বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

৭শ’তে ষষ্ঠ মহারথী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

অক্টোবর ১৫, ২০১৯ | ১:৪৬ অপরাহ্ণ

নিউজরুম এডিটর, সাহাবার সাগর

ঠিক ১১ বছর বয়সে জন্মস্থান মাদেইরা ছেড়ে চলে আসতে হয় স্বপ্ন পূরণের তাগিদে। স্পোর্টিং লিসবনের একাডেমিতে ফুটবল খেলার সুযোগ মেলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। এরপর? এরপর আর কখনো থেমে থাকেনি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা রোনালদো। এই তো উয়েফা ইউরো ২০২০ সালের বাছাইপর্বে ইউক্রেনের বিপক্ষে গোল করে নিজের নাম লিখিয়েছেন ৭শত গোলকারী ফুটবলারদের তালিকায়। রোনালদোর আগে কেবল পাঁচজন ফুটবলার এই কীর্তি গড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এই নামটি একটা বিস্ময়ের ঘোর আর একজন হার না মানা যোদ্ধার নাম। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ছুটে চলা এক স্বপ্নবাজ। রোনালদোর জীবনটা কোনো যুদ্ধের থেকে কম ছিল না। দারিদ্রতার ছোবল পড়েছিল তার পরিবারের ওপর। আর তাই তো ছোটবেলায় ফুটবল খেলার জন্য বুট কেনার অর্থ ছিল না তার বাবার। আর তাই তো অন্যদের দেওয়া পুরাতন বুট পরে খেলতেন এই কিংবদন্তি। তবে তখনও পেশাদার ফুটবলে প্রবেশ ঘটেনি রোনালদোর। জন্মস্থান মাদেইরার রাস্তাতেই তখন খেলতেন এই কিশোর।

অ্যালকহোলে আসক্ত পিতা চাইতেন ছেলে যেন এলাকার অন্যান্য তরুণদের মতো মাঠে গিয়ে খেলেন। আর তারপরেই রোনালদো মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলাটা শুরু করলেন। রোনালদোর বাবা ছেলেরে খেলা দেখতে পছন্দ করতেন খুবই। আর তাই তো মাঠেই চলে যেতেন ছেলেকে উৎসাহ দিতে। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন তার মা আর বোন! দুইজনই তেমন একটা পছন্দ করতেন না এই খেলাটি। আর তাই তো মাঠে বাবার উপস্থিতি থাকলেও মায়ের উপস্থিতি দেখতেন না রোনালদো।

পরিবার ছেড়ে দূরে স্পোর্টিং লিসবনের একাডেমিতে সুযোগ হয় রোনালদোর। ১১ বছর বয়সে জন্মস্থান ছেড়ে যেতে হয় দূরের শহরে। তবে রোনালদো সে সময়েই নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন। একাডেমিতে থাক্র সময় প্রতি চার মাসে কেবল একবারের জন্যই দেখা পেতেন পরিবারের। কারণ মাদেইরা থেকে লিসবনের যাওয়া আসার অর্থ ছিল না তার পরিবারের কাছে। আর তাই তো পরিবারের কথা মনে করে রাতে ঝরাতেন অশ্রুজল। তবে সেই দুঃখকে ভুলতে রোনালদো হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিলেন সেই ফুটবলকেই।

রোনালদোর বয়স তখন ১৫, এই বয়সেই সুযোহ মেলে স্পোর্টিং লিসবনের প্রধান স্কোয়াডে খেলার। সে সময় তার সতীর্থদের রোনালদো বলেছিল, ‘দেখো একদিন আমি পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হবো।’ আর এই কথা শুনে হেসেছিল রোনালদোর সতীর্থরা। তবে তারা যদি জানতো এই রোনালদো কেবল এক সময় পৃথিবীর সেরা ফুটবলারই হবেন না, হবেন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারও। তাহলে হয়তো সে সময় তারাও গর্ববোধ করত।

তবে রোনালদোর বিপরীতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার হালকা পাতলা লিকলিখে শারীরিক গঠন। সে সময় একাডেমি থেকে রোনালদোকে বলা হয়েছিল ওজন বাড়ানোর জন্যও। আর তাই তো রোনালদো কাজ শুরু করলেন এই লক্ষ্যে। অদম্য পরিশ্রম যে একজন মানুষকে সফলতার সর্বোচ্চ চূড়ায়। বর্তমানে রোনালদোর বয়স ৩৪ বছর। গেল বছর যখন জুভেন্টাসে নাম লেখান সে সময় জুভেদের মেডিকেল দল বলেছিল রোনালদোর বয়স ৩৪ হলেও তার শারীরিক সক্ষমতা এখনও ২৪/২৫ বছর বয়সী যুবকদের মতো। আর এই লক্ষ্যটা রোনালদোর নিয়েছিলেন সেই ১৫ বছর বয়সেই। সে সময়েই শারীরিক গড়ন নিয়ে কাজ শুরু করেন। একাডেমির অনুশীলনের বাইরে শুরু করলেন অতিরিক্ত অনুশীলন। তাই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে মাঠে প্রবেশ করে অতিরিক্ত অনুশীলন করতেন রোনালদো। আর এভাবেই নিজের খেলার গতি আর শারীরিক গড়ন বৃদ্ধি করেন তিনি।

রোনালদোর সব থেকে বড় সুযোগ এসেছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে। ২০০৩ সালে স্পোর্টিং লিসবনের নতুন স্টেডিয়ামের উদ্বোধনের জন্য প্রীতি ম্যাচ খেলে ইংলিশ জায়ান্টরা। আর এই ম্যাচেই ইউনাইটেডের ডিফেন্ডারদের নাকানিচুবানি খায়িয়েছিল রোনালদো। রেড ডেভিল ফুটবলাররা এতটাই হাপিয়ে উঠেছিল যে প্রথমার্ধ শেষে ফুটবলাররা তৎকালীন কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে বলে এই রোনালদোকে আমাদের দলে চুক্তি না করিয়ে আমরা পর্তুগাল ছাড়বো না।

শেষ পর্যন্ত রোনালদোকে দলে ভিড়িয়েই তবে থেমেছিল রেড ডেভিলরা। আর এরপরের ইতিহাস তো জানা সবারই। ২০০২ সালের ৭ অক্টোবর নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম গোল করেন রোনালদো। আর ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর ফুটবল ইতিহাসের ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে করলেন ৭শত গোল। কোথায় গিয়ে থামবেন তিনি?

রোনালদোর আগে অবশ্য আরও পাঁচ কিংবদন্তি ফুটবলারের নামের পাশে আছে কমপক্ষে ৭০০ গোলের রেকর্ড। এই পাঁচজন হলেন অস্ট্রিয়ান কিংবদন্তি জোসেফ বিস্কান। ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮০৫ গোল করে আছে সবার শীর্ষে।

সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছেন চির অমর ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে। ব্রাজিলের এই কিংবদন্তি তার ক্যারিয়ারে করেছেন ৭৭৯টি গোল। তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন আরও এক ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোমারিও, তিনি করেছেন ৭৪৮ গোল। আর তালিকার চতুর্থ স্থানে আছেন হাঙ্গেরির কিংবদন্তি ফুটবলার ফেরেঙ্ক পুস্কাস। এই কিংবদন্তি তার বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে করেছেন ৭০৯টি গোল।

এই তালিকায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ঠিক সামনে আছে জার্মান কিংবদন্তি ফুটবলার জার্ড মুলার। রোনালদোর থেকে মাত্র একটি গোল বেশি অর্থাৎ মোট ৭০১টি গোল করে তালিকার ৫ম স্থানে আছেন এই জার্মান। ইউক্রেনের সাথে উয়েফা ইউরো ২০২০ বাছাইপর্বে ম্যাচের ৭২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের ৭০০তম গোল।

বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারে রোনালদোর করা ৭০০ গোলের মধ্যে ডান পা দিয়ে করেছেন ৪৪৪টি গোল, বাম পা দিয়ে করেহেন ১২৬টি গোল, মাথা দিয়ে করেসছেন ১২৮ গোল আর বুক দিয়ে করেছেন বাকি দুই গোল। ক্যারিয়ারে ভিন্ন ভিন্ন ১৫২ দলের আর ২৩২ জন গোলরক্ষকের বিপক্ষে করেছেন গোল। সেই সাথে আছে একটি ফুটবল ম্যাচের ১ম মিনিট থেকে শুরু করে ৯০তম মিনিট পর্যন্ত সকল মিনিটেই গোলের রেকর্ড। কিংবদন্তি রোনালদোর ৭০০ গোলের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সর্বোচ্চ ৪৫০ গোল করেছেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ১১৮, শৈশবের ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে করেছেন ৫ গোল। সদ্য নাম লেখানো জুভেন্টাসের জার্সি গায়ে করেছেন ৩২টি গোল।

ক্লাব ক্যারিয়ারে রোনালদোর গোলের সংখ্যা ৬০৫টি। আর বাকি ৯৫টি গোল এসেছে জাতীয় দল পর্তুগালের জার্সি গায়ে চড়িয়ে। বর্তমানে খেলতে থাকা ফুটবলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ তো বটেই, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকাতেও উঠে এসেছেন দ্বিতীয় স্থানে। এই তালিকায় রোনালদোর আগে আছেন কেবল ইরানের কিংবদন্তি ফুটবলার আলী দাই। তিনি তার ক্যারিয়ারে করেছেন ১০৯টি গোল। আলী দাইকে স্পর্শ করতে রোনালদোর আর প্রয়োজন মাত্র ১৪টি গোল।

রোনালদো একজন অনুপ্রেরণা তরুণ ফুটবলারদের মাঝে। আর তার দেখা মিলেছেও তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ে সব থেকে বেশি ভূমিকা রাখা একজন কিলিয়ান এমবাপে। আর এই ২০ বছর বয়সী এই তরুণ বেশ আগে থেকেই বলে আসছে রোনালদো তার আইডল। এমনকি রোনালদোর ছবি দিয়ে ঘরও ভর্তি করে রেখেছিলেন শৈশবে। রোনালদো একজন হার না মানা যোদ্ধা। রোনালদো একজন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কিংবদন্তি।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন