বুধবার ২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং , ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

পানিসম্পদ প্রকৌশলের বিস্ময়: ভার্সাই প্রাসাদের মেশিন দ্য মার্লি

অক্টোবর ২২, ২০১৮ | ৩:০০ অপরাহ্ণ

।। সানিয়া বিনতে মাহতাব ।।

ভার্সাইপ্রাসাদের অনেক রাজনৈতিক গল্প অনেকের জানা। রাজা চতুর্দশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুইয়ের শাসনামলে ফরাসি রাজপরিবারের আবাসস্থল ছিল এই প্রকাণ্ড প্রাসাদ। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত রাজপরিবারের সদস্যরা এই প্রাসাদেই বাস করতেন। ফরাসি বিপ্লবের পর তাদের এই প্রাসাদ ছেড়ে যেতে হয়। পরে সে প্রাসাদ রূপ নেয় ফরাসি ইতিহাস-নির্ভর এক জাদুঘরে। বলা হয়, ফরাসি ভার্সাই প্রাসাদের প্রতি চিত্তাকর্ষণ কখনোই ফুরোবার নয়। রাজপ্রাসাদ চত্ত্বরে এর সুপ্রশস্ত বাগানগুলো ৮০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে সেসব উদ্যান সাধারণের জন্য দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য হয়েই টিকে রয়েছে। বিশেষ করে এসব উদ্যানের গাছ-গাছালি টিকিয়ে রাখতে যে অগুনতি ঝর্ণা তৈরি করা হয়েছিলো সেগুলো আজও সৌন্দর্য্য বিলিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে তৈরি হয়েছিলো এসব ঝর্ণা? আর কেমন করেই বা তাতে পানি সরবরাহ করা হয়েছিলো? সে নিয়েই এই লেখা।

রাজা চতুর্দশ লুই যখন প্রাসাদের আঙ্গিনায় এধরনের উদ্যান একের পর এক তৈরি করে যাচ্ছিলেন, আর তাতে পানি সরবরাহে তৈরি করে যাচ্ছিলেন আরো নতুন নতুন ঝর্ণা, পানি নিয়ে চ্যালেঞ্জটিও তখন থেকেই। শুরুর দিকে প্রাসাদের আশেপাশের পুকুরগুলো থেকে পাম্পের মাধ্যমে তুলে এসব ঝর্ণায় পানি সরবরাহ করা হতো। চত্বরেই তৈরি করা হলো একটি পানির আধার। তাতে পানি তুলে সংরক্ষণ করা হতো আর অভিকর্ষক হাইড্রলিক পদ্ধতিতে তা ঝর্ণাগুলোতে সরবরাহ করা হতো। ১৬৬৪ সাল নাগাদ, পানির চাহিদা যখন বাড়তেই থাকলো প্রাসাদের উত্তর দিকটায় তৈরি করা হলো একটি পানির টাওয়ার।

নিকটতম সবচেয়ে বড় পানির উৎস ক্লেনি নামের একটি পুকুর থেকে পানি তুলে জমা করা হতো এই টাওয়ারের ওপর বসানো বিশাল আধারে। প্রতিদিন ৬০০ ঘনমিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হতো এই প্রক্রিয়ায়।

১৬৭১ সাল নাগাদ এই রাজকীয় বাগানের নিজস্ব গ্র্যান্ড চ্যানেল তৈরি করা হলো, যা ওই সব ঝর্ণার পানি সরবরাহে ব্যবহৃত হওয়া শুরু করলো। বেশ কয়েকটি উইন্ডমিল বসিয়ে এই গ্র্যান্ড চ্যানেল কার্যকর রাখার ব্যবস্থা করা হলো।

নতুন এই ব্যবস্থা পানি সরবরাহ সঙ্কটের বড় মাপের সমাধান আনলেও বাগানের সবগুলো ঝর্ণা সারাক্ষণ চালু রাখার জন্য তা যথেষ্ট ছিলো না।

একটি চ্যানেলের মাধ্যমে সুবিশাল বাগানের সবগুলো ঝর্ণার জন্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ছিল এককথায় অসম্ভব। আর সে কারণে সাধারণত, যে ঝর্ণাগুলো রাজপ্রাসাদ থেকে সরাসরি চোখে পড়ত সেগুলোতেই কেবল সার্বক্ষণিক পানির ব্যবস্থা রাখতে হতো।

বিষয়টি সমাধানে পরের বছর এক বিশেষ কৌশল নিলেন সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী জিন ব্যাপ্টিস্ট কোলবার্ট। বাগানের ঝর্ণাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের তিনি বাতলে দিলেন রাজা লুই যখন যেখানে থাকবেন ঠিক তার কাছাকাছি ঝর্ণাটিই তখন চালু থাকবে। বাকিগুলো বন্ধ থাকবে। এজন্য বাগান রক্ষকরা নিজেদের মধ্যে বাঁশি ফুঁকে বার্তা পৌঁছে দিতেন। এই সংকেতের মধ্য দিয়ে বোঝা যেতো কখন কোন ঝর্ণা চালু করতে হবে এবং কখন কোনটি বন্ধ করতে হবে।

১৬৭৪ সাল নাগাদ ক্লেনি পুকুর থেকে পানি উত্তোলনের সক্ষমতা দিনে ৩০০০ ঘনমিটারে বাড়ানো হয়। এতে পুকুরটি কখনো কখনো পানিশূন্য হয়ে পড়তো। কিন্তু এত কিছু করেও উদ্যানের জন্য যতটা পানি প্রয়োজন তা মিটতো না। উদ্যানের ঝর্ণাগুলোর জন্য আরও বেশি বেশি পানি প্রয়োজন হতো।

১৬৬৮ থেকে ১৬৭৪ সালের মধ্যে নতুন আরেকটি প্রকল্প চালু হয়। ভার্সাই প্রাসাদের কাছেই ছিল বিয়েভা নদী। সেখান থেকেও পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হলো। এর মাধ্যমে বাগানের জন্য পানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো হলো দিনে ৭২০০ ঘনমিটারে।

স্রেফ একটি বাগানের জন্য এতটা বিপুল পরিমাণ পানির কথা শুনে অবাক হচ্ছেন? তাহলে প্রস্তুতি নিন পরবর্তী প্রকল্পের কথা শোনার জন্য।

সেটি ১৬৮১ সাল। সে বছর শুরু করা এই প্রকল্পকে বলা হয় ওই সময়ের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। ভার্সাই প্রাসাদের কাছেই ছিল সেইন নদী। পরিকল্পনা করা হলো— এই নদী থেকে পানি তুলে তা আনা হবে এই প্রকাণ্ড চত্বরে। যে ভাবা সেই কাজ। প্রকল্প শুরু হয়ে গেলো। শুরুতেই ইভলিন অঞ্চলে একটি বিশাল হাইড্রোলিক সিস্টেম গড়ে তোলা হলো। ১৬৮৪ সালে শেষ হলো প্রকল্পের কাজ। আর তার মাধ্যমে রাজপরিবারের ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত সেইন নদী থেকে পানি টেনে আনার পাকা ব্যবস্থা হয়ে গেলো। এই ব্যবস্থারই নাম দেওয়া হয় মেশিন দ্য মার্লি।

রাজপ্রাসাদের জন্য পানি সরবরাহের এই ব্যবস্থাটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যে এটি তিনটি ধাপে সেইন নদী থেকে পানি তুলে তা মার্লির চ্যানেলগুলোতে টেনে আনা হতো। এই চ্যানেলগুলো ছিল নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার ওপরে। পানি উত্তোলনের জন্য নদীতে বিশাল আকৃতির চাকা বসানো হলো। যারে ঘুর্ণয়নে ৬৪টি পাম্পের সাহায্যে সেইন নদী থেকে পানি উঠে আসতো ৪৮ মিটার উচ্চে বসানো বিশেষ সংরক্ষণাগারে। সেখান থেকে আরও ৭৯টি পাম্পের সাহায্যে এসব পানি তোলা হতো ৫৬ মিটার উঁচুতে তৈরি দ্বিতীয় সংরক্ষণাগারে। এরপর আরো ৭৮টি পাম্পের সাহায্যে পানি সরবরাহ করা হতো সেই সব চ্যানেলে যা ভার্সাই প্রাসাদের দিকে প্রবাহিত। এছাড়াও পানি নিয়ে যাওয়া হতো মার্লিতেও। এটিও কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত ছোট আরেকটি রাজপ্রাসাদ।

মার্লি মেশিন তার পূর্ণক্ষমতা দিয়ে কাজ করতো ঠিকই কিন্তু তাতে প্রত্যাশা পূরণ হলো না। যন্ত্রটির নকশা ছিল জটিল। তাই প্রায়ই লিকেজ বা টুকটাক সমস্যা দেখা দিত। এসব কারণে পানির সরবরাহের গতি কমে যেতো। এই পদ্ধতিতে মাত্র ৩২০০ ঘনমিটার পানি প্রতিদিন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল, যা ছিল খুবই অপ্রতুল। মূল চাহিদা ছিলো এর দ্বিগুন। কিন্তু খরচের কমতি ছিলো না। আর এসব কারণে ভার্সাই প্রাসাদের মোট খরচের এক-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছিলো এই পানি সরবরাহ বাবদ। ঝর্ণাগুলো যদি সীমিত সংখ্যায় চলতো আর সক্ষমতার অর্ধেক প্রেশার দিয়েও যদি চালানো হতো দিনে অন্তত ১২ হাজার ৮০০ ঘনমিটার পানি লেগে যেতো। যা ছিলো গোটা প্যারিস নগরীর পানির চাহিদার চেয়েও বেশি। তবে তার পরেও ১৮১৭ সাল পর্যন্ত এই মার্লি মেশিন টানা ৩৩ বছর ভার্সাই প্রাসাদের জন্য পানি সরবরাহ করে গেছে।

তবে এর আগেই পানি ঘাটতির সমস্যা সমাধানের শেষ প্রচেষ্টাটি করা হয় ১৬৮৫ সালে। সেবছর ১০ হাজার সৈন্যকে জবরদস্তিমূলক কাজে লাগিয়ে ইউরি নদী থেকে পানি টেনে আনার একটি প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছিলো।

এই ইউরি নদী ছিলো ভার্সাই প্রাসাদ থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে।

১০ হাজার সৈন্যেও যখন প্রকল্পের কাজ এগুচ্ছিলো না দ্বিতীয় বছরে তাতে নিয়োজিত করা হলো ২০ হাজার সৈন্য। এই সৈন্যরা নতুন খাল ও বিরাট জলাধার তৈরির কাজ করছিলেন। আর এই উদ্যোগের ফলেই পানি সরাবরাহের একটা স্থায়ী সমাধান হয়।

পরবর্তী সময়ে অনেক আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে, সেগুলোর মাধ্যমে সহজেই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। তবে ভার্সাই প্রাসাদ আর বাগানে পানি সরবরাহের জন্য ‘মেশিন দ্য মার্লি’ প্রক্রিয়াটির তুলনা এখনও নেই। জটিল ও খরুচে হলেও পানি সরবরাহের এই ব্যবস্থাটি নিঃসন্দেহে ওই সময়ের পানিসম্পদ প্রকৌশলের জন্য ছিল একটি বিস্ময়কর উদ্ভাবন।

সৌন্দর্যের জন্য খরচ করতে হয় বৈকি।

সানিয়া বিনতে মাহতাব: সহকারী অধ্যাপক, পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। ১১ বছর ধরে শিক্ষকতা ও গবেষণা করছেন তিনি। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গবেষণা করায় ২০১৭ সালে তাকে বিবার্তা স্বর্ণ পদক দেওয়া হয়।

সারাবাংলা/টিআর/এমএম

পানিসম্পদ প্রকৌশলের বিস্ময়: ভার্সাই প্রাসাদের মেশিন দ্য মার্লি
পানিসম্পদ প্রকৌশলের বিস্ময়: ভার্সাই প্রাসাদের মেশিন দ্য মার্লি
পানিসম্পদ প্রকৌশলের বিস্ময়: ভার্সাই প্রাসাদের মেশিন দ্য মার্লি