বিজ্ঞাপন

হাটহাজারী মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলাম- একটি প্রস্তাবনা

June 17, 2020 | 6:18 pm

মিরাজ রহমান

হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে চিনি মূলত পেশারগত কারণে। আমার সাংবাদিক জীবনের অধিকাংশটাই কেটেছে ‘ইসলাম’ বিষয়ে তাই এদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম-এ-দ্বীনকে না চিনলে হয়!

বিজ্ঞাপন

কোনো একটি কাজকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়েছি। তাই শাহ আহমদ শফী, জুনায়েদ বাবুনগরীসহ মাদ্রাসার শীর্ষস্থানীয় উলামাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। মাদ্রাসার বিশালত্ব দেখে বরাবরই বিস্মিত হয়েছি। এতো বড় আয়োজন। এতো বড় প্রতিষ্ঠান চলে কীভাবে? মাদ্রাসার  মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সুবাদে জানলাম মাদ্রাসার অলৌকিক কিছু ব্যাপার-স্যাপার। তিনি জানালেন, ‘মাদ্রাসার ফান্ড একদম খালি। কোনো পয়সা-কড়ি নেই। চিন্তিত হয়ে বড় হুজুরকে (আহমদ শফী) জানালাম। হুজুর বললেন, ‘চিন্তা নো কইরো। আল্লাহ ভরসা।’ খালি অ্যাকাউন্টের হিসেব নিয়ে রাতে ঘুমুতে গিয়েছি সকালবেলা ব্যাংকে গিয়ে ভরা অ্যাকাউন্ট দেখে কতবার যে আমি বিস্মিত হয়েছি, তার হিসাব নেই!’

বহু ভক্ত-অনুসারী-দ্বীনদ্বার মুসলিম নামে-বেনামে হাটহাজারী মাদ্রাসায় দান করেন। জাকাত-সাদাকাহর টাকা পাঠান। কারণ, এটা উম্মুল মাদারিস। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম কওমী মাদ্রাসা। হাজার হাজার তালিবুল ইলম দ্বীনি ইলম চর্চা করে এখানে। বাংলাদেশের সব কওমী মাদ্রাসার অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদ্রাসা। আর এ প্রতিষ্ঠানের যিনি ‘অভিভাবক’ সব মাদ্রাসার অভিভাবকও তিনি। মুরুব্বী আলেম-এ-দ্বীন। হাটহাজারী মাদ্রাসার বর্তমান মহাপরিচালক আল্লামা শফীকে স্বচক্ষে দেখেছি; তবে অন্য মহাপরিচালকদের গল্প শুনেছি। ইতিহাস পড়েছি। কৌশল বা কোনো প্রভাব খাটিয়ে নাকি হাটহাজারী মাদ্রাসার ‘মুহতামিম’ হওয়া যায় না, ‘আল্লাহওয়ালা’ হওয়াই এ প্রতিষ্ঠানের অভিভাকত্ব লাভের একমাত্র মূলনীতি। সকালে মজলিশে শূরার মিটিংয়ে মহাপরিচালক হিসেবে নাম ঘোষণা হয়েছে অথচ গতকাল রাতেও সে খবরের কানাকড়ির জানতেন না তিনি— এমন ঘটনাও হাটহাজারীতে ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

১৪০৭ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। এরপর কেটে যায় ৩৪ টি বছর। শক্ত ব্যবস্থাপনায় আল্লামা শফী পরিচালনা করেন মাদ্রাসাটি। হাটহাজারী মাদ্রাসা হয়ে উঠে উম্মুল মাদারিস। আল্লামা আহমদ শফী সমাসীন হন দেশের শীর্ষ মুরুব্বী হিসেবে। উম্মুল মাদারিসও তার দায়িত্ব পালন করে আসছিল কায়মন বাক্যে। ইলমী পরিবেশ আর আমলী জলসায় পরিপূর্ণ হাটহাজারী মাদ্রাসার অধ্যায়ে কালে কালে যুক্ত হতে শুরু হয় বিভিন্ন ইতিহাস। ২০১০ সালে আহমদ শফীর তত্ত্বাবধানে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বীনি স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশে। শুরু হয় হাটহাজারী মাদ্রাসার বাংলায়ন। দ্বীনি ইলম বিতরণের একটি ‘মারকাজ’ ধীরে ধীরে নাক গলাতে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইস্যুতে। অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে শুরু হয় রাজনীতি ঘেষা বিভিন্ন তৎপরতা। হেফজতে ইসলাম বাংলাদেশের ব্যানার ব্যবহার করে কিছু কিছু হেফাজতকর্মীর রাজনৈতিক তৎপরতার ইতিহাস এখন আর লুকোচুরির কোনো ইতিহাস নয়। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলার ঘটনায় হেফাজতের নাম ব্যবহারের ‘মিসইউজ’গত ইতিহাস আজ আলেম-তলাবা এবং ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কি হওয়ার কথা ছিল আর কি হয়েছিলো!

আমার কথা কিন্তু স্পষ্ট। ইঙ্গিতসূচকভাবে নয় স্পষ্টভাবে বলতে চাই এবং এটাই বোধকরি সময়ের দাবি- হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে হেফাজতে ইসলামকে এবং হেফাজতে ইসলাম থেকে হাটহাজারী মাদ্রাসাকে আলাদা করা। কারণ কী? কারণ হল- হাটহাজারী মাদ্রাসা তার দ্বীনি ইলমগত ঐতিহ্য হারাতে শুরু করেছে সেদিন থেকে; হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছ যেদিন থেকে। একজন তালিবুল ইলম যখন কিতাব অধ্যয়নের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে; একজন গবেষক আলেম যখন শিক্ষাদানে মনযোগ কমিয়ে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে বামপাড়ার-ডানপাড়ার কূটকৌশলী রাজনৈতিকদের সঙ্গে দুনিয়াবী প্রতিযোগিতায় মেতেছেন; ঠিক তখনেই আলেম-উলামাগণ একূল-ওকূল দুইকুলই হারাতে শুরু করেছেন। একূল মানে দ্বীনি ইলম চর্চায় ব্যাঘাত ঘটেছে আর ওকূল মানে আলেম-উলামাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। নিরঙ্কুশ ইলমী জ্ঞান সাধনায় মগ্ন আলেম-উলামাকে সামাজিক শুদ্ধির নামে এহেন নোংরা রাজনীতিতে নামিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে পর্দার আড়ারে কারা হেসেছে সেটাও বোধ করি হেফাজতকর্মী এবং কওমী আলেম-উলামাদের সামনে আজ পরিষ্কার।

বিজ্ঞাপন

প্রিয় পাঠক আমার, আমি কখনই বলছি না যে, আলেম-উলামাগণ সমাজের অসঙ্গতি-দূর্নীতি-সমস্যা নিয়ে কথা বলবেন না। জাতিকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেবেন না। এমনকি আমি এও বলছি না, আলেম-উলামাগণ রাজনীতি করবেন না। আমি বলতে চাই, আলেম-উলামাগণ রাজনীতি করতে আগ্রহী; তারা রাজনীতিই করবেন। তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষই হবে রাজনীতি। আর যারা নিয়োজিত থাকবেন দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও বিতরণে; তারা জমে থাকবেন মসজিদ-মাদ্রাসাতেই। গভীর রাতে ইলমী গবেষণার চিন্তা নিয়ে মাদ্রাসার বারান্দায় পায়চারি করবেন আর জ্ঞানের চর্চা করবেন। তালিবুল ইলম গড়ায় নিয়োজিত করবেন তাদের জীবন-সংসার। কিছু আলেম থাকবেন যারা সমাজ নিয়ে চিন্তা করবেন। সমাজের রন্ধে রন্ধে মিশে যাবেন তারা। আবার কিছু আলেম নিজেকে নিয়োজিত করবেন ব্যবসা-বাণিজ্যে। আমার বক্তব্য স্পষ্ট- যে আলেম যে সেক্টরে যাবেন; সেই সেক্টরই হবে তার একমাত্র সেক্টর। সকালবেলা মাদ্রাসার শিক্ষক, দুপুরবেলা মসজিদের ইমাম, বিকালটুকু একজন ব্যবসায়ী এবং সন্ধ্যার পর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত রাজনীতিবিদ সাজলে; একদিকে যেমন দ্বীনের ক্ষতি হবে; অন্যদিকে হারাতে হবে গ্রহণযোগ্যতা-ইতিহাস-ঐতিহ্য এমনকি আত্মমর্যাদাও।

স্বার্থক উদাহরণ গ্রহণ করতে বেশি দূরে যেতে হবে না। পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হবে সবকিছু। ফেদায়ে মিল্লাত হজরত মাওলানা আসআদ মাদানীর (রহ.) ইন্তেকালের পর কিছুটা সঙ্কট দেখা দিলো— জামিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতৃত্ব ও দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে যুক্ত থাকা না থাকা নিয়ে। সিন্ধান্তের জিম্মাদার মানা হলো দেওবন্দ মাদ্রাসার তৎকালীন মহাপরিচালক মাওলানা মারগুবুর রহমানকে। যুগআলোড়িত সিন্ধান্ত দিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম-এ-দ্বীন। মাওলানা আরশাদ মাদানী তখন দেওবন্দ মাদ্রাসার নাজেমে তালিমত ছিলেন আর মাওলানা উসমান মানসুরপূরী ছিলেন নায়েবে মুহতামিম। মাওলানা মারগুব বললেন, ‘রাজনীতি আর মাদ্রাসার প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন একসঙ্গে করা যাবে না। যে জামিয়তের নেতৃত্ব চাইবে, দেওবন্দের প্রতিষ্ঠানিক পদ ছাড়তে হবে তাকে। আর যে দেওবন্দের প্রতিষ্ঠানিক পদ আকড়ে রাখতে চাইবে; রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে তাকে।’ সিন্ধান্ত মেনে মাওলানা আরশাদ মাদানী ও মাওলানা উসমান মানসুরপুরী দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠানিক পদ ছেড়ে জামিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতিত্ব তথা রাজনীতিকে গ্রহণ করে নিলেন। মিটে গেল সঙ্কট। নির্মিত হলো নতুন ইতিহাস। সুস্থ ধারায় চলতে থাকলো দেওবন্দে প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা এবং জমিয়তের রাজনীতি। একটি সিন্ধান্তের সুফল আজও ভোগ করছেন ভারতবাসী মুসলিম সমাজ, তৃপ্তির হাসি হাসছেন দেওবন্দ মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জমিয়তে উলামায় হিন্দ পরিবার।

বিজ্ঞাপন

আমাদের অভিজ্ঞতা এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাস ঘেটে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো- একটি উম্মুল মাদারিস হিসেবে হাটহাজারী মাদ্রাসাকে তার দ্বীনি জ্ঞানগত ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কার্যক্রমকে মাদ্রাসা সীমানা থেকে আলাদা করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ, অরাজনৈতিক শ্লোগান নিয়ে ‘জন্ম নেওয়া’ হেফজতে ইসলাম এখন আর তার সেই পরিচয়ে জীবিত নেই। সামাজিক বিভিন্ন কর্মকান্ডসহ বহুবিধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে ফুলে ফেপে বিশাল আকারের এক সংগঠন এখন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। হেফাজতের সভা মানেই হাটহাজারীসহ বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষানবীশ ছাত্রদের উপস্থিতি। আর এর মানে শিক্ষায় ঘাটতি। সুতরাং সামাজিক বিষয়াদিতে ভূমিকা রাখতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পরিচালনাগত ব্যবস্থাপনায় আলাদা মনবসম্পদ ব্যবহৃত হোক এবং নিরেট দ্বীনি ইলম চর্চার মান ও পরিবশে বজায় রাখতে হাটহাজারী মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা ন্যস্ত থাকুন একান্ত ইলমপিপাসু কিছু অস্তিত্বের হাতে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও উম্মুল মাদারিস হাটহাজারী মাদ্রাসা- দুটি নামই বেঁচে থাকুক স্বতন্ত্র দুই পরিচয়ে। হাটহাজারী বেঁচে থাকুক উম্মুল মাদারিস তথা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আর হেফাজতে ইসলাম বেঁচে থাকুক ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম হিসেবে। এমনটাও করা যেতে পারে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হবে ফারেগীন (দাওরায়ে হাদিস সমাপ্তকারী) ও বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় নিযুক্ত আলেম-উলামাদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন। তালিবুল ইলম তথা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মুক্ত থাকবে এ সংগঠনের কার্যক্রম থেকে। মোট কথা, মাদ্রাসা চলবে মাদ্রাসার মতো আর হেফাজত গড়ে উঠুক আলাদা অবয়বে। নিজ কানে শুনিনি, শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ মহোদয়ের কাছ থেকে শুনছি- তিনি শুনছেন নিজ কানে। হাটহাজারী মাদ্রাসার সাবেক মহাপরিচালক আল্লামা হামেদ সাহেবও (রহ.) নাকি এমন দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন। বারবার তিনি মাদ্রাসার ইলমী মজলিসে ছাত্র-শিক্ষদের উদ্দেশ্যে এমন নসিহত করতেন, ‘ছাত্র জামানায় রাজনীতি হারাম। কুতুববীনি (কিতাব অধয়্যন) ছাড়া অন্য মাশগালাহ (কাজ) হারাম। ইলম অর্জনের সাধনার সঙ্গে অন্য সাধনা মিশালে আসলী ইলম (প্রকৃত জ্ঞান) অর্জিত হয় না।’ শুধু আল্লামা হামেদ সাহেবই (রহ.) নয়; কওমী মাদ্রাসার ইতিহাস-ঐতিহ্য আলোকিতকারী সব আকাবির-আসলাফদের দর্শন ছিল এমনটাই।

বিজ্ঞাপন

আর এ মহতি কাজটি শুরু করতে হবে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকেই। কারণ হাটহাজারী মাদ্রাসা হলো উম্মুল মাদারিস। বাংলাদেশের সব কওমী মাদ্রাসার কেন্দ্রপ্রতিষ্ঠান। হাটহাজারী মাদ্রাসায় কোনো সিন্ধান্ত বাস্তবায়িত হওয়া মানেই সারা বাংলাদেশের সব কওমী মাদ্রাসায় বাস্তবায়িত হওয়া।

লেখক : সম্পাদক, ইসলাম প্রতিদিন

প্রিয় পাঠক, লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই ঠিকানায় -
sarabangla.muktomot@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব, এর সাথে সারাবাংলার সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্কিত নয়। সারাবাংলা ডটনেট সকল মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার দায় সারাবাংলার নয়।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন