শুক্রবার ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

ছাত্ররাজনীতি: সমস্যার উৎসমুখ ও গভীরে যেতে হবে

অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | ৪:৫৯ অপরাহ্ণ

নবনীতা চক্রবর্তী

সমস্যার গভীরে যেতে না পারাটাও একটি বড় সমস্যা। আমরা এখন সেই বড় সমস্যার মুখোমুখি। কোনো সমস্যার গভীরেই আমরা যেন আর যেতে পারছি না। অথবা যেতে চাচ্ছি না। সমস্যার উৎসমুখ পর্যন্ত পৌঁছুতে না পেরে আমরা কেবল উপরি-উপর সমাধান দিতে ব্যস্ত। এটা হয়তো জোড়াতালি দেওয়া ‘আপাতত রক্ষা করা গেলো’ গোছের পরিস্থিতি সামলানোর একটি তরিকা হতে পারে। তাতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলাও সম্ভব। কিন্তু তা কখনোই টেকসই সমাধানের পথ হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

সময়ের প্রবাহে প্রতিনিয়তই আমাদের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এমনকি ভবিষ্যতেও হতে হবে। কারণ সময় বদলে যাচ্ছে। সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। তবে উদ্বেগ হওয়ার মতো কথা হলো- অস্থির জীবনযাত্রায় কেউ সুস্থির নই। সবাই চটজলদি সমাধানের পথ চাইছি। ফলে সমস্যার যাচাই-বাছাই, সঠিক চিন্তা ও অনুধাবন ছাড়াই সিদ্ধান্তে যেতে হচ্ছে। যার কার্যকারিতা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য আদৌও যুক্তিযুক্ত কিনা তা খতিয়ে দেখার সময়ও হয়ে উঠছে না। এমন বাস্তবতায় বর্তমানে ছাত্ররাজনীতি একটি জোরালো আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানা তর্ক-বির্তক। নিঃসন্দেহে যেকোনো জাতীয় বিষয় আলোচনার সুযোগ রাখে এবং রাখাও উচিত। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা এটিকে অনুমোদন ও সমর্থন করে। সেক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতি রাষ্ট্র ও সমাজের যৌক্তিক সমালোচনাসহ, ছাত্রদের স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং তাদের দাবি আদায়ের এক নিরঙ্কুশ কণ্ঠস্বর।

দেশের ক্রান্তিলগ্নে তরুণসমাজের বলিষ্ঠ হাতিয়ার এই ছাত্ররাজনীতি; যার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থেকে আমরা বিস্মৃত হতে পারি না। উপমহাদেশের এ অঞ্চলের মানুষদের শুধু কেরানি হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে ইংরেজরা সে অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করেছিল। কিন্তু এদেশের ছাত্রসমাজ সেই শিক্ষাব্যবস্থার আগল খুলে বের হয়ে এসেছে নতুন এক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে।

দেশ বিভাগোত্তর জাতীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব ছাত্রফ্রন্ট গড়ে তোলে। ষাটের দশকের প্রথমদিকে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। ফলে ছাত্রসংগঠনগুলোরও নানা দলে উপদলে বিভক্তি ঘটে; এতে জনসাধারণের সামনে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। যদিও এরই মধ্যে তারা ৫২ ভাষা আন্দোলন, ৫৪ প্রাদেশিক নির্বাচন, ৬২ শিক্ষা আন্দোলন এবং ৬৬-এর ছয় দফায় গুরুত্বাপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এ অঞ্চলে সাংগঠনিকভাবে ছাত্ররাজনীতির স্ফুরণ দেখা যায় ১৯৬৮ সালে। এরপরই ঘটে সেই অর্ভূতপূর্ব ঘটনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত ছয় দফা দাবির সর্মথন জানায় পুরো ছাত্রসমাজ। এছাড়া আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারান্তরীণ শেখ মুজিবের মুক্তিকে কেন্দ্র করে সমগ্র ছাত্রসমাজ ও সংগঠন একত্রিত হয়। এক নজিরবিহীন ঐক্য স্থাপিত হয় তাদের মধ্যে; যা ছাত্ররাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।

বিজ্ঞাপন

ছাত্রদের সেই ঐক্যের কারণেই গঠিত হয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ। এরপর ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মতো গণবিস্ফোরণের জন্ম দেয় তারা। তাদের ব্যাপক আন্দোলন নিশ্চিত করে শেখ মুজিবের মুক্তি। ছাত্রদের এই ঐক্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হয়। ছাত্ররাজনীতি জনমানুষের দাবি ও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠে। এভাবেই বাঙালির জাতীয় আসে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধের প্লাটফর্ম তৈরিতে প্রতিটি ছাত্রসংগঠনই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে এবং দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সম্মুখ সমরে অংশ নেয়। ছাত্রসমাজ হয়ে ওঠে নীতি, আর্দশ ও ত্যাগের পরাকাষ্ঠ। স্বাধীনতার পর ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী।

দেশের প্রত্যেকটি সংশয় ও সংকটে ছাত্ররাই অগ্রগণ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে কবে এবং কীভাবে বদলে যেতে লাগল এই ছাত্ররাজনীতি!! সময়ের সাথে সাথে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটে। ছাত্ররাজনীতিও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান সময়কে বিচার করতে হলে অবশ্যই আমাদের মূলে ফিরে যেতে হবে। ৭৫ এর পর থেকে ছাত্ররাজনীতি সহিংস রূপ ধারণ করে। রগকাটা, কুপিয়ে জখম করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ত্রাস ও জুলুমের রাজনীতি। যেখানে নীতি আর্দশ ভুলে পেশিশক্তির আগ্রাসন চলতে থাকে। ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের স্বকীয়তা হারাতে শুরু করে। মাঠ গরম করা রাজনীতির কৌশলে ক্রমশ অপমৃত্যু ঘটতে থাকে বুদ্ধিভিত্তিক চেতনার। যার পরিণতিতে সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু এই বদলে যাওয়া অপসংস্কৃতির ধারাবাহিকতার আদল ছাত্ররাজনীতির মাপকাঠি হতে পারে না। ছাত্ররাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার এখনই উপযুক্ত সময়। তাই বলে সেটা বন্ধ করে নয়। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা কোনো যৌক্তিক সমাধান নয়।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করলে আগ্রাসন বাড়বে বৈ কমবে না। শুধু লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির কাঠামোর পরিবর্তনই নয়, ছাত্রদের অর্থলিপ্সা ও ভোগবিলাসী মনমানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে। আরেকটি বিষয় আমরা বিবেচনায় রাখছি না, সেটি হলো- ছাত্রী হলগুলোতে রাজনীতির প্রেক্ষাপট ও চর্চা। ছাত্র হলগুলোর মতো অধিক আলোচিত না হলেও সেখানে বিভিন্ন দলের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। যেমন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালের ছাত্রী হলগুলোর কথা ধরা যাক। হলগুলোতে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রীর সরাসরি কোনো কার্যক্রম না থাকলেও ইসলামি ছাত্রীসংস্থার কার্যক্রম বরাবরই নিরবিচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী। হলে ছাত্রী সংস্থার মেয়েদের জন্য আলাদা কিছু রুমও বরাদ্দ রয়েছে। সাধারণ ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর গণরুমে ওঠার সাথে সাথেই মেয়েদের তারা নামাজ, ধর্মীয় বৈঠক ও ধর্মীয় বই পাঠে উদ্বুদ্ধকরণসহ নানামুখি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এটি কোনো অরাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি নয়। এই ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে চলে রাজনৈতিক দীক্ষা। পর্যায়ক্রমে এই কর্মধারা গণরুম থেকে প্রত্যেক রুমের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি চেষ্টা থাকে। এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করার অর্থ হলো এই যে, ছাত্ররাজনীতি না থাকলে দল ক্ষমতায় এলে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন তার পেশিশক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করবেই। সেটি প্রত্যক্ষরূপে না করলেও পরোক্ষভাবে করতে চাইবে। অন্যদিকে ধর্মীয় দাওয়াতের ব্যাপারটিকে কাজে লাগিয়ে ধর্মের নামে আরেকটি দলও সামনে এগোবে। কাজেই সাবধান হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলো নিয়ে।

আমরা বড়ই আবেগপ্রবণ জাতি, এই আবেগ নিয়েও বেসাতির অভাব নেই। নিমিষেই খুব মোটা দাগে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যাই। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বনাম সাধারণ শিক্ষার্থী। এক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়। যা থেকে পরবর্তীতে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যায়। নিশ্চয়ই কোনোটিই আমাদের কাম্য নয়। অপরদিকে ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও ক্ষুন্ন হয়। তাই ছাত্ররাজনীতির নিষিদ্ধকরণ নয় বরং এর ঘুণে ধরা কাঠামোর সংশোধন দরকার। এর জন্য সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো সুশিক্ষা। কারণ যুক্তি ও বুদ্ধি আড়ষ্ঠ হলেই পেশিশক্তির উত্থান প্রশয় পায়।

বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন সময়ে নির্যাযিত এবং অত্যাচারিত শিক্ষার্থীদের যেমন ক্ষোভ, কষ্ট, হতাশা রয়েছে তেমনি বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে, দাবি আদায়ে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে তাদেরই রক্তে। ভয়াবহ অমানবিকতার শিকার হয়েছেন বহু তরুণ। এগুলোর পুনরাবৃত্তি বন্ধ হোক। ছাত্রসমাজ বরাবরই ক্রান্তিকালে দেশ ও মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই স্মৃতি বিস্মৃত যেন না হয়। তারুণ্যের অপরাজেয় শক্তির উত্থান হোক দেশের সার্বিক মঙ্গলে। বাংলাদেশে সুস্থধারার ছাত্ররাজনীতির চর্চা শুরু হোক এখন থেকেই।

লেখক: আইসিসিআর স্কলার ও এডুকেশন সেক্রেটারি, স্টেজ ফর ইয়ুথ

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন