তিদের জানমালের দায়িত্ব সরকার নেবে না'। মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধা নিয়ে বানিয়াচঙে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আড়াইশো সেনা ও তাদের দোসরদের অগ্রগতি রোধ করে দেন। যুদ্ধে প্রাণ হারায় ৩৫ পাকিস্তানি সেনা। রাজাকার-আলবদরদের কাছে জগতজ্যোতি ও তার দল ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কারণ, নৌপথেও চারদিকে বিস্তৃত পানির রাজ্যে যে এমন দুর্ধর্ষ গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে মুহুর্তে হারিয়ে যাওয়া যায়, এটা মরু অঞ্চলে অভ্যস্ত পাকিস্তানীদের কাছে ছিলো এক ভীষণ আতঙ্কের ব্যাপার।

যথারীতি বাংলাদেশ অন্য আরও হাজারও বীরের মত দাস পার্টির অনন্য বীরত্বগাঁথা ভুলে এগিয়ে গেছে আরও সাড়ে চার দশক। বেঁচে থাকা গেরিলারা কে কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ খোঁজ করে না। অবশ্য অন্য কাউকে দোষ দেবো কী, রাষ্ট্র নিজেই ভুলে গেছে এই বীরের কথা। ভুলে গেছে অকুতোভয় সাহসে অকাতরে জীবন দিয়ে স্বাধীনতা কিনে আনা দাস পার্টির কথা। ৪৭ বছর পরের এই বাংলাদেশে যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের পিটিয়ে হাড়-গোড় গুড়ো করে মেরেই ফেলা হয়, সেখানে জগতজ্যোতির মত বিলীন ধুলো পড়া অতীত যে কেউ মনে রাখবে, সে আশা করাটাও যে পাপ।

পরিশিষ্ট: জগতজ্যোতি দাসকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি'তে ভূষিত করার কথা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাকে মরণোত্তর 'বীর বিক্রম' উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তার বীরত্বভূষণ সনদ নম্বর ১৫৪।

তথ্য কৃতজ্ঞতা- দাস পার্টির খোঁজে, হাসান মোরশেদ।

অভূতপূর্ব গেরিলা দল 'দাস পার্টি'র হারাতে বসা ইতিহাস পরম যত্নে আর একরাশ মমতায় তুলে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও লেখক হাসান মোরশেদ। তার 'দাস পার্টির খোঁজে' বইটি জগতজ্যোতি দাস ও ভাটি অঞ্চলের গণহত্যা ও প্রতিরোধযুদ্ধের অন্যতম তথ্যানুসন্ধানী আকর গ্রন্থ বলে বিবেচিত হবে বলে মনে করি। রক্তাক্ত জন্ম ইতিহাসের এই অসামান্য আখ্যানপর্ব তুলে আনার জন্য তাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা। অভিবাদন।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন