বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ২ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৭ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ফেসবুক ও ইউটিউবে নিয়ন্ত্রণ, প্রশ্ন অনেক, আছে শঙ্কা

জুলাই ৪, ২০১৯ | ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ‘সাইবার থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সাইবার হুমকি সংক্রান্ত যে কোনো বিষয় মনিটরিং করা এ প্রকল্পের লক্ষ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সরকার ভার্চুয়াল জগতের যে কোন কন্টেন্ট সরিয়ে দেওয়া কিংবা ব্লক করতে পারবে। ফলে দেশ থেকে ওই কন্টেন্ট দেখা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণলায়ের টেলিযোগাযোগ অধিদফতরের প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া কথা।

সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছেন, ‘সেপ্টেম্বরের পর বাংলাদেশ ফেসবুক ও ইউটিউবে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা অর্জন করবে। অর্থাৎ ফেসবুক বা ইউটিউবে ইচ্ছে করলেই মানুষ যে কোনো কিছু প্রচার করতে পারবে না। সাইট বন্ধ না করেই ওই সাইটের স্ট্যাটাস, কমেন্ট, ভিডিও বন্ধ করার সক্ষমতা অর্জন করবে সরকার।’

সারাবাংলার এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছেন, সক্ষমতা অর্জনে টেলিযোগাযোগ অধিদফতর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কোন প্রক্রিয়ায় ফেসবুক বা ইউটিউবে হস্তক্ষেপ করবে? বিদেশি এসব কোম্পানি সরকারের সব আইন কি মেনে চলবে? ডিসেম্বরে প্রকল্প শেষ হলে সেপ্টেম্বরেই কি প্রকৃত সক্ষমতা অর্জন হবে?

প্রসঙ্গত, ফেসবুককে বাংলাদেশের আইন মেনেই এ দেশে ব্যবসা করতে হবে বলে আগেই জানিয়েছিলেন মন্ত্রী জব্বার। প্রতিষ্ঠানটিও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে গুগল বা ইউটিউবের সঙ্গে সরকারি আলোচনার তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আর সরকার যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তা ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকায় সেপ্টেম্বরেই সক্ষমতা অর্জন নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে প্রকল্পের আওতায় নতুন কি যন্ত্রাপাতি কেনা হচ্ছে বা সম্প্রতি এমন কি যন্ত্রপাতি এসেছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন টেলিযোগাযোগ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীও।

জানতে চাইলে  ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সারাবাংলাকে বলেন, ‘সক্ষমতা অর্জনে প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজ করছে। টেলিযোগাযোগ অধিদফতর অনেক দিন ধরেই কাজ করে আসছে। আমরা নিজেদের সক্ষমতায় পর্নোসহ ২২ হাজার সাইট বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। এখন আমরা যে কোনো সাইট বন্ধ করে দিতে পারি। কিন্তু কন্টেন্ট ফিল্টারিং বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আশা করছি, সেপ্টেম্বরের মধ্যে যে কোনো ফেসবুক আইডির যে কোনো কমেন্ট বা স্ট্যাটাস আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। অর্থাৎ আমরা ইনডিভিজ্যুায়াল কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করব।’

নতুন যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,‘সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন যন্ত্রাপতি নিতে হবে, এটা আমরা নিয়েছি এবং প্রতিনিয়ত নিচ্ছি। এরপরেও যদি কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে, তাদেরকে বলব আরও জ্ঞান অর্জন করতে।’

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ‘ইনডিভিজুয়্যাল ফিল্টারিং নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে তবে আমাদের আর একটু সক্ষমতা অর্জন করা দরকার। যে কোন ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়েছে। ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিতে পারি, কিন্তু পার্টিকুলার কোনো কন্টেন্ট রিমুভ করতে পারি না। সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমরা ইনডিভিজুয়্যাল আইডির ইনডিভিজ্যুায়াল কমেন্টও রিমুভ করতে পারব।’

সাইবার হুমকি মোকাবিলায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের টেলিযোগাযোগ অধিদফতর ‘সাইবার থ্রেট ডিটেকশন এন্ড রেসপন্স’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল আইআইজি  ও এনআইএক্স এ যন্ত্রপাতি সংস্থাপনের মাধ্যমে সাইবার হুমকি সংক্রান্ত বিষয়াদি শনাক্তকরণ এবং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তা ফিল্টারিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে দেশের সামাজিক নীতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখাও এই প্রকল্পের লক্ষ্যের একটি।

প্রকল্প কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে বলা হয়েছে, দেশের চালু ২৮টি আইআইজি ও ৩টি এনআইএক্স এ সাইবার থ্রেট ডিটেকশন ও রেসপন্স সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টেলিযোগাযোগ অধিদফতরে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সিস্টেম স্থাপন করা হবে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, গেয়েন্দা সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিটিআরসিকে সুবিধা দেওয়া এবং সাইবার থ্রেট ডিটেকশন ও রেসপন্স সংক্রান্ত ফিল্ডে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে প্রকল্প কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রায়

২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর শুরু হওয়া প্রকল্পটি এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বাস্তবায়ন করলেও ভার্চুয়াল জগতে এর সুবিধাদি প্রয়োগ করবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিটিআরসি। টেলিযোগাযোগ অধিদফতর শুধুমাত্র ফিল্টারিংয়ের কাজ করবে। শনাক্ত হওয়া কন্টেন্ট বা সাইট সম্পর্কে ব্যবস্থা নেবে তারা।

তবে ফেসবুক সহ অন্যান্য মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তথ্য প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়শন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘কন্ট্রোল করার ক্ষেত্রে কোনো একটি কন্টেন্ট যাতে ফিল্টারিং করা যায় বিটিআরসি এটা নিয়ে অনেকদিন যাবৎ কাজ করছে। কিন্তু পরে ওই প্রকল্পটি আর শেষ হয়নি। টেলিকম অধিদফতর কিছু জিনিসপত্র বসিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব, হেয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য মাধ্যম প্রতিনিয়ত তাদের প্রযুক্তি আপডেট করছে। গত দুই বছর আগে তারা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে এখন তা আরও উন্নত করেছে। আমাদের হাতে যে প্রযুক্তি আছে তা দিয়ে কন্টেন্ট ফিল্টারিং করা যাবে কিনা তা আমি নিশ্চিত নই।’

সরকারি এ পদক্ষেপের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফেসবুক বা ভার্চুয়াল জগতে সরকারের এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ থাকাটা যৌক্তিক। কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার বা সাংবিধানিক অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয় তা আমাদের মনে রাখতে হবে। সাংবিধানিক অধিকার বলতে বাকস্বাধীনতা, মৌলিক স্বাধীনতা যেন ক্ষুণ্ন না হয়। আর নিয়ন্ত্রণ হলেও তা যেন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। সরকার সকলের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি খেয়াল রাখবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।’

সারাবাংলা/ইএইচটি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন